রায়হান রাফী পরিচালিত “আন্ধার” ঘিরে বাড়ছে উন্মাদনা, টিজারে মুগ্ধ দর্শক!

ফারহান তানভীর :

রায়হান রাফীর নতুন সিনেমা ‘আন্ধার’ নিয়ে বিগত কয়েক মাস ধরে যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে, গতকাল টিজার প্রকাশের পর সেটি যেন আরও কয়েক গুণ থেকে কয়েকশো গুণ বেড়ে গেছে। সিনেমাটির প্রথম পোস্টার, একের পর এক চরিত্রের লুক এবং টিজার প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছিল। তবে টিজার সামনে আসার পর বিভিন্ন সিনেমাভিত্তিক পেজ ও গ্রুপে দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে প্রবল আগ্রহ ও ইতিবাচক উচ্ছ্বাস। কেউ প্রশংসা করছেন সিনেমাটির ভিজ্যুয়াল, কেউ সাউন্ড ডিজাইন ও সিনেমাটোগ্রাফির, আবার কারও আলোচনার কেন্দ্রে সিয়াম আহমেদের রহস্যময় চরিত্র কিংবা নাজিফা তুষির লুক ও অভিনয়ের আভাস। সব মিলিয়ে মুক্তির আগেই ‘আন্ধার’ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সিনেমাগুলোর মধ্যে আলোচিত একটি নাম হয়ে উঠেছে।

আন্ধার থেকে নাজিফা তুষি

‘আন্ধার’ নির্মাণ করেছেন রায়হান রাফী। অ্যাকশন, থ্রিলার ও কমার্শিয়াল সিনেমায় নিজের আলাদা দর্শক তৈরি করা এই নির্মাতা এবারই প্রথম বড় পরিসরে ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত ঘরানার গল্প নিয়ে হাজির হচ্ছেন। সিনেমাটির গল্পের সঙ্গে যুক্ত আছেন ব্যান্ড সংগীতের দুই পরিচিত নাম সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন ও শাকিব চৌধুরী এবং চিত্রনাট্য ও সংলাপের সঙ্গে রয়েছেন শাকিব চৌধুরী ও আদনান আদিব খান। নির্মাতার ভাষ্য অনুযায়ী, সিনেমাটির গল্প পড়েই তিনি এটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।

‘আন্ধার’-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি এর তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী তালিকা। কেন্দ্রীয় চরিত্র ডিটেকটিভ দেলোয়ারের ভূমিকায় আছেন সিয়াম আহমেদ। ২০১৮ সালের ‘পোড়ামন ২’-এ রায়হান রাফী ও সিয়াম জুটি বাঁধার পর দামাল,তান্ডবে কাজ করেছেন এবং তারা আন্ধারেও আবারও একসঙ্গে কাজ করছেন। নির্মাতার বর্ণনায় দেলোয়ার একজন ক্লাসিক হিরোয়িক চরিত্র, যিনি শার্লক হোমস কিংবা ব্যাটম্যানের মতো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়বেন। তবে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়, বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তার উদ্দেশ্য। রাফীর মতে, কয়েকজন অভিনেতাকে বিবেচনার পর শেষ পর্যন্ত সিয়ামকেই এই চরিত্রের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হয়েছিল এবং শুটিং শেষে তার মনে হয়েছে, ‘দেলোয়ার মানেই সিয়াম’।আন্ধারে সিয়ামের বিপরীতে আছেন নাজিফা তুষি। সিনেমাটিতে তার চরিত্রের নাম নাদিয়া। প্রকাশিত টিজারে তাকে অশুভ শক্তির নজরে পড়া এক রহস্যময় ও বিপর্যস্ত নারীর চরিত্রে দেখা গেছে। আয়নার সামনে তার দৃশ্য, ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং কালোজাদু-ঘেরা আবহ ইতিমধ্যেই চরিত্রটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। ২০২৫ সালে সিয়ামের সঙ্গে তুষির জুটি নিয়ে খবর প্রকাশের পর থেকেই তাদের প্রথম বড়পর্দার জুটি নিয়েও আগ্রহ ছিল।

আন্ধারের টিজার থেকে

আন্ধারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন চঞ্চল চৌধুরী। তার চরিত্রের নাম শামসের। চঞ্চল নিজেই জানিয়েছেন, ‘আন্ধার’-এর গল্প ও চরিত্র তাকে আকৃষ্ট করেছে কারণ বাংলাদেশের সিনেমায় এ ধরনের গল্প আগে তিনি দেখেননি। সিনেমাটির জন্য তার চরিত্রের উপযোগী করে একটি দোতলা বাড়ি পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছিল। শুটিংয়ের আগে অভিনয়শিল্পীরা গাজীপুরে সাত দিন রিহার্সালও করেছেন এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ পরিকল্পিত। অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য বিদেশ থেকেও লোক আনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন চঞ্চল।আন্ধারে আরও অভিনয় করেছেন মোস্তফা মনওয়ার, আফসানা মিমি, গাজী রাকায়েত, তানজিকা আমিন, ফররুখ আহমেদ রেহান, স্বর্ণালী চৈতীসহ একঝাঁক শিল্পী। ফররুখ আহমেদ রেহান ও স্বর্ণালী চৈতির বড়পর্দায় অভিষেকও হচ্ছে ‘আন্ধার’ দিয়ে। রেহান এর আগে ‘আরারাত’ সিরিজের ক্লাইম্যাক্সে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের নজর কেড়েছিলেন। ‘আন্ধার’-এর প্রকাশিত লুকে তার উপস্থিতিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় এসেছে।

