ফারহান তানভীর :
ঢাকাই চলচ্চিত্রে অনেক জুটি পর্দায় জনপ্রিয় হয়েছে, অনেক জুটি আবার বাস্তব জীবনেও পেয়েছে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের পরিচয়। তবে মৌসুমী ও ওমর সানীর গল্পটা যেন একটু আলাদা। নব্বইয়ের দশকে পর্দার জনপ্রিয় জুটি থেকে বাস্তব জীবনের দম্পতি হওয়া, এরপর তিন দশকের বেশি সময় সংসার করা-এই দীর্ঘ পথচলায় তাঁদের ঘিরে যেমন ভালোবাসা ও প্রশংসা এসেছে, তেমনি এসেছে নানা আলোচনা, অভিমান আর বিচ্ছেদের গুঞ্জনও। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দুজনের দীর্ঘ শারীরিক দূরত্বকে কেন্দ্র করে আবারও প্রশ্ন উঠেছিল, সত্যিই কি ভেঙে গেছে তাঁদের সংসার?

বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে যখন জানা যায়, মৌসুমী দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় তিনি দেশে ফেরেননি। অন্যদিকে ওমর সানীও একই সময়ে তাঁর নিজের কাজ ও ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ সরাসরি তাঁদের দাম্পত্যে ফাটলের কথা বলতে থাকেন, আবার কোথাও কোথাও ছড়িয়ে পড়ে বিচ্ছেদের মতো আরও চাঞ্চল্যকর দাবি। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ কখনোই সামনে আসেনি। এর আগেও ২০২২ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের গুজব ছড়িয়েছিল, যা পরে ফ্যাক্টচেকেও মিথ্যা বলই প্রতীয়মান হয়।
গুঞ্জন যতই ছড়িয়েছে, সানী-মৌসুমীর সম্পর্ক নিয়ে মানুষের আগ্রহও তত বেড়েছে। কারণ তাঁদের সম্পর্কের শুরুটা ছিল সিনেমার গল্পের মতোই। ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির পর কয়েকজন প্রযোজকের উদ্যোগে ‘দোলা’ ছবিতে প্রথমবার জুটি বাঁধেন তাঁরা। শুটিংয়ের সময় দুজনের মধ্যে মনোমালিন্যও হয়েছিল। কিন্তু সেই দূরত্বই একসময় বদলে যায় অন্যরকম ভালো লাগায়। মৌসুমীর ব্যক্তিত্ব, পরিবারের মানুষের আন্তরিকতা এবং তাঁর আচরণ ধীরে ধীরে আকৃষ্ট করে ওমর সানীকে। পরে ‘আত্ম অহংকার’ ছবির শুটিংয়ের সময় তাঁদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।
এরপর ১৯৯৫ সালের ৪ মার্চ দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠ মানুষ এবং চলচ্চিত্রের দুজন পরিচালকের উপস্থিতিতে গোপনে বিয়ে করেন মৌসুমী ও ওমর সানী। বিয়ের খবর তখন তাঁরা প্রকাশ্যে আনেননি। দুজনেই নিয়মিত অভিনয় চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বলে বিষয়টি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে তাঁদের সংসারে আসে দুই সন্তান-ফারদীন ও ফাইজা। ধীরে ধীরে অভিনয়জীবনের পাশাপাশি তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি পরিবারের অভিভাবক।

