ফারহান তানভীর :
বাংলা চলচ্চিত্রে এমন কিছু সিনেমা আছে, যেগুলো শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ, সম্পর্ক এবং শিল্পীদের প্রতি সম্মানের কারণেও বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মান্না অভিনীত ‘রংবাজ বাদশা’ তেমনই একটি সিনেমা। মুক্তির পর এটি দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং বাণিজ্যিকভাবেও সফল হয়। তবে এই সিনেমার শুরুতেই ভেসে ওঠা একটি নাম দর্শকদের আলাদা করে নাড়া দিয়েছিল। সেটি ছিল প্রয়াত অ্যাকশন কিং জসিমের নাম। কারণ সিনেমাটি তাঁকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। আর সেই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল নির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবরের দীর্ঘদিনের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং একটি অপূর্ণ ইচ্ছার গল্প।

নব্বইয়ের দশকে ঢালিউডে অ্যাকশন সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী নাম ছিলেন জসিম। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং পর্দা দাপিয়ে বেড়ানোর স্টাইল তাঁকে আলাদা উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। ঠিক সেই সময়ই পরিচালক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করছিলেন মনতাজুর রহমান আকবর। একের পর এক অ্যাকশনধর্মী সিনেমা নির্মাণ করে তিনি দর্শকদের নজর কাড়তে শুরু করেন। অন্যদিকে মান্নাও তখন ধীরে ধীরে নিজের জায়গা শক্ত করছিলেন। পরবর্তীতে আকবর-মান্না জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে সাফল্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। অনেকেই সেই সময় মান্নার অ্যাকশন ঘরানার অভিনয়ের সঙ্গে জসিমের তুলনা করলেও বাস্তবে দুজনের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের।
পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবরের ভাষ্য অনুযায়ী, জসিম কখনোই মান্নাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেননি। বরং একজন সিনিয়র শিল্পী হিসেবে তিনি নতুনদের উৎসাহ দিতেন এবং তাদের কাজ মনোযোগ দিয়ে দেখতেন। আকবরের পরিচালিত সিনেমা দেখে তিনি তাঁর সম্পর্কে জানতে পারেন এবং পরে এফডিসিতে দেখা হলে প্রায়ই ডেকে গল্প করতেন। নতুন একজন নির্মাতার প্রতি জসিমের আন্তরিক আচরণ আকবরকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। তিনি স্মরণ করেন, একদিন মজা করেই জসিম বলেছিলেন, “তুমি তো মান্নাকে নিয়ে আমার ধাঁচের সিনেমা বানাচ্ছ, এবার আমাকে নিয়েও একটা অ্যাকশন ছবি বানাও।”

সময়ের সঙ্গে জসিম এবং আকবরের সম্পর্ক আরও আন্তরিক হয়ে ওঠে। বিভিন্ন আড্ডা ও আলোচনায় চলচ্চিত্রের নানা বিষয় নিয়ে কথা হতো। একপর্যায়ে মনতাজুর রহমান আকবর জসিমকে নিয়ে একটি বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনাও করেন। ‘বশিরা’ নামে একটি গল্প শোনানোর পর জসিম সেটি খুব পছন্দ করেছিলেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, গল্পটি যেন তাঁর জন্যই লেখা হয়েছে এবং তিনি অবশ্যই এই চরিত্রে অভিনয় করতে চান। কিন্তু নানা কারণে শেষ পর্যন্ত সেই সিনেমায় অভিনয় করেন মান্না। তবুও বিষয়টি নিয়ে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা মনোমালিন্য তৈরি হয়নি। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক অটুটই ছিল।
এরই মধ্যে মুক্তি পায় মনতাজুর রহমান আকবর পরিচালিত ‘শান্ত কেন মাস্তান’। সিনেমাটি দর্শকদের দারুণ সাড়া পায় এবং ব্যবসায়িকভাবে বড় সফলতা অর্জন করে। সিনেমাটি দেখে জসিম নির্মাতাকে ডেকে প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ছবির অ্যাকশন দৃশ্যগুলো দেখে তাঁর নিজের অভিনয়ের কথাই মনে হয়েছে। একজন প্রতিষ্ঠিত তারকার কাছ থেকে এমন স্বীকৃতি পাওয়া আকবরের জন্য ছিল অসাধারণ প্রেরণা। তখনই তাঁদের মধ্যে ভবিষ্যতে একসঙ্গে বড় একটি সিনেমা করার ইচ্ছা আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই বছরই জসিম পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। ফলে বহুদিনের সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।

জসিমের অকাল প্রয়াণ শুধু তাঁর পরিবার বা সহকর্মীদের জন্য নয়, পুরো বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্যই ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। মনতাজুর রহমান আকবরের মনেও থেকে যায় একটি গভীর আফসোস-যাঁর সঙ্গে এত পরিকল্পনা ছিল, তাঁকে নিয়ে একটি সিনেমাও নির্মাণ করা হলো না। ঠিক সেই সময় প্রযোজক মীর এনামুল করিম আমানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি শুরু করেন ‘রংবাজ বাদশা’র কাজ। জসিম ছিলেন প্রযোজক আমানেরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই দুজনেরই মনে হয়েছিল, তাঁদের এই নতুন সিনেমার মাধ্যমে প্রয়াত এই কিংবদন্তি অভিনেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানানো উচিত।সেই ভাবনা থেকেই ‘রংবাজ বাদশা’ সিনেমাটি আনুষ্ঠানিকভাবে জসিমকে উৎসর্গ করা হয়।
সিনেমাটি মুক্তির সময় দর্শকরাও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছিলেন। বিশেষ করে জসিমের অসংখ্য ভক্ত সিনেমার শুরুতেই তাঁর নাম দেখে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। মান্নাও এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ছিলেন এবং তিনি মনে করেছিলেন, বাংলা চলচ্চিত্রের একজন মহান অভিনেতার প্রতি এটি ছিল যথার্থ সম্মান প্রদর্শন।
মুক্তির ২৫ বছর পর আজও ‘রংবাজ বাদশা’ শুধু একটি সফল বাণিজ্যিক সিনেমা হিসেবেই নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের দুই প্রজন্মের দুই অ্যাকশন নায়কের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসার এক অনন্য দলিল হিসেবে স্মরণ করা হয়। সিনেমাটি মনে করিয়ে দেয়, শিল্পের জগতে প্রতিযোগিতার চেয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যই একজন শিল্পীকে প্রকৃত অর্থে বড় করে তোলে। জসিমের প্রতি নির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবর ও প্রযোজক মীর এনামুল করিম আমানের এই সম্মান প্রদর্শন আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি আবেগঘন অধ্যায় হয়ে আছে।