ফারহান তানভীর:
ভারতের ইতিহাসে এমন সিনেমা খুব বেশি নেই, যেগুলো মুক্তির পর খুব একটা ব্যবসা করতে না পারলেও কয়েক বছর পর ফিরে এসে ‘মাস্টারপিস’ তকমা অর্জন করেছে। ‘তুম্বাড়’ ঠিক তেমনই একটি সিনেমা। ২০১৮ সালে মুক্তির সময় এটি বক্স অফিসে খুব বড় সাফল্যের দেখা পায়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে তুম্বাড়ের নাম। ওটিটিতে মুক্তির পর অসংখ্য মানুষ সিনেমাটি দেখে মুগ্ধ হন। এরপর ২০২৪ সালে আবার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলে নতুন করে ইতিহাস গড়ে ‘তুম্বাড়’। আজ শুধু ভারতের নয়, বিশ্ব সিনেমার অন্যতম সেরা ফোক হরর চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত তুম্বাড়।

প্রায় ১৫ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত তুম্বাড় সিনেমার প্রযোজক ছিলেন সোহম শাহ, যিনি সিনেমার প্রধান চরিত্র বিনায়ক রাওয়ের ভূমিকায়ও অভিনয় করেছেন। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন জ্যোতি মালশে, অনিতা দাতে-কেলকার, রনজনা ধারকরসহ আরও অনেকে। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন রাহি অনিল বারভে। গল্পটি আবর্তিত হয়েছে মহারাষ্ট্রের রহস্যময় ‘তুম্বাড়’ নামের একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে, যেখানে লুকিয়ে আছে এক অভিশপ্ত গুপ্তধনের রহস্য। সেই গুপ্তধনের লোভই ধীরে ধীরে মানুষের বিবেক, সম্পর্ক এবং জীবনকে গ্রাস করে। মূলত মানুষের সীমাহীন লোভের ভয়াবহ পরিণতিই এই সিনেমার কেন্দ্রীয় বার্তা।
গল্প তো সাধারণই তবুও তুম্বাড় ইতিহাস গড়েছে।কারণ ‘তুম্বাড়’-কে অন্য সব সিনেমা থেকে আলাদা করেছে এর নির্মাণশৈলী। সিনেমাটি শেষ করতে সময় লেগেছে পুরো ছয় বছর। শুধু তাই নয়, শুটিং সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হয়েছে চারটি আলাদা বর্ষাকালের। নির্মাতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সিনেমার প্রতিটি বৃষ্টির দৃশ্য বাস্তব বৃষ্টিতেই ধারণ করবেন। বর্তমানে প্রযুক্তির যুগে চাইলে কৃত্রিম বৃষ্টি তৈরি করা কিংবা ভিএফএক্স ব্যবহার করে একই ধরনের দৃশ্য নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু নির্মাতারা সেই সহজ পথ বেছে নেননি। তারা চেয়েছিলেন দর্শক যেন পর্দায় প্রকৃতির বাস্তব রূপই অনুভব করতে পারেন।

তবে এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্যই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বৃষ্টি শুরু না হলে ক্যামেরা চালানোর সুযোগই ছিল না। আবার বৃষ্টি হলেই যে শুটিং সম্ভব, তাও নয়। আলো, বৃষ্টির তীব্রতা, পরিবেশ-সবকিছু পরিকল্পনার সঙ্গে মিলতে হতো। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি পাওয়া যেত না। কখনও বৃষ্টি হঠাৎ থেমে যাওয়ায় মাঝপথে শুটিং বন্ধ করতে হয়েছে, আবার কখনও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণেও কাজ আটকে গেছে। প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে কাজ করার ফলে শুটিং বারবার পিছিয়েছে, আর সেই কারণেই শেষ পর্যন্ত চারটি বর্ষাকাল লেগে যায় সিনেমাটির কাজ শেষ করতে।দর্শক যে দুই ঘণ্টার সিনেমা পর্দায় দেখেছেন, তার প্রতিটি বৃষ্টিভেজা দৃশ্যের পেছনে লুকিয়ে আছে বছরের পর বছর অপেক্ষা, অসংখ্য ব্যর্থ চেষ্টা এবং পুরো ইউনিটের অমানবিক পরিশ্রম। শুধু অভিনেতারাই নন, ক্যামেরাম্যান, লাইটিং টিম, আর্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে প্রতিটি সদস্যকে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই কাজ করতে হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সচল রাখা, একই ধরনের আবহ বজায় রাখা এবং প্রতিটি শট নিখুঁতভাবে ধারণ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। আর সেই পরিশ্রমের প্রতিফলনই দেখা গেছে সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে। এজন্যই অনেকে মনে করেন, ‘তুম্বাড়’-এর সিনেমাটোগ্রাফি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা।

তবে দুঃখের বিষয় হলো, মুক্তির সময় তুম্বাড় সিনেমাটি প্রত্যাশিত ব্যবসা করতে পারেনি। বিশ্বব্যাপী আয় প্রায় বাজেটের কাছাকাছিই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু দর্শকদের প্রশংসা না থামায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘তুম্বাড়’ একটি কাল্ট ক্লাসিকে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের রি-রিলিজে সিনেমাটি আবারও দর্শকদের হলে টেনে আনে এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি আয় করে প্রমাণ করে, ভালো সিনেমার মূল্য কখনও হারিয়ে যায় না।
এই বিপুল জনপ্রিয়তার পর নির্মাতারা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তুম্বাড় ২’-এর ঘোষণা দিয়েছেন। জানা গেছে সিক্যুয়েলের গল্প আরও বড় পরিসরে এগোবে। নতুন সিনেমায় আবারও ফিরবেন সোহম শাহ। প্রথম পর্বের রহস্য, অভিশাপ এবং লোভের গল্পকে আরও বিস্তৃত আকারে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে নির্মাতাদের। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ‘তুম্বাড় ২’ এখন ভারতীয় সিনেমাপ্রেমীদের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত প্রকল্পগুলোর একটি হয়ে গেছে।