তাঁদের বিবাহোত্তর সংবর্ধনাও ছিল বেশ আলোচিত। গোপনে বিয়ের প্রায় পাঁচ মাস পর ১৯৯৫ সালের ২ আগস্ট আয়োজন করা হয় সেই অনুষ্ঠান। মহাখালী ডিওএইচএস থেকে শাহবাগের শেরাটন হোটেল পর্যন্ত ঘোড়ার গাড়িতে ওমর সানীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আর পেছনে ছিল ১১৭টি গাড়ির বহর। সময়ের হিসাবে সেই আয়োজনও এখন ঢাকাই চলচ্চিত্রের তারকা দম্পতিদের আলোচিত বিয়ের স্মৃতির অংশ।
তিন দশকের এই সংসারে অবশ্য সব সময় যে সবকিছু একেবারে মসৃণ ছিল, তা নয়। মতের অমিল, অভিমান কিংবা ব্যক্তিগত ভুল-এসবের কথাও দুজনেই বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। কিন্তু সানীর ভাষায়, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার মূল জায়গা ছিল বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস এবং পরস্পরের জন্য ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা। তাঁর মতে, তাঁরা দুজনেই মানুষ, তাই ভুল হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ব্যক্তিগত বিষয়কে অতিরঞ্জিত করে বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।সাম্প্রতিক সময়ে বিচ্ছেদের গুঞ্জন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ওমর সানীও বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, স্বামী-স্ত্রী দুজনের শারীরিক দূরত্বকে তিনি সম্পর্কের দূরত্ব হিসেবে দেখেন না। পৃথিবীর অসংখ্য দম্পতি কাজ কিংবা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন আলাদা দেশে থাকেন-শুধু তারকা হওয়ার কারণে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলাদা করে গল্প তৈরি হওয়াটা তিনি স্বাভাবিকভাবে নেননি।
বরং স্ত্রী মৌসুমীর প্রতি তাঁর অনুভূতি এখনো আগের মতোই আছে বলে জানিয়েছেন সানী। তাঁর কাছে মৌসুমীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি তাঁর যত্নশীল স্বভাব। পাশাপাশি মৌসুমীর জেদও তাঁর ভালো লাগে। সানীর ভাষায়, মৌসুমী অনেক কথা নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখতে পারেন, তাঁর নিজের আবার ধৈর্য তুলনামূলক কম। মতের অমিল থাকলেও সেই পার্থক্যই হয়তো তাঁদের সম্পর্কের আরেকটি বাস্তব দিক।

স্ত্রী হিসেবে মৌসুমীর পরিচয়ের চেয়েও সন্তানদের মা হিসেবে তাঁর ভূমিকা সানীর কাছে বড়। ফারদীন ও ফাইজাকে ঘিরে মৌসুমীর চিন্তা, দায়িত্ববোধ এবং পরিবারের প্রতি টানকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। এমনকি সংসারের সাধারণ কিছু ঘটনাও সানীর কাছে মৌসুমীর এই স্বভাবেরই প্রকাশ। সন্তানদের জন্য খাবার আলাদা করে রাখা থেকে শুরু করে তাঁদের প্রয়োজন নিয়ে চিন্তা-সবকিছুর মধ্যেই তিনি একজন মায়ের নিবেদনের জায়গাটা দেখেন।
মৌসুমীর আরেকটি গুণের কথাও সানী বলেছেন-পরিবারের প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা। স্ত্রীকে নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি যেমন প্রশংসা করেছেন, তেমনি এটাও স্বীকার করেছেন যে তাঁদের দুজনেরই এমন কিছু অভ্যাস আছে, যা অন্যজনের সব সময় ভালো লাগে না। রাই বলাই যায় সম্পর্ককে তিনি কোনো রূপকথার নিখুঁত গল্প হিসেবে না দেখে ভালোবাসা, বিরক্তি, ভুল, ক্ষমা, মানিয়ে নেওয়া আর একে অন্যের পাশে থাকার সমন্বয় হিসেবেই দেখেন।
সবচেয়ে বড় কথা, বিচ্ছেদের গুঞ্জনের মধ্যেও সানীর নিজের কথাতেই তাঁর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। স্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ‘এই বয়সেও এসে আমি বলব, ফারদীন-ফাইজার আম্মু,তোমাকে ভালোবাসি।’ এ বছর ২ আগস্ট তাঁদের দাম্পত্যজীবনের ৩১ বছর পূর্ণ হয়েছে। সেই উপলক্ষে সানী আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস এবং ত্যাগের মানসিকতাই তাঁদের সম্পর্ককে এত দূর এনেছে। তাঁর কথায়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সত্য কথা বলা এবং প্রয়োজনমতো একে অন্যকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা না থাকলে কোনো সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একই সঙ্গে মৌসুমীকে নিয়ে তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আই লাভ ইউ’, এমনকি জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও তিনি তাঁকে একই কথা বলতে চান।
তাই মৌসুমী ও ওমর সানীর সম্পর্ক নিয়ে বিচ্ছেদের গুঞ্জন যতবারই সামনে আসুক, এখন পর্যন্ত তাঁদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিচ্ছেদের কোনো ঘোষণা আসেনি। বরং সানীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে পাওয়া যাচ্ছে দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে নিয়ে ভালোবাসা, অভিমান, পারস্পরিক ভুল এবং সংসার টিকিয়ে রাখার বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাই। তিন দশকের বেশি সময়ের এই সম্পর্কে তাই হয়তো সিনেমার মতো নিখুঁত কোনো গল্প নেই; আছে বাস্তব জীবনের মতোই নানা বাঁক। আর সেই কারণেই পর্দার এই জনপ্রিয় জুটির ব্যক্তিগত জীবনের গল্প এত বছর পরও দর্শকের আগ্রহ ধরে রেখেছে।