একদিনের ঝড়েই শেষ `টক্সিক’ এর গল্প!

ফারহান তানভীর :

২০২৬ সালের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমাগুলোর একটি হওয়ার কথা ছিল যশ অভিনীত ‘টক্সিক: আ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোন-আপস’। চার বছর পর ‘কেজিএফ: চ্যাপ্টার ২’-এর পর বড় পর্দায় যশের প্রত্যাবর্তন, গীতু মোহনদাসের মতো প্রশংসিত নির্মাতা, নয়নতারা ও কিয়ারার মতো তারকা এবং প্রায় ৪৫০ কোটি রুপির বিশাল নির্মাণ ব্যয়-সব মিলিয়ে সিনেমাটিকে ঘিরে প্রত্যাশার মাত্রা ছিল আকাশচুম্বী। মুক্তির আগের প্রচার-আলোচনাও বলছিল, এটি যশের ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় সাফল্য হতে যাচ্ছে। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার পর গল্পটা একেবারেই অন্যরকম হয়ে দাঁড়ায়। দুর্দান্ত উদ্বোধনের পর দ্রুত দর্শক হারাতে থাকে সিনেমাটি। দুই সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিশ্বব্যাপী আয় আটকে আছে প্রায় ৩৪০ কোটি রুপিতে। আর সেই কারণেই এখন বড় তারকার বড় বাজেটের সিনেমা হয়েও ‘টক্সিক’কে বছরের অন্যতম বড় আর্থিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

`টক্সিক’-এর ব্যর্থতার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, ছবিটির শুরুটা মোটেও ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়নি। বরং প্রথম দিনেই সিনেমাটি এমন ব্যবসা করেছিল, যাতে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন সামনে বড় কোনো রেকর্ড অপেক্ষা করছে। বিভিন্ন বক্স অফিস হিসাব অনুযায়ী, মুক্তির প্রথম দিনে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৪০ কোটি রুপি আয় করে ‘টক্সিক’। শুধু ভারতেই প্রথম দিনের আয় ছিল প্রায় ১০১ কোটি রুপি। চার বছর পর যশকে বড় পর্দায় দেখতে দর্শকের আগ্রহ, প্যান-ইন্ডিয়া বাজারে সিনেমাটির ব্যাপক প্রচার এবং বিশাল পরিসরের নির্মাণ-সবকিছু মিলিয়ে উদ্বোধন ছিল প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকেই ছবিটির ব্যবসার গতি বদলে যায়। ভারতে দ্বিতীয় দিনের আয় নেমে আসে প্রায় ৩৭ কোটি রুপিতে। এরপর প্রথম সোমবার তা ১০ কোটির নিচে চলে যায়। সেখান থেকে আর উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি সিনেমাটি। বরং প্রতিদিনই আয় কমেছে। মুক্তির ১৫ দিন শেষে বিশ্বব্যাপী ছবিটির মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৩৯ কোটি ৩২ লাখ রুপি। ১৬তম দিনে ভারতে যোগ হয়েছে আরও প্রায় ৩৯ লাখ রুপি। ফলে ভারতের মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ২৪৮ কোটি ২৪ লাখ রুপি। এই অবস্থায় বিশ্বব্যাপী ৩৫০ কোটি রুপির গণ্ডি পার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ট্রেড বিশ্লেষক রমেশ বালার হিসাব অনুযায়ী, ‘টক্সিক’-এর বিশ্বব্যাপী শেয়ার প্রায় ১৫০ কোটি রুপি। অর্থাৎ দর্শকের কাছ থেকে প্রেক্ষাগৃহে যে অর্থ এসেছে, তার পুরোটাই প্রযোজকের হাতে যায়নি। সিনেমার ব্যবসার ক্ষেত্রে বক্স অফিসের মোট আয় এবং প্রযোজক বা পরিবেশকের প্রকৃত প্রাপ্ত অর্থ এক বিষয় নয়। প্রেক্ষাগৃহের মালিক, পরিবেশকসহ বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আয়ের অংশ ভাগ হয়। ফলে প্রায় ৩৪০ কোটি রুপি বিশ্বব্যাপী আয় করলেও সেটিকে সরাসরি ৩৪০ কোটি রুপি প্রযোজকের আয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সিনেমাটির প্রকৃত বাজেট নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো হিসাব প্রকাশ্যে নেই। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৪৫০ কোটি রুপি বলা হয়েছে। এর সঙ্গে প্রচার, মুক্তি, সুদ ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে মোট বিনিয়োগ ৫০০ কোটি রুপি বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৪০ কোটি রুপির গ্রস আয় কোনোভাবেই এই বিপুল বিনিয়োগের সমান নয়। রমেশ বালার হিসাবে, সিনেমাটির লোকসান ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি রুপির মধ্যে হতে পারে। এমনকি তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছবিটি বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশও তুলতে পারেনি।

