ফারহান তানভীর:
বাংলা চলচ্চিত্রে নায়ক অনেকেই এসেছেন, সুপারস্টারও হয়েছেন অসংখ্য। কিন্তু ‘মহানায়ক’ উপাধিটি আজও যেন একজনের নামের সঙ্গেই অবিচ্ছেদ্য-উত্তম কুমার। কারণ, তিনি শুধু রুপালি পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাঙালির আবেগ, রুচি, প্রেম, স্বপ্ন আর সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক। তাঁর হাসি, সংলাপ, দৃষ্টির ভাষা কিংবা অভিনয়ের সহজাত স্বাভাবিকতা আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে কলকাতায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তবে মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পর তাঁর জনপ্রিয়তা এতটুকু ম্লান হয়নি। আজও তাঁর সিনেমা নতুন দর্শক খুঁজে পায়, অভিনয় নিয়ে গবেষণা হয় আর মৃত্যুবার্ষিকী এলেই দুই বাংলায় ফিরে আসে তাঁকে ঘিরে অসংখ্য স্মৃতি, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায় জন্মগ্রহণ করেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটির ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। পরিবারের নাট্যদল ‘সুহৃদ সমাজ’-এর মঞ্চ, স্কুলের নাটক কিংবা পাড়ার থিয়েটারের মহড়া-যেখানেই অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই নিজেকে মেলে ধরেছেন। সাউথ সাবার্বান স্কুলে পড়াশোনা শেষে গোয়েঙ্কা কলেজে কমার্সে ভর্তি হলেও সংসারের টানাপোড়েনের কারণে উচ্চশিক্ষা শেষ করা সম্ভব হয়নি। জীবিকার তাগিদে কলকাতা পোর্ট কমিশনার্স অফিসে সাধারণ কেরানির চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু চাকরি তাঁর স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারেনি। দিনের কাজ শেষে অভিনয়ের নেশাই তাঁকে টেনে নিয়ে যেত স্টুডিওপাড়া আর নাট্যমঞ্চে।
১৯৪৭ সালে উত্তম কুমার প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পান ‘মায়াডোর’ ছবিতে। কিন্তু ছবিটি মুক্তিই পায়নি। এরপর মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি ‘দৃষ্টিদান’ দিয়েও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। একে একে ‘কামনা’, ‘মর্যাদা’, ‘সহযাত্রী’, ‘নষ্টনীড়’, ‘সঞ্জীবনী’, ‘কার পাপে’সহ বেশ কয়েকটি ছবি ব্যর্থ হয়। স্টুডিওপাড়ায় তাঁকে নিয়ে বিদ্রূপ করা হতো, কেউ কেউ ডাকতেন ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ বলে। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এই তরুণের অভিনয়জীবনের ইতি ঘটতে চলেছে। কিন্তু ব্যর্থতার কাছে আত্মসমর্পণ করার মানুষ ছিলেন না অরুণ কুমার। বরং প্রতিটি ব্যর্থতা তাঁকে আরও পরিণত আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। অভিনয়ের সূক্ষ্মতা, সংলাপ বলার ভঙ্গি, অভিব্যক্তি-সবকিছু নিয়ে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন।
এই কঠিন সময়েই উত্তম কুমারের প্রতিভার ওপর আস্থা রাখেন কিংবদন্তি অভিনেতা পাহাড়ী সান্যাল। নির্মাতা নির্মল দে তখন ‘বসু পরিবার’ ছবির জন্য নতুন নায়ক খুঁজছিলেন। পাহাড়ী সান্যালই অরুণ কুমারের নাম প্রস্তাব করেন। শুধু তা-ই নয়, তিনিই ‘অরুণ কুমার’-এর পরিবর্তে ‘উত্তম’ নাম ব্যবহারের পরামর্শ দেন। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস। ‘বসু পরিবার’ সাফল্য পায়, আর ১৯৫৩ সালে সুচিত্রা সেনকে নিয়ে মুক্তি পাওয়া ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তাঁকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার শিখরে। এরপর ১৯৫৪ সালের ‘অগ্নিপরীক্ষা’ শুধু একটি সফল সিনেমাই ছিল না, এটি জন্ম দেয় বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি-উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন। পর্দায় তাঁদের রসায়ন এতটাই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল যে দর্শক বাস্তব জীবনেও তাঁদের একসঙ্গে কল্পনা করতে শুরু করেন। এরপর ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘শিল্পী’সহ একের পর এক চলচ্চিত্রে এই জুটি বাংলা সিনেমাকে নিয়ে যায় এক নতুন উচ্চতায়।