আন্ধারে চঞ্চল চৌধুরী

শুধু তারকা বা গল্প নয়, সিনেমাটির নির্মাণপরিসরও শুরু থেকেই আলোচনায়। ‘আন্ধার’কে বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাজেটের সিনেমা হিসেবে প্রচার করা হলেও নির্দিষ্ট বাজেটের অঙ্ক এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৫ সালে `দ্যা ডেইলি স্টার’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রায়হান রাফী জানিয়েছিলেন, সিনেমাটির পোস্ট-প্রোডাকশন বাজেট তার আগের যেকোনো কাজের চেয়ে বেশি হবে। বাংলাদেশেই শুটিং করে রাস্তা, লেক ও ক্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছিল বলেও তিনি জানান। একই সাক্ষাৎকারে সিনেমাটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেটের সিনেমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।এই বড় আয়োজনের ছাপ টিজার ও ট্রেলারেও চোখে পড়ছে। ১ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের টিজারে মৃত্যু, রহস্য, কালোজাদু, অন্ধকার জঙ্গল, রক্তাক্ত হাত, লাশ এবং অস্বাভাবিক নানা ঘটনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সিয়ামকে কখনো লাশের সামনে তদন্তরত, কখনো অ্যাকশন অবতারে দেখা গেছে; শেষ দিকে তার জ্বলজ্বলে নীল চোখও নতুন রহস্য তৈরি করেছে। নাজিফা তুষিকে ঘিরে ভয় ও অতিপ্রাকৃত আবহ, চঞ্চল চৌধুরী ও গাজী রাকায়েতের রহস্যময় উপস্থিতি-সব মিলিয়ে টিজার গল্পের পুরোটা না বলে বরং প্রশ্ন বাড়িয়েছে।

আন্ধারের টিজার থেকে

আন্ধার সিনেমার প্রযুক্তিগত দিকটিও দর্শকদের আলোচনার অন্যতম কেন্দ্র। বিভিন্ন সিনেমাভিত্তিক পেজ ও গ্রুপের প্রতিক্রিয়ায় বারবার দেখা যাচ্ছে সিনেমাটোগ্রাফি, সাউন্ড ডিজাইন, কালার গ্রেডিং, ভিএফএক্স, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং সামগ্রিক আবহের প্রশংসা। কেউ সিয়ামের ডিটেকটিভ চরিত্র ও নাজিফা তুষির উপস্থিতিকে আলাদা করে প্রশংসা করছেন। যদিও এগুলো দর্শক ও সিনেমাপ্রেমীদের ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া, তবু প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি বিষয় স্পষ্ট-‘আন্ধার’ মুক্তির আগেই প্রত্যাশার জায়গাটি অনেকটা উঁচু করে ফেলেছে।

মুক্তির সময় নিয়েও এখন আর খুব বেশি অনিশ্চয়তা নেই। সিনেমাটির প্রথম অফিসিয়াল পোস্টারে অক্টোবর ২০২৬-এ মুক্তির কথা জানানো হয়েছে। রায়হান রাফীও জানিয়েছেন, দুর্গাপূজার সময় ছবিটি মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে দুর্গাপূজার মৌসুমে একটি বড় আয়োজনের হরর সিনেমা হিসেবে হাজির হতে যাচ্ছে ‘আন্ধার’।সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্য সিনেমাটি দর্শকদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারবে। কারণ ট্রেলার ও টিজার এখন পর্যন্ত যে আবহ তৈরি করেছে, তাতে দর্শকের প্রত্যাশা শুধু ‘ভালো একটি হরর সিনেমা’ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই; অনেকে ইতিমধ্যেই এটিকে বাংলাদেশের হরর ঘরানায় সম্ভাব্য মাইলফলক হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। চঞ্চল চৌধুরীর ভাষাতেও সিনেমাটি বাংলাদেশের প্রচলিত কাজের বাইরে একটি নতুন অভিজ্ঞতা।

আন্ধারে সিয়াম আহমেদ

ফলে ‘আন্ধার’-এর সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ-একদিকে বড় বাজেট, তারকাবহুল কাস্ট ও রায়হান রাফীর নামের প্রত্যাশা; অন্যদিকে টিজার-ট্রেলার দেখে তৈরি হওয়া দর্শকের বিপুল প্রত্যাশা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বর্তমান প্রতিক্রিয়া বলছে, সিনেমাটি দেখার জন্য দর্শকের আগ্রহ ইতিমধ্যেই তৈরি। এখন সেই আগ্রহকে প্রেক্ষাগৃহের টিকিটে এবং শেষ পর্যন্ত সন্তুষ্ট দর্শকের মুখের কথায় রূপ দিতে পারে কি না, সেটিই হবে ‘আন্ধার’-এর আসল পরীক্ষা।