ফারহান তানভীর:
একটা সময় ছিল, যখন ঈদের সকালটা শুরু হতো এক অদ্ভুত উত্তেজনা নিয়ে। নতুন জামার গন্ধ, নামাজের পর কোলাকুলি আর বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য টান-আজ নতুন সিনেমা দেখতে যাওয়া হবে। এটা কোনো আলাদা পরিকল্পনা ছিল না, এটা ছিল ঈদেরই অংশ। অনেকের কাছে ঈদের আনন্দ পূর্ণতাই পেতো সিনেমা হলে গিয়ে। সেই সময় ঈদের দিনগুলোতে সিনেমা হলগুলো দর্শকদের চাপে ঠাঁই নাই আর ঠাই নাই অবস্থা তৈরি হতো।

ঈদের নামাজ শেষ করেই সিনেমাপ্রেমিক মানুষ ছুটত সিনেমা হলের দিকে। শহরের রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে ভিড়ে ভরে উঠতো আর হলের সামনে গিয়ে সেই ভিড় যেন রূপ নিতো এক উন্মাদনায়। সে সময় একটা টিকেট পাওয়াই ছিল যুদ্ধের মতো। একা গেলে যা প্রায় অসম্ভব ছিল-দল বেঁধে যেতে হতো, ধাক্কাধাক্কি করতে হতো, কখনো কখনো মারামারির পরিস্থিতিও তৈরি হতো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো-এই কষ্টগুলোই ছিল আনন্দের অংশ। কারণ তখন ঈদের সিনেমা মানে ছিল শুধু একটা ছবি দেখা নয়-এটা ছিল একটা সম্মিলিতভাবে ঈদ উদযাপন।

সেই সময় ঈদে একসাথে ১০-১২টা সিনেমা মুক্তি পাওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রতিটা ছবির জন্য ছিল আলাদা উত্তেজনা, আলাদা দর্শকগোষ্ঠী। দেশের ১০০০-এর বেশি সিনেমা হল যেন এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতো।তখনকার দিনে ঢালিউডে নায়ক-নায়িকারও কোনো অভাব ছিল না। একেকজন তারকার ছিল আলাদা স্টাইল, আলাদা পরিচিতি, আলাদা ভক্ত-সমর্থক। বড়রা বিশেষ করে মহিলারা ছিলেন আলমগীর-শাবানা জুটির বিশেষ ভক্ত , আবার জসিম-শাবানার জনপ্রিয়তা ছিল অন্যরকম। সালমান শাহ-শাবনুর মানেই ছিল রোমান্সের জাদু, ইলিয়াস কাঞ্চন-দিতি বা অঞ্জু ঘোষ-এর জুটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছিল।ওমর সানি-মৌসুমি ছিল তরুণদের প্রধান আকর্ষন, আর মান্না-র অ্যাকশন সিনেমা মানেই ছিল হলে হাততালির ঝড়। দর্শকের সামনে ছিল অসংখ্য বিকল্প। অভিনেতাদের এই বৈচিত্র্যই তৈরি করত আগ্রহ। মানুষ বিশ্বাস করতো-প্রতিটা সিনেমা হলেই তাদের জন্য নতুন কিছু অপেক্ষা করছে।

বর্তমানে সময় বদলেছে-আর সেই সাথে বদলে গিয়েছে ঈদের সিনেমার চেহারাও।এখন মাল্টিপ্লেক্স আছে, এসি হল আছে, অনলাইন টিকেটিং সিস্টেম-সবকিছুই অনেক বেশি আধুনিক, অনেক বেশি আরামদায়ক। কিন্তু এই আরামের ভেতরে কোথাও যেন একটা শূন্যতা থেকে গেছে।আজ আর হলের সামনে সেই অগণিত ভিড় দেখা যায় না। আজ আর টিকেট পাওয়ার জন্য যুদ্ধ করতে হয় না।কারণ, দর্শকই যেন আর আগের মতো নেই। ঢালিউডেও এখন নায়ক-নায়িকার সংখ্যা হাতে গোনা। ঘুরে ফিরে কয়েকজন মুখ-একই জুটি, একই ধাঁচের গল্প। নতুন মুখের অভাব, বৈচিত্র্যের অভাব-সব মিলিয়ে দর্শকের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি চলে এসেছে। অনেকের মতে, এখন শাকিব খান ছাড়া এমন কোনো নায়ক নেই, যার সিনেমা ঘিরে এককভাবে সেই পুরনো উন্মাদনা তৈরি হয়। যেখানে আগে দর্শক হলে যেত “কাকে দেখবে” এই উত্তেজনায়, এখন অনেকেই ভাবে-“আবার কি একই জিনিস?”এই পুনরাবৃত্তিই ধীরে ধীরে আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। আর আগ্রহ কমে গেলে, সিনেমা হলে যাওয়ার প্রেরণাও কমে যায়-এটাই স্বাভাবিক।

অভিনেতা-অভিনেত্রীদের স্বল্পতার পাশাপাশি যোগ হয়েছে আরও বড় একটি পরিবর্তন-প্রজন্মের পরিবর্তন।আগের প্রজন্মের জন্য সিনেমা ছিল একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। তারা সিনেমার জন্য অপেক্ষা করতে জানত, তারা একটি দিনকে ঘিরে আনন্দ তৈরি করতে জানত। ঈদের সিনেমা ছিল তাদের জন্য সেই প্রতীক্ষার ফল-একটা দিনের জন্য জমে থাকা উত্তেজনার বিস্ফোরণ।কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় বড় হচ্ছে। মোবাইল খুললেই সিনেমা, সিরিজ, ভিডিও-সব এই প্রজন্মের হাতের নাগালে। তাদের কাছে অপেক্ষা করার অভ্যাস নেই বরং অপশন বেছে নেওয়ার অভ্যাস আছে।ফলে ঈদের সিনেমা তাদের কাছে আর আলাদা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। সিনেমার বিনোদন তাদের জন্য অনেক কিছুর মধ্যে একটি মাত্র।আগে যেখানে একটি সিনেমা দেখার জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত,এখন সেখানে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এই প্রজন্ম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে-দেখবে, না স্কিপ করবে।

প্রজন্মের এই গ্যাপটাই আসলে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে। সিনেমা বদলেছে, হল বদলেছে-কিন্তু সবচেয়ে বেশি বদলেছে দর্শক নিজেই।এখনও ঈদে সিনেমা মুক্তি পায়, কিছু ছবি দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়, কিছু মুহূর্ত আলোচনায় আসে। কিন্তু সত্যিটা হলো-সেই আগের মতো সর্বব্যাপী উন্মাদনা আর নেই। একটা সময় যেখানে ঈদের আনন্দ পূর্ণ হতো সিনেমা হলে গিয়ে। আর এখন, সেই আনন্দ ছড়িয়ে গেছে হাজারটা স্ক্রিনে-মোবাইল, টিভি, ল্যাপটপে।তাই হয়তো আজ আমরা আর হলের সামনে দাঁড়িয়ে টিকেটের জন্য লড়াই করি না,কিন্তু মনের ভেতরে কোথাও না কোথাও সেই ভিড়টাকে মিস করি। সেই চিৎকার, সেই হাততালি, সেই একসাথে অনুভব করার আনন্দ- যেটা শুধু সিনেমা না, একটা সময়ের গল্প ছিল। সেই সময়গুলো আজ কেবল স্মৃতির পাতায় সংরক্ষিত।