ফারহান তানভীর :
মাইকেল জ্যাকসনের জীবন নিয়ে নির্মিত নতুন সিনেমা “মাইকেল” মুক্তির পর থেকেই বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনা তৈরি করেছে। এই সিনেমার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কিংবদন্তি পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসন। তার চরিত্রে অভিনয় করেছেন তারই নিজের ভাতিজা জেফার জ্যাকসন। জেফারকে কাস্ট করা নিঃসন্দেহে একটি সেরা সিদ্ধান্ত বলাই যায়। চরিত্রটি মাইকেলের চরিত্রকে এমনিতেই অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তার ভেতর মাইকেলের রক্তের মানুষই সেই চরিত্রে অভিনয় করায় মানুষের আবেগও অনেকটাই বাস্তবিক হয়ে গিয়েছিল।

জেফার জ্যাকসনও সেই চরিত্রে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। জানা যায়, এই চরিত্রে নিজেকে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর ডান্স ট্রেনিং নিয়েছেন, নিয়মিত পারফরম্যান্স প্র্যাকটিস করেছেন এবং নিজের শারীরিক গঠন থেকে শুরু করে লুক-সবকিছুতেই ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন। এমনকি নিজের ব্যক্তিগত জীবনকেও অনেকটাই সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিলেন, যাতে পুরো মনোযোগটা শুধু চরিত্রের ওপর দেওয়া যায়। অভিনয়ের ক্ষেত্রে এই ধরনের ডেডিকেশন নতুন কিছু নয়, কিন্তু জেফারের ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু ভিন্ন-কারণ তিনি শুধুমাত্র একটি চরিত্রে অভিনয় করেননি বরং নিজের পরিবারের একজন কিংবদন্তিকে জীবন্ত করে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

দর্শকদের মতে, সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্যে জেফারকে দেখে অনেক সময় সত্যিই মনে হয় যেন মাইকেল জ্যাকসন নিজেই ফিরে এসেছেন। তার শরীরি ভাষা, নাচের ভঙ্গিমা, স্টেজে উপস্থিতি-এসব জায়গায় মিলটা এতটাই স্পষ্ট যে দর্শক সহজেই আবেগে ভেসে গেছে। তবে সবকিছুর পরেও একটা সত্য থেকেই যায়-মাইকেল জ্যাকসনের মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি রিপ্লেস করা বা পুনরায় তৈরি করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কিছু পার্থক্য চোখে পড়বেই এবং সেটাই স্বাভাবিক।এই সিনেমার বাজেটও ছিল বিশাল, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২০০০ থেকে ২৪০০ কোটির কাছাকাছি। মুক্তির পরপরই বক্স অফিসে এর দুর্দান্ত সাড়া পাওয়া গেছে-প্রথম দিনেই বিপুল পরিমাণ আয় করে এটি সুপারহিট হবেই বলে ধরা হচ্ছে। আর এই সাফল্য অবশ্যই বুঝিয়ে দেয়,মাইকেল এখনো কতটা জনপ্রিয়।

সিনেমাটিতে মূলত মাইকেলের জীবনের শুরুর দিক থেকে আরম্ভ করে ক্যারিয়ারের উত্থান এবং সাফল্যের সময়টুকু তুলে ধরা হয়েছে। ছোটবেলায় তার কঠোর পারিবারিক পরিবেশ, বিশেষ করে বাবার চাপ এবং শাস্তির বিষয়গুলোও এতে উঠে এসেছে, যা তার জীবনের গঠন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সেই কঠিন শৈশব পেরিয়েই তিনি নিজের প্রতিভার মাধ্যমে পুরো বিশ্বের সংগীত জগতকে বদলে দেন এবং নিজের অবস্থানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।জীবনীচিত্র হলেও এই সিনেমা তার জীবনের সব দিক সমানভাবে দেখায়নি। বিশেষ করে পরবর্তী জীবনের বিতর্কিত এবং জটিল বিষয়গুলো অনেকটাই সীমিত রাখা হয়েছে। ফলে সিনেমাটিকে পুরোপুরি একটি নিরপেক্ষ জীবনীচিত্র না বলে বরং তার উত্থান এবং সাফল্যের একটি নিয়ন্ত্রিত উপস্থাপন হিসেবেই দেখা যায়। এই দিকটি নিয়ে অনেকের মধ্যেই ভিন্ন মত থাকতে পারে, তবে সিনেমাটির মূল উদ্দেশ্য যে দর্শকদের সামনে মাইকেল জ্যাকসনের উজ্জ্বল দিকটিই বেশি করে তুলে ধরা-তা স্পষ্ট।

মাইকেল জ্যাকসন শুধুমাত্র তার সময়ের একজন জনপ্রিয় শিল্পীই ছিলেন না, তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যার নাম এখনো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধ্বনিত হয়। আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, তাহলে তার প্রতিটি উপস্থিতি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করতো-এমন ধারণা অনেকেই পোষণ করেন। তার জনপ্রিয়তা, প্রভাব এবং পারফরম্যান্সের শক্তি তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে রেখেছে, যেখানে তাকে শুধু একজন মানুষ হিসেবে না দেখে বরং একটি যুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সব মিলিয়ে, মাইকেল সিনেমাটি মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের একটি নির্দিষ্ট অধ্যায়কে বড় পরিসরে তুলে ধরেছে। এটি তার ভক্তদের জন্য একটি আবেগঘন অভিজ্ঞতা আর নতুন প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী পরিচয়। যদিও এতে তার পুরো জীবনের সব দিক পাওয়া যায় না, তবুও তার কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্পটা যে এখানে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে-সেটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।