ফারহান তানভীর:
একসময় ঢাকার রাতের ব্যস্ত সড়কে একটি গাড়ি ছুটে চলত। স্টিয়ারিংয়ে থাকতেন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ, পাশে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহশিল্পী আশরাফুল হক ডন। গন্তব্য অনেক সময় নির্দিষ্ট থাকত না। শুটিং শেষ হওয়ার পর দুজনের কাছে রাত মানেই ছিল শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা দেওয়া আর হঠাৎ কোনো পছন্দের খাবারের দোকানে থেমে যাওয়া। সেই বন্ধুত্বের গল্প একসময় ছিল চলচ্চিত্র অঙ্গনের অতি পরিচিত স্মৃতি। অথচ প্রায় তিন দশক পর সেই একই ডনকে এখন সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলার আসামি হিসেবে কারাগারে যেতে হয়েছে। ঘটনাটি পুরোনো এক বন্ধুত্বের স্মৃতিকে নতুন এক আইনি বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

চলচ্চিত্রে আশরাফুল হক ডন মূলত খলচরিত্রের অভিনেতা হিসেবে দর্শকের কাছে পরিচিতি পান। অন্যদিকে সালমান শাহ ছিলেন নব্বইয়ের দশকের ঢালিউডের সবচেয়ে আলোচিত তারকাদের একজন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের অভিনয়জীবনে তিনি ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর অভিনয়, পোশাক, চুলের স্টাইল, সংলাপ এবং ব্যক্তিত্ব তখনকার তরুণ প্রজন্মের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের পর সেই জনপ্রিয় নায়ককে ঘিরে তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ী এক রহস্য, যার অবসান আজও হয়নি।সালমানের সঙ্গে ডনের সম্পর্ক শুধু একই সিনেমায় অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শুটিংয়ের বাইরে তাঁদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বও ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ।
ডনের পুরোনো স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, কাজ শেষ হওয়ার পর প্রায়ই তাঁরা দুজন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। কোথায় যাবেন, তার কোনো পূর্বপরিকল্পনা থাকত না। ঢাকার বিভিন্ন সড়কে গাড়ি চালাতে চালাতে কখনো গুলশান, কখনো উত্তরা-এভাবেই কেটে যেত রাতের অনেকটা সময়। সালমান শাহ নিজে গাড়ি চালাতে ভালোবাসতেন এবং লং ড্রাইভ ছিল তাঁর অন্যতম পছন্দের বিনোদন।এই রাতভর ঘোরাঘুরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু ছোট ছোট অথচ স্মরণীয় গল্প। লং ড্রাইভের একপর্যায়ে তাঁরা প্রায়ই গুলশানের একটি সাধারণ রেস্তোরাঁয় যেতেন। সেখানে মিল্কশেক ছিল সালমানের বিশেষ পছন্দের। ডনের ভাষ্য অনুযায়ী, এমনও হয়েছে যে শুধু সালমানের জন্য রাতে দোকান খোলা রাখা হয়েছিল। দুজন সেখানে বসে মিল্কশেক খেতেন, আড্ডা দিতেন, তারপর আবার গাড়ি নিয়ে ঢাকার রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন।

