ফারহান তানভীর :
বাংলা নাটকের ইতিহাসে কিছু সংলাপ আছে, যা সময় পেরিয়েও মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে। ঠিক তেমনই একটি সংলাপ- “গাঞ্জা খাইয়া কুল পাইনা, লেখাপড়া করুম কোন সমে?” আর এই সংলাপটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছেন নাট্য অভিনেতা ফারুক আহমেদ । সম্প্রতি নিজের ফেসবুক একাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি তুলে ধরেছেন এই জনপ্রিয় সংলাপের পেছনের অজানা গল্প, যা নতুন করে আলোচনায় এনেছে সেই কালজয়ী নাটক ‘বৃক্ষমানব’ এবং তার নির্মাতা কিংবদন্তি লেখক-নির্মাতা হুমায়ুন আহমেদ -কে।

ফারুক আহমেদ তার পোস্টে জানিয়েছেন, এই সংলাপটি বলা তার জন্য এতটা সহজ ছিল না, যতটা দর্শকদের কাছে মনে হয়েছে। এর পেছনে ছিল তার ব্যক্তিগত দ্বিধা এবং এক ধরনের নৈতিক অস্বস্তি। তিনি সরাসরি হুমায়ূন আহমেদকে বলেছিলেন যে, তিনি তো গাঁজা খান না, তাই এমন একটি সংলাপ বলা তার পক্ষে অস্বস্তিকর। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের জবাব ছিল একেবারে নাট্যদর্শনের মূলে আঘাত করা মতো। তিনি উলটো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন-“তুমি তো খুন করো না, তাই বলে কি খুনের দৃশ্য করো না?”

এই এক প্রশ্নেই ভেঙে যায় ফারুক আহমেদের সংশয়। নাটক এবং বাস্তবতার পার্থক্য যে কোথায়, সেটি তিনি তখন নতুন করে উপলব্ধি করেন। একজন অভিনেতার কাজ হলো চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা, নিজের ব্যক্তিগত অভ্যাস বা বিশ্বাস দিয়ে তাকে সীমাবদ্ধ করা নয়-এই শিক্ষা যেন তিনি সেদিন সরাসরি পেয়েছিলেন।

ওই সময়ে ফারুক আহমেদের সঙ্গে অভিনয়ে ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা চ্যালেঞ্জার । দু’জনের অনবদ্য কেমিস্ট্রি এবং দৃশ্যের ভেতরের বাস্তবধর্মী পরিবেশই সংলাপটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। তাদের পারস্পরিক রিঅ্যাকশন, টাইমিং এবং সংলাপের ওঠানামা-সব মিলিয়ে দৃশ্যটি আজও ব্যাপক আলোচিত।শেষ পর্যন্ত কিছুটা অনিচ্ছা নিয়েই দৃশ্যটি করেন ফারুক আহমেদ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দৃশ্যটি এক টেকেই ওকে হয়ে যায়। অভিনয়ের সেই স্বতঃস্ফূর্ততা এবং নির্মাতার নির্দেশনার নিখুঁত সমন্বয়ই সম্ভবত তৈরি করে সেই ম্যাজিক, যা আজও দর্শকদের মনে গেঁথে আছে।

সময়ের সাথে সাথে এই সংলাপটি শুধু একটি নাটকের অংশ হয়ে থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছে একটি সাংস্কৃতিক রেফারেন্স।বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই সংলাপটি যেন নতুন করে জীবন পেয়েছে। বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ, মিম কিংবা ফান কনটেন্টে এটি নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম, যারা হয়তো পুরো নাটকটি কখনো দেখেনি, তারাও এই সংলাপের সঙ্গে পরিচিত। ফারুক আহমেদের এই পোস্ট শুধু একটি স্মৃতিচারণ নয়, বরং এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় অভিনয়শিল্পের গভীরতা এবং দায়িত্বের কথা। একজন অভিনেতা কেবল নিজের মতো করে বাঁচেন না, বরং তিনি অসংখ্য চরিত্রের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকেন। আর সেই চরিত্রগুলোই কখনো কখনো তাকে অমর করে তোলে।