কোনো সিনেমার গ্রস বক্স অফিস আয় থেকে সরাসরি বাজেট বাদ দিয়ে লোকসান নির্ধারণ করা যায় না। কারণ প্রেক্ষাগৃহের ভাগ, পরিবেশকের অংশ এবং সিনেমার অন্যান্য আয়-ব্যয়ের হিসাব আলাদা। আবার স্যাটেলাইট, ডিজিটাল বা ওটিটি এবং সংগীতের স্বত্ব থেকেও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অর্থ পেতে পারে। তাই ‘টক্সিক’-এর চূড়ান্ত লোকসান ঠিক কত, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি রুপির যে হিসাব সামনে এসেছে, সেটি মূলত ট্রেড বিশ্লেষকের অনুমান।

সিনেমাটির আর্থিক ব্যর্থতাকে আরও বড় করে তুলেছে এর ওটিটি স্বত্ব বিক্রির সিদ্ধান্ত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তির আগে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল স্বত্ব বিক্রি করেনি। প্রত্যাশা ছিল, প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি বড় সাফল্য পেলে পরে আরও বেশি দামে ওটিটি স্বত্ব বিক্রি করা যাবে। কিন্তু বক্স অফিসে প্রত্যাশার বিপরীত ফল আসায় সেই সিদ্ধান্তই এখন আর্থিক ঝুঁকির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমেশ বালার মতে, আগে ওটিটি স্বত্ব বিক্রি করা হলে প্রায় ১০০ কোটি রুপির মতো ক্ষতি কমানো সম্ভব হতে পারত। মুক্তির আগে প্রায় ২০০ কোটি রুপি পর্যন্ত ওটিটি স্বত্বের সম্ভাব্য মূল্য নিয়ে আলোচনা থাকলেও এখন সেই মূল্য প্রায় ৩০ কোটি রুপিতে নেমে আসার কথা বলা হচ্ছে। যদিও এই অঙ্ক নিশ্চিত নয়, তবু বক্স অফিসের ব্যর্থতা যে সিনেমার অন্য স্বত্বের বাজারমূল্যেও প্রভাব ফেলে, ‘টক্সিক’ তার বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’ ও ‘হনুমান অংশ’র মতো সিনেমা বাজারে আসার পর দর্শক ও প্রেক্ষাগৃহের শো ভাগ হয়ে যায়। ফলে ‘টক্সিক’ ধীরে ধীরে স্ক্রিন ও শো হারাতে থাকে। প্রথম সপ্তাহেই যদি একটি সিনেমার আয় দ্রুত কমতে থাকে, তার ওপর নতুন সিনেমা এসে জায়গা দখল করলে পরবর্তী সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও অনেক কমে যায়। ‘টক্সিক’-এর ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে।