তারকা হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের মতো এসব ছোট আনন্দ উপভোগ করতেন সালমান-বন্ধুর স্মৃতিতে যার একটি স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত ছবি পাওয়া যায়।উত্তরার ফুটপাতের একটি চিতই পিঠার দোকানের সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল তাঁদের বন্ধুত্বের স্মৃতি। সেখানে এক বয়স্ক নারী পিঠা তৈরি করতেন। সালমান তাঁকে ডাকতেন ‘নানি’ বলে। দুজন মিলে এক বসায় নয়-দশটি পর্যন্ত চিতই পিঠা খেয়ে ফেলতেন। পিঠা খাওয়ার পর দাম দেওয়ার সময়ও সালমানের উদারতার কথা স্মরণ করেছিলেন ডন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, অল্প কিছু পিঠা খেয়েও সালমান অনেক বেশি টাকা দিয়ে দিতেন। আজকের আলোচনায় এই স্মৃতিগুলো নতুন করে সামনে আসার কারণ, যে মানুষটির সঙ্গে ডনের এমন ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের গল্প ছিল, সেই সালমান শাহর মৃত্যুর মামলাতেই বহু বছর পর ডন আসামির তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর প্রথমদিকে ঘটনাটি অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয়। পরে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্তের দাবি ওঠে। দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক পর্যায়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলেছে। ১৯৯৭ সালে মামলাটি হত্যার অভিযোগের দিক থেকে তদন্তের আওতায় আসে এবং তৎকালীন সিআইডি তদন্ত শেষে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময় বিচারিক তদন্তও একই ধরনের সিদ্ধান্ত দেয়। ২০২০ সালে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করে। ২০২১ সালে আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করেছিল।তবে সালমানের পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ছিল না। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার একটি আদালত তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা আবারও জাতীয় আলোচনায় ফিরে আসে। এরপর ২০ অক্টোবর রাতেই তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে রমনা থানায় হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, আশরাফুল হক ডনসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।

মামলার পর ডনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর ঢাকার একটি আদালত সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডন ও সামিরা হকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের আগস্টে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা মামলাটিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে আদালতে হাজির করা হয় এবং তদন্তের স্বার্থে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়। পরে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।আদালতে ডনের পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গেছে। অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, মামলার এজাহারে ডনসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তদন্ত এখনো চলমান। দীর্ঘদিন তিনি পলাতক ছিলেন-এমন তথ্য উল্লেখ করে তদন্তের স্বার্থে তাঁকে কারাগারে রাখার আবেদন করা হয়। তবে মামলায় আসামি হওয়া বা গ্রেপ্তার হওয়া মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
এদিকে মামলার তদন্তও এখনো শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তদন্ত কর্মকর্তা তা দাখিল করতে পারেননি। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ৩০ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। এটি ছিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়ানোর অষ্টম ঘটনা।সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা বক্তব্য, অভিযোগ, তদন্ত ও পাল্টা বক্তব্য থাকায় মামলাটির প্রতিটি নতুন পদক্ষেপ জনমনে কৌতূহল তৈরি করছে। ডনের গ্রেপ্তার সেই কৌতূহলকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে তাঁর সঙ্গে সালমান শাহর পুরোনো বন্ধুত্বের কারণে। যে মানুষটি একসময় সালমানের সঙ্গে রাতের ঢাকায় উদ্দেশ্যহীনভাবে গাড়ি নিয়ে ঘুরেছেন, গুলশানে মিল্কশেক খেয়েছেন কিংবা উত্তরার ফুটপাতে বসে চিতই পিঠা খেয়েছেন, আজ তিনিই সেই তারকার মৃত্যুর মামলায় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন-সময়ের এই বৈপরীত্যই ঘটনাটিকে আরও আলোচিত করে তুলেছে।
তবে পুরোনো স্মৃতি আর বর্তমান আইনি অভিযোগকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। ডনের সঙ্গে সালমান শাহর বন্ধুত্বের স্মৃতিগুলো তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি অধ্যায় আর হত্যা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। কোনটি সত্য, কোন অভিযোগের পেছনে কতটা প্রমাণ রয়েছে এবং ১৯৯৬ সালের সেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল-তার উত্তর শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হওয়ার কথা।
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর মামলাটি যখন আবার নতুন করে তদন্তের পথে, তখন দর্শকের আগ্রহও স্বাভাবিকভাবেই তীব্র। কারণ এটি শুধু একজন জনপ্রিয় নায়কের মৃত্যুর মামলা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি প্রজন্মের আবেগ, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় এবং বহু বছর ধরে চলে আসা একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। ডনের গ্রেপ্তার সেই পুরোনো প্রশ্নকে আবার সামনে এনে দিয়েছে-সালমান শাহর মৃত্যুর পেছনে আসলে কী ঘটেছিল? এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের। বহু বছরের জল্পনা-কল্পনার বাইরে গিয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সত্যটি সামনে আসবে-সালমান শাহর পরিবার, তাঁর অগণিত ভক্ত এবং সাধারণ দর্শকের প্রত্যাশা এখন সেদিকেই।