ফারহান তানভীর :
হুমায়ুন ফরীদি-সাধারণ একটি নাম নয়।বাংলাদেশের সাথে,বাংলাদেশের মানুষের সাথে এবং বাংলাদেশের অভিনয় জগতের সাথে এই নামটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি এখনো নিজের কাধে একটা পুরো সময়কে,একটা যুগকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। তার মারা যাওয়ার প্রায় ১৪ বছর অতিবাহিত হলেও তিনি সময়ের মতোই ধ্রুব,মারা গিয়েও আজও বেঁচে আছেন সকলের মনে। হুমায়ুন ফরীদি শুধু অভিনয়ের জন্যই সকলের মনে আছেন তা নয়- তিনি নিজের জ্ঞান,প্রজ্ঞা,ব্যক্তিত্ব সবকিছুর জন্যই এতো সম্মানিত। আর তার প্রমাণ যেন আফরান নিশো সবসময়ই দিয়ে চলেছেন।

সম্প্রতি ‘দাগি’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার জিতেছেন আফরান নিশো। পুরস্কার হাতে নিয়েই তিনি সেটি উৎসর্গ করেন হুমায়ুন ফরীদিকে। পরে যখন তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন নিশোর উত্তরে দেখা গিয়েছিল একজন শিল্পীর প্রতি আরেক শিল্পীর নিখাদ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর না-পাওয়ার বেদনা। তাঁর ভাষায়, “ফরীদি ভাই সম্পর্কে বলতে গেলে আসলে অনেক ইমোশনাল হয়ে যাই। আমি তাঁকে অনেক মিস করি।”
নিশো খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন, তিনি আগে প্রেমে পড়েছিলেন ব্যক্তি হুমায়ুন ফরীদির, তারপর পারফর্মার হুমায়ুন ফরীদির। বড় শিল্পী হওয়া আর বড় মানুষ হওয়া এক বিষয় নয়। অনেকেই অসাধারণ অভিনয় করতে পারেন, কিন্তু খুব কম মানুষই নিজের ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান, চিন্তাভাবনা আর আড্ডা দিয়ে অন্যদের মুগ্ধ করতে পারেন। হুমায়ুন ফরীদি ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি ক্যামেরার সামনে যেমন শক্তিশালী ছিলেন, ক্যামেরার বাইরেও তেমনই অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন।আফরান নিশো যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, সেটি হলো ফরীদির সঙ্গে তাঁর আড্ডা। কাজের বাইরের সেই সময়গুলোই তাঁকে সবচেয়ে বেশি টানত। কারণ সেই আড্ডায় ছিল জীবন নিয়ে কথা, শিল্প নিয়ে কথা, মানুষ নিয়ে কথা।

নিশোর ভাষায়, হুমায়ুন ফরীদি ছিলেন যেন একটা “উইকিপিডিয়া”। যেকোনো বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল বিস্ময়কর। একজন অভিনেতার জন্য এই বিষয়টা কত বড় শক্তি, সেটিও নিশো নিজের উপলব্ধি থেকে তুলে ধরেছেন। তাঁর বিশ্বাস, এত গভীর জ্ঞান আর জীবনবোধ থাকার কারণেই ফরীদি তাঁর অভিনয়কে এত বাস্তব করে তুলতে পারতেন।আসলে অভিনয় শুধু সংলাপ বলা নয়। অভিনয় মানে মানুষের মন বোঝা, জীবনের ভাঙাগড়া বোঝা, সমাজকে অনুভব করা। আর হুমায়ুন ফরীদি সেই জায়গাতেই ছিলেন অনন্য। তিনি যখন পর্দায় একজন ভিলেন হতেন, দর্শক তাঁকে ভয় পেত। আবার যখন ভেঙে পড়া কোনো মানুষের চরিত্রে অভিনয় করতেন, তখন দর্শকের চোখ ভিজে যেত। তাঁর অভিনয়ে কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল জীবনের গন্ধ। তাই আজও তাঁর অভিনয়ের দৃশ্যগুলো মানুষ নতুন করে দেখে, নতুন করে আবিষ্কার করে।
নিশো আক্ষেপ করে বলেছেন, এত বড় একজন অভিনেতা হয়েও হুমায়ুন ফরীদি সেভাবে পুরস্কৃত হননি। হয়তোবা এই আক্ষেপ শুধু নিশোর একার নয়, বাংলাদেশের অসংখ্য দর্শকেরও। কারণ অনেক সময় প্রকৃত শিল্পীরা জীবদ্দশায় সেই মূল্যায়ন পান না, যা তারা প্রাপ্য। পুরস্কারের মঞ্চে অনেক নাম উঠে আসে কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকেন খুব কম মানুষ। হুমায়ুন ফরীদি সেই অল্প কয়েকজনের একজন, যিনি কোনো ট্রফি বা সার্টিফিকেটের চেয়ে অনেক বড় কিছু অর্জন করেছেন-মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন।নিশো যখন বলেন, তাঁর প্রতিটি পুরস্কার তিনি হুমায়ুন ফরীদিকে উৎসর্গ করেন, তখন তা সম্মান জানানোর পাশাপাশি একধরনের প্রতিবাদও প্রকাশ করে। এই প্রতিবাদ সেই অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে, যেখানে একজন কিংবদন্তিকে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে এটি একজন জুনিয়র শিল্পীর পক্ষ থেকে তাঁর গুরুর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশও বটে।

আজকের সময়ে যখন অভিনয়ের জগতে বাহ্যিক চাকচিক্য, ভাইরাল হওয়া কিংবা সাময়িক জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা বেশি চোখে পড়ে, তখন আফরান নিশোর এই কথাগুলো অন্যরকম একটা অনুভূতি তৈরি করে। কারণ এখানে প্রতিযোগিতা নেই, আছে কৃতজ্ঞতা। এখানে নিজেকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা নেই, আছে একজন কিংবদন্তির প্রতি নিঃস্বার্থ শ্রদ্ধা।হুমায়ুন ফরীদি হয়তো আজ শারীরিকভাবে নেই কিন্তু তিনি এখনো বেঁচে আছেন তাঁর কাজের মধ্যে, তাঁর দর্শনের মধ্যে এবং তাঁর মতো হতে চাওয়া অসংখ্য শিল্পীর হৃদয়ে।
আর আফরান নিশোর মতো অভিনেতারা যখন প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে বলেন যে তাঁরা এখনো ফরীদিকে নিজের গুরু মনে করেন, তখন বোঝা যায় সত্যিকারের শিল্পীরা কখনো হারিয়ে যান না। তারা থেকে যান পরবর্তী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা হয়ে, থেকে যান ভালোবাসার আরেক নাম হয়ে।