বড় বাজেটের ব্যর্থ সিনেমা হিসেবে যশের ছবিটির সঙ্গে এখন রামচরণ অভিনীত ‘গেম চেঞ্জার’ এবং প্রভাসের ‘আদিপুরুষ’-এর তুলনাও করা হচ্ছে অনেক জায়গাতেই।তিনটি সিনেমারই মিল রয়েছে-বড় তারকা, বিশাল বাজেট এবং প্যান-ইন্ডিয়া বাজারে বড় সাফল্যের প্রত্যাশা। ‘গেম চেঞ্জার’-এর বাজেট বিভিন্ন হিসাবে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি রুপির মধ্যে ধরা হয় এবং ছবিটির লোকসান প্রায় ২০০ কোটি রুপি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল। ‘আদিপুরুষ’-এর ক্ষেত্রেও ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি রুপি পর্যন্ত বাজেটের কথা সামনে এসেছিল। কিন্তু ‘টক্সিক’-এর বিষয়টি আলাদা করে আলোচনায় এসেছে এর উদ্বোধনের কারণে। কারণ অন্য অনেক ব্যর্থ বড় বাজেটের সিনেমার মতো এটি শুরু থেকেই দুর্বল ছিল না; বরং প্রথম দিনেই বিশাল আয় করার পর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ব্যবসায় এমন পতন ঘটেছে।

এদিকে ‘টক্সিক’ মুক্তির আগে যশ নিজেও বড় বাজেট ও লোকসান নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মানুষ হয়তো মনে করে তাঁর সিনেমা ১০০ বা ২০০ কোটি রুপি লোকসান করলে সেটি তাঁর জন্য খুব বড় বিষয় হবে। কিন্তু যশের কাছে বিষয়টি তেমন নয়। একসময় তাঁর পকেটে কিছুই ছিল না, তাই এখন যা আছে, সেটাকে তিনি বোনাস হিসেবেই দেখেন। তাঁর ভাষায়, জীবনে হারানোর মতো কিছুই নেই, তাই তাঁর কোনো ভয়ও নেই।

তবে একজন তারকার ব্যক্তিগত মানসিকতা আর একটি সিনেমার ব্যবসায়িক হিসাব এক জিনিস নয়। ‘টক্সিক’-এর ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা ছিল পুরো প্রযোজনা কাঠামোর। বিপুল বিনিয়োগ, বড় তারকার পারিশ্রমিক, দীর্ঘ নির্মাণপর্ব, প্যান-ইন্ডিয়া মুক্তির ওপর নির্ভরতা এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন স্বত্ব থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশা-সব মিলিয়ে ছবিটির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ছিল অনেক বড়। সেই পরিকল্পনার প্রধান ভিত্তি ছিল দর্শকের আগ্রহ ধরে রেখে দীর্ঘ সময় প্রেক্ষাগৃহে ভালো ব্যবসা করা। কিন্তু প্রথম দিনের পরই সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়ায় পুরো হিসাব নড়বড়ে হয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত ‘টক্সিক’-এর গল্প তাই শুধু একটি সিনেমার ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, ১০০ কোটির বেশি উদ্বোধনী আয় করেও একটি সিনেমা কীভাবে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। বক্স অফিসে প্রথম দিনের উচ্ছ্বাস দিয়ে একটি বড় বাজেটের সিনেমার সাফল্য নিশ্চিত হয় না; বরং দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত দর্শক ধরে রাখার ক্ষমতা, নির্মাণ ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য এবং বিভিন্ন স্বত্ব থেকে কতটা অর্থ ফেরত আসছে-এসবই শেষ পর্যন্ত হিসাবের ফল নির্ধারণ করে। ‘টক্সিক’ সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত লোকসানের নির্দিষ্ট অঙ্ক নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন হলেও একটি বিষয় এখন স্পষ্ট-যশের প্রত্যাবর্তন ঘিরে যে বিশাল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, প্রায় ৩৪০ কোটি রুপির বিশ্বব্যাপী আয় সেই প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দূরেই থেমে গেছে।