তবে উত্তমকুমারকে শুধু রোমান্টিক নায়ক হিসেবে বিচার করলে ভুল হবে। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ভাষাই বদলে দিয়েছিলেন। যখন অনেক অভিনেতার অভিনয়ে মঞ্চের প্রভাব স্পষ্ট ছিল, তখন উত্তমকুমার ক্যামেরার জন্য তৈরি করেন এক স্বাভাবিক, সংযত এবং আধুনিক অভিনয়ধারা। তাঁর চোখের ভাষা, সংলাপ উচ্চারণ, শরীরী অভিব্যক্তি-সবকিছুই ছিল অনন্য। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এ একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকার অন্তর্দ্বন্দ্বকে তিনি যে গভীরতায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা আজও ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সেরা অভিনয় হিসেবে বিবেচিত হয়। ‘চিড়িয়াখানা’য় ব্যোমকেশ বক্সীর চরিত্রেও তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দেন। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘গৃহদাহ’, ‘অমানুষ’, ‘আনন্দ আশ্রম’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তিনি প্রমাণ করেছেন, যেকোনো ধরনের চরিত্রে নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে গড়ে তুলতে তিনি ছিলেন অসাধারণ।
তিন দশকের অভিনয়জীবনে তিনি দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। অভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি পরিচালক, প্রযোজক, সুরকার এমনকি প্লেব্যাক গায়ক হিসেবেও কাজ করেছেন। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ২৯টি এবং অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে সর্বাধিক ৩২টি ছবিতে অভিনয় করেন। ১৯৬৭ সালে ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ ছবির জন্য ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান অর্জন করেন, যা তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি। বাংলা সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে হিন্দি ভাষার ‘অমানুষ’ ও ‘আনন্দ আশ্রম’-এর মতো চলচ্চিত্রেও তিনি দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।
উত্তমকুমারের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। স্ত্রী গৌরী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সংসার এবং একমাত্র ছেলে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক সে সময় ব্যাপক আলোচিত ছিল। তবে ব্যক্তিগত জীবনের নানা চড়াই-উতরাই কখনোই তাঁর অভিনয়জীবনকে ম্লান করতে পারেনি। বরং প্রতিটি চরিত্রে তিনি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। ঘনিষ্ঠজনদের কাছে তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত, রসবোধসম্পন্ন, অতিথিপরায়ণ এবং সহকর্মীদের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক একজন মানুষ।

১৯৮০ সালে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির শুটিং চলাকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন উত্তমকুমার। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ২৪ জুলাই তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই কলকাতা কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। শেষবারের মতো প্রিয় অভিনেতাকে দেখতে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। কেওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হলেও মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান আজও অটুট।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে সিনেমা দেখার মাধ্যম, বদলেছে দর্শকের রুচিও। তবু উত্তমকুমারের আবেদন কমেনি। টেলিভিশন, ইউটিউব কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম-সব জায়গাতেই তাঁর সিনেমা নতুন প্রজন্মের দর্শকদের আকৃষ্ট করছে। অভিনয়শিল্পের শিক্ষার্থীরা আজও তাঁকে অনুসরণ করেন, চলচ্চিত্র গবেষকেরা তাঁর অভিনয়ভঙ্গি নিয়ে বিশ্লেষণ করেন। কলকাতার একটি মেট্রো স্টেশনের নামও রাখা হয়েছে ‘মহানায়ক উত্তমকুমার’। এসবই প্রমাণ করে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নায়ক নন; তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের এক চিরন্তন উত্তরাধিকার। ব্যর্থতার অন্ধকার পেরিয়ে যিনি নিজের মেধা, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ইতিহাস লিখেছিলেন, সেই উত্তমকুমার আজও কোটি দর্শকের হৃদয়ে একইভাবে বেঁচে আছেন। তাই বাংলা সিনেমার ইতিহাস লেখা হলে মহানায়কের অধ্যায় কখনো শেষ হওয়ার নয়।