সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডলি জহুরের সম্পৃক্ততা কতটা?

ফারহান তানভীর :

মাত্র ২৫ বছর বয়সে ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর আকস্মিক মৃত্যু আজও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর শুরু হয়েছিল যে আইনি ও তদন্তপ্রক্রিয়া, প্রায় তিন দশক পরও তার শেষ হয়নি। বরং ২০২৫ সালে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে নতুন করে সামনে আসার পর এবং ২০২৬ সালে মামলার অন্যতম আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। এরই মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে অভিনেত্রী ডলি জহুরের নাম। সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেছেন, তদন্তের স্বার্থে ডলি জহুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী তিনি মামলার আসামিও হতে পারেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডলি জহুরকে এখন পর্যন্ত এই মামলায় আসামি করা হয়নি এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে-এমন কোনো আনুষ্ঠানিক পুলিশি সিদ্ধান্তও প্রকাশ্যে নিশ্চিত হয়নি।

সালমান শাহ, পারিবারিক নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নিউ ইস্কাটনের বাসায় মারা যান। ওই দিন তাঁর মরদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে তৎকালীন বর্ণনায় উঠে আসে। পরে মরদেহ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং ময়নাতদন্তের পর তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখা হয়। মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেন। কিন্তু শুরু থেকেই সালমানের পরিবার, বিশেষ করে তাঁর মা নীলা চৌধুরী, মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে মেনে নেননি।ঘটনার তদন্তে প্রথম বড় মোড় আসে ১৯৯৭ সালে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি-৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়। কিন্তু পরিবার ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তাঁর বাবা সিআইডির প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদন করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানোর নির্দেশ দেন। দীর্ঘ সময় পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে। সেখানেও সালমান শাহর মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি; ঘটনাটিকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এরপর নীলা চৌধুরী আবারও আদালতে রিভিশন আবেদন করেন এবং ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন।পিবিআই দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২১ সালে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনের মূল সিদ্ধান্তও ছিল-সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি, তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

পিবিআই তাঁর আত্মহত্যার পেছনে কয়েকটি কারণের কথাও উল্লেখ করেছিল। কিন্তু নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি আবেদন করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, তদন্ত নিরপেক্ষভাবে হয়নি এবং হত্যার অভিযোগ যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি। এখানেই দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই নতুন দিকে মোড় নেয়।শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত নীলা চৌধুরীর নারাজি আবেদন মঞ্জুর করে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যা হিসেবে মামলা করার নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশে আগের অপমৃত্যু মামলার কার্যক্রম বাতিল করে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় এজাহার গ্রহণ এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের আদেশে রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে আসে।

এর পর ২১ অক্টোবর ২০২৫ রাতে সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন, সামিরার মা লতিফা হক লুছি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আবদুস সাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়। অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনের কথাও এজাহারে রাখা হয়।এই মামলার অন্যতম আলোচিত বিষয় রিজভী ওরফে ফরহাদের পুরোনো জবানবন্দি। রাষ্ট্রপক্ষের সাম্প্রতিক আদালত উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালে অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর রিজভী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে সালমান শাহকে হত্যার বিষয়ে দাবি করেছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে হত্যার অভিযোগ এবং পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে সাজানোর কথা বলা হয়েছিল। তবে এগুলো বর্তমানে মামলার অভিযোগ ও রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত বক্তব্য-আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সত্য নয়।

২০২৬ সালের আগস্টে মামলাটি আবার ব্যাপক আলোচনায় আসে অভিনেতা ডনের গ্রেপ্তারের কারণে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর সৌদি আরব যাওয়ার সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতে হাজির করা হলে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, মামলার তদন্ত চলছে এবং ডনকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলমান। বর্তমানে মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখ নির্ধারিত রয়েছে।আর ঠিক এই পর্যায়েই সামনে এসেছে ডলি জহুরের নাম।

নীলা চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, সালমান শাহর মৃত্যুর দিনের ঘটনা সম্পর্কে ডলি জহুরের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে। বিশেষ করে সালমান শাহর মৃত্যুর দিন শাবনূরের বাসায় কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে ডলি জহুর বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক আলোচনায় নীলা চৌধুরী মনে করছেন, এসব তথ্য তদন্তের আওতায় এনে ডলি জহুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। একই সঙ্গে তিনি ডিপজল ও শিবা শানুর মতো চলচ্চিত্র অঙ্গনের আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।প্রায় ৩০ বছর ধরে সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে যে প্রশ্নটি ঘুরছে-তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে সাজানো হয়েছিল-তার উত্তর এখনো আদালতের চূড়ান্ত রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং ১৯৯৭ সালের সিআইডি, ২০১৪ সালের বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং ২০২১ সালের পিবিআই তদন্ত-সবগুলো সিদ্ধান্তের বিপরীতে ২০২৫ সালের আদালতের আদেশে ঘটনাটি হত্যা হিসেবে নতুন করে তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই তদন্তেই এখন পুরোনো জবানবন্দি, নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া আসামি এবং মৃত্যুর দিনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ তথ্য জানা ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ডলি জহুরকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনা তাই মামলার আরেকটি নতুন অধ্যায় মাত্র-চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তদন্ত প্রতিবেদন ৩০ আগস্ট জমা দেওয়ার কথা থাকায় আগামী কয়েক দিন এই মামলার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ডনের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে কী তথ্য বেরিয়ে আসে, অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, পুরোনো ১৬৪ ধারার জবানবন্দি কীভাবে মূল্যায়ন করা হয় এবং ডলি জহুরসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের অন্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে তদন্তকারীরা আদৌ কোনো বক্তব্য নেন কি না-এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে প্রায় তিন দশকের পুরোনো এই রহস্য কোন দিকে এগোয়।

আপাতত নিশ্চিত সত্য একটাই: সালমান শাহর মৃত্যুর কারণ নিয়ে আইনি বিতর্ক শেষ হয়নি; বরং ২০২৫ সালে নতুন করে হত্যা মামলা এবং ২০২৬ সালে ডন গ্রেপ্তারের পর সেই বিতর্ক আবারও দেশের সামনে সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র-রহস্য হিসেবে ফিরে এসেছে।