মারা গেছেন রুনা লায়লা?

ফারহান তানভীর:

মৃত্যুর গুজব যেন পিছু ছাড়ছে না উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার। কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর মৃত্যুর খবর। শুধু তাই নয়, এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ভিডিও ও ছবি ব্যবহার করে এমনভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে, যা দেখে অনেকেই সত্যি মনে করে ফেলেছেন বিষয়টি। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিল্পীর অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগীর মধ্যে। তবে বাস্তবতা কিন্তু একেবারেই ভিন্ন,কারণ রুনা লায়লা জীবিত এবং সুস্থ আছেন।

৯ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যার শিরোনাম ছিল ‘মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন রুনা লায়লা’। ভিডিওটি ঘিরেই নতুন করে শুরু হয় গুঞ্জন। পরে জানা যায়, ভিডিও ও এর সঙ্গে ব্যবহৃত কিছু ছবি বাস্তব কোনো ঘটনার ভিত্তিতে তৈরি নয়; বরং এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। রুনা লায়লার একমাত্র মেয়ে তানি লায়লা বিষয়টি প্রকাশ্যে এনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, তাঁর মা সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং তাঁকে নিয়ে ছড়ানো এসব খবর পুরোপুরি মিথ্যা।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তানি লায়লা লেখেন, সামান্য কিছু অর্থ উপার্জনের আশায় এ ধরনের পোস্ট, এআই দিয়ে তৈরি ইউটিউব ভিডিও এবং ভুয়া খবর ছড়ানোর বিষয়টি দেখে তিনি সত্যিই বিরক্ত ও অতিষ্ঠ। তাঁর বক্তব্যে শুধু ক্ষোভ নয়, দীর্ঘদিন ধরে তারকা ও তাঁদের পরিবারকে ঘিরে ছড়ানো এমন মিথ্যা খবরের কারণে তৈরি হওয়া অসহায়ত্বও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তানি জানান, তাঁর মা জীবনের ছয়টি দশক সংগীতের সেবায় উৎসর্গ করেছেন। অথচ তাঁকে নিয়েই বারবার এ ধরনের অসম্মানজনক ও মিথ্যা কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে-যা তাঁর কাছে অত্যন্ত লজ্জাজনক ও অপমানজনক।স্পষ্টভাবে তানি জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমার মা সম্পূর্ণ সুস্থ ও জীবিত আছেন; কেউ মারা যাননি বা মৃত্যুর মুখেও নেই।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিও ও ছবি এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের প্রতিও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কোনো তথ্য যাচাই না করে রুনা লায়লার মতো একজন বর্ষীয়ান শিল্পীকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার না করার অনুরোধ করেছেন তানি। পাশাপাশি ভুয়া কনটেন্ট ছড়ানো অ্যাকাউন্টগুলো রিপোর্ট করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

রুনা লায়লাকে নিয়ে মৃত্যুর গুজব অবশ্য এবারই প্রথম নয়। চলতি বছরের মে মাসেও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। ভারতের দিল্লিতে একটি পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। গুজব এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে বিভিন্ন দেশ থেকে রুনা লায়লার পরিচিতজন, ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে ফোন করে তাঁর শারীরিক অবস্থার খবর জানতে শুরু করেন। তখন দিল্লি থেকেই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছিলেন রুনা লায়লা নিজে।সেই সময় রুনা লায়লা জানিয়েছিলেন, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ও ভালো আছেন। নিজের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়াকে তিনি ‘অদ্ভুত মিথ্যা তথ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। বিভিন্ন দেশ থেকে একের পর এক ফোন ও বার্তা পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, এমন গুজব শুধু একজন শিল্পীকে নয়, তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। একই ধরনের গুজব অতীতেও বিভিন্ন তারকাকে ঘিরে ছড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি ধারণা প্রকাশ করেছিলেন, এসবের পেছনে সংঘবদ্ধ কোনো গোষ্ঠী কাজ করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, যারা এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে, তাদের শনাক্ত করা উচিত।

মে মাসের সেই ঘটনার পর এবার বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে। কয়েকটি ছবি বা পুরোনো ফুটেজকে নতুনভাবে সাজিয়ে তার সঙ্গে চটকদার শিরোনাম জুড়ে দিলে মুহূর্তেই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। দর্শকের আবেগ, বিশেষ করে কোনো প্রিয় তারকার অসুস্থতা বা মৃত্যুর মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে কাজে লাগিয়ে ভিউ ও আয়ের চেষ্টা যে কতটা ভয়াবহ আকার নিতে পারে, রুনা লায়লাকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি তারই উদাহরণ।

রুনা লায়লা এখনও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত আছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও তিনি বিভিন্ন সংগীতানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। গত আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার দুটি অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত কনসার্টে গান পরিবেশন করেছেন তিনি। এর আগে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত একটি একক সংগীতানুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলেন এই শিল্পী। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ঘিরে যে অসুস্থতা কিংবা মৃত্যুর ছবি আঁকা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।রুনা লায়লার দীর্ঘ ছয় দশকের সংগীতজীবন তাঁকে শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠশিল্পীতে পরিণত করেছে। সেই কারণেই তাঁকে নিয়ে যেকোনো নেতিবাচক খবর মুহূর্তে মানুষের আবেগকে নাড়া দেয়। ভক্তরা উদ্বিগ্ন হন, স্বজনরা আতঙ্কিত হন, আর পরিবারের মানুষকে বারবার প্রমাণ করতে হয়-খবরটি মিথ্যা। এবারও তেমনটাই হয়েছে। একদিকে রুনা লায়লার নিজের মুখে আগেই জানানো হয়েছিল তিনি সুস্থ আছেন, অন্যদিকে তাঁর মেয়ে তানি লায়লাকেও প্রকাশ্যে এসে মায়ের জীবিত ও সুস্থ থাকার কথা জানাতে হয়েছে।

প্রযুক্তি যত আধুনিক হচ্ছে, তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বও তত বাড়ছে। বিশেষ করে কোনো মানুষের মৃত্যু, অসুস্থতা কিংবা পারিবারিক সংকটের মতো সংবেদনশীল বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলেই তা সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। রুনা লায়লাকে ঘিরে সাম্প্রতিক গুজবের ঘটনাও আবার মনে করিয়ে দিল, কয়েক সেকেন্ডের একটি এআই ভিডিও যেমন হাজারো মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে, তেমনি একটি যাচাইহীন পোস্ট একটি পরিবারের জন্য তৈরি করতে পারে গভীর মানসিক চাপ। তাই রুনা লায়লার পরিবার যেমন ভুয়া কনটেন্ট রিপোর্ট করার আহ্বান জানিয়েছে, তেমনি গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের জন্যও সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে তথ্য যাচাই করে তারপর কোনো খবর বিশ্বাস বা প্রচার করা।

সবশেষে সত্যিটা একেবারেই পরিষ্কার-রুনা লায়লা মারা যাননি, গুরুতর অসুস্থও নন। তিনি জীবিত ও সুস্থ আছেন। মৃত্যুর গুজবের বিরুদ্ধে এবার তাঁর মেয়ে তানি লায়লার ক্ষোভের পাশাপাশি আগের গুজবের সময় নিজের মুখে দেওয়া রুনা লায়লার বক্তব্যও স্পষ্ট করে দেয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া চটকদার শিরোনাম আর বাস্তবতার মধ্যে কতটা বড় ফারাক থাকতে পারে।