হুমায়ুন আহমেদকে স্মরণ করে যে কথা জানালেন জাহিদ হাসান…

ফারহান তানভীর:

বাংলা নাটকের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষের নাম আছে, যাদের অবদান কেবল সফল নাটক নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা শিল্পীদের জীবনেও রেখে গেছেন গভীর ছাপ। সেই তালিকার একেবারে সামনের সারিতে থাকবেন কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। তার সঙ্গে কাজ করা অসংখ্য শিল্পী আজও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এমন সব স্মৃতি ভাগ করে নেন, যা একজন নির্মাতা হিসেবে নয়, একজন অসাধারণ মানুষ হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদকে নতুন করে চিনতে শেখাবে। ঠিক তেমনই একটি ঘটনা সম্প্রতি স্মরণ করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা জাহিদ হাসান।

ঘটনাটি সেই সময়ের, যখন হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘নক্ষত্রের রাত’-এর শুটিং চলছিল। নাটকটিতে অভিনয় করেছিলেন জাহিদ হাসান, আজিজুল হাকিম, শাওন, আবুল হায়াত, শমী কায়সার, আফসানা মিমি, আসাদুজ্জামান নূরসহ দেশের অনেক জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী। জাহিদ হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় নাটকের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সবারই ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল। ছিলনা শুধু জাহিদ হাসান এবং আজিজুল হাকিমের।একদিন শুটিং চলাকালীন তাদের দুজনকে ডেকেছিলেন প্রযোজক বুলবুল ভাই। তিনি তাদের দুজনকে বলেছিলেন, “তোদেরও একটা করে গাড়ি কেনা দরকার। এখন সময় হয়েছে।” কথাটি শুনে জাহিদ হাসান ও আজিজুল হাকিম সত্যিই গাড়ি কেনার চিন্তা করেন।

সেদিন বিকেলে শুটিং বন্ধ থাকায় তারা বেরিয়ে পড়েন গাড়ির খোঁজে। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর একটি গ্যারেজে দুটি পুরোনো গাড়ি পছন্দও করে ফেলেন। ফিরে এসে বুলবুল ভাইকে জানালেন, দুটি গাড়ির দাম মিলিয়ে এক লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে।এই কথা শুনে বুলবুল ভাই কিছুক্ষণ চুপ করে জাহিদ হাসানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর এক ধরনের আক্ষেপ নিয়েই বলেছিলেন, “ব্যাটা, তুই তো জীবনে বড় হতে পারবি না! মানুষের স্বপ্ন বড় হওয়া উচিত। জীবনের প্রথম গাড়ি কিনবি, আর সেটাও দুইজনে মিলে এক লাখ টাকার?”নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য যে জাহিদ হাসানের নেই, সেটা জানিয়েই জাহিদ বলেছিলেন, “ভাই, নতুন গাড়ি কিনব, সেই টাকা কোথায়?”তখনই বুলবুল ভাই বলেন, “গাড়ি কিনবি তুই, টাকার ব্যবস্থা করব আমি। তোকে কি আমি টেনশন করতে বলেছি?”জাহিদ হাসান জানান, এই কথাটি শুনে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।

শুটিং সেটের সবাই জেনেছিলেন জাহিদ হাসান ও আজিজুল হাকিম নতুন গাড়ি কিনতে যাচ্ছেন। খবরটি পৌঁছে গিয়েছিল নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের কাছেও। তিনি দুজনকে নিজের কাছে ডাকেন। তারা ভেবেছিলেন হয়তো অন্য কোনো কাজের কথা বলবেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা দেখলেন, তা আজও জাহিদ হাসানের কাছে অবিশ্বাস্য স্মৃতি হয়ে আছে।হুমায়ূন আহমেদ একটি পলিথিনে ভর্তি টাকা তাদের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, “শুনলাম, গাড়ি কিনবে? গাড়ি কেনার জন্য নাকি পাগল হয়ে গেছো! এই নাও টাকা, যাও-দুজন গাড়ি কিনে ফেলো।”জাহিদ হাসানের ভাষ্যমতে, সেই পলিথিনে আনুমানিক ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকার মতো ছিল। সে সময়ের হিসেবে যা ছিল বিশাল অঙ্কের অর্থ। আরও বড় বিষয় হলো, এই সাহায্য তিনি করেছিলেন কোনো প্রচার, কোনো শর্ত কিংবা কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়াই।

একজন নির্মাতা হিসেবে নয়, পরিবারের বড় একজন অভিভাবকের মতোই তিনি শিল্পীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি ছিল মানুষের সম্ভাবনায় বিশ্বাস করা। তিনি শুধু ভালো অভিনেতা খুঁজতেন না, চাইতেন তাদের জীবনও এগিয়ে যাক। তার কাছে শিল্পীরা ছিলেন সহকর্মী নয়, পরিবারের সদস্যের মতো। তাই কারও স্বপ্ন ছোট হলে তিনি সেটিকে বড় করতে চাইতেন, আবার প্রয়োজন হলে নিজের সামর্থ্য দিয়েই সেই স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করে দিতেন।

জাহিদ হাসানের এই স্মৃতিচারণ তাই কেবল একটি গাড়ি কেনার গল্প নয়। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি নিজের সাফল্যের পাশাপাশি আশপাশের মানুষদেরও বড় হতে দেখতে চাইতেন। বর্তমান সময়ে যখন সম্পর্কের চেয়ে স্বার্থের হিসাবই বেশি চোখে পড়ে, তখন হুমায়ূন আহমেদের মতো মানুষের এমন উদারতার গল্প নতুন করে মনে করিয়ে দেয়-মহান মানুষদের পরিচয় শুধু তাদের সৃষ্টিতে নয়, তাদের ব্যবহারে, তাদের মানবিকতায় এবং অন্যের জীবনে রেখে যাওয়া ভালোবাসাতেও লুকিয়ে থাকে।