ফারহান তানভীর :
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু সংলাপ আছে, যা সিনেমার নয়, বাস্তব জীবনের-অথচ পর্দার সংলাপের থেকেও বেশি গভীর। ঠিক তেমনই এক উক্তি এসেছিল বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা মান্নার মুখ থেকে- “শাকিব বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির লাস্ট সুপারস্টার।”এই কথাটা একসময় বলেছিলেন খলনায়ক চরিত্রে জনপ্রিয় অভিনেতা শিবা শানুকে। কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই স্মৃতি টেনে আনেন।

শানু বলেন, “এফডিসিতে মান্না ভাইয়ের সঙ্গে একটা ছবির শুটিং করছিলাম। শাকিব খান তখন অন্য একটি ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিল। একসময় ও এফডিসির কইড়তলা দিয়ে যাচ্ছিল। আমি ওর সঙ্গে একটু গল্প করলাম। দূর থেকে মান্না ভাই সেটা দেখেছিলেন। পরে উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘ও (শাকিব) কি তোর বন্ধু?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’ তখনই উনি বললেন- ‘শাকিব বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির লাস্ট সুপারস্টার।”কেন এমন বলেছিলেন জানতে চাইলে মান্না ভাইয়ের ব্যাখ্যা ছিল নিখুঁত। শানুর ভাষায়, “মান্না ভাই বলেছিলেন, হিরো হতে হলে শুধু সুন্দর মুখই যথেষ্ট না। পরিশ্রম, মেধা, অভিনয়, ফাইট-সব কিছুর মধ্যে পারদর্শী হতে হয়। শাকিব এই সব দিক থেকেই পারফেক্ট। ও সুপারস্টার হওয়ার ফুল প্যাকেজ।”

মান্নার মৃত্যুর এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর সেই মন্তব্য আজ আরও বাস্তব মনে হয়। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ হয়েছে- সত্যিই শাকিব খান বাংলা সিনেমার শেষ দিকের একমাত্র ‘ফুল প্যাকেজ’ তারকা।নব্বইয়ের শেষ ভাগে যখন তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখেন, তখন মান্না, রিয়াজ, ফেরদৌসদের রাজত্ব চলছে। প্রথম দিকটা তাঁর জন্য ছিল ভয়ংকর কঠিন। ব্যর্থতা, সমালোচনা আর প্রত্যাখ্যান-সবই সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু শাকিব হার মানেননি। বরং প্রতিটি ব্যর্থতাকে সিঁড়ি বানিয়ে তিনি উঠেছেন আরও উঁচুতে।‘কোটি টাকার কাবিন’, ‘প্রিয় তোমাকে’, ‘আমার প্রেম আমার প্রিয়া’— একের পর এক সিনেমা তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরবর্তীতে ‘শিকারী’ ও ‘নবাব’-এর মতো ছবি দিয়ে তিনি নিজের অভিনয়ের নতুন উচ্চতা ছুঁয়েছেন।এখনকার শাকিব খান আগের চেয়ে আরও পরিণত, আরও আত্মবিশ্বাসী। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর কাজের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, মান্না ভাইয়ের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল ছিল না।

‘প্রিয়তমা’ ছবিতে রোমান্টিক হিরো হিসেবে তিনি যেমন দর্শকের মন জয় করেছেন, তেমনি ‘বরবাদ’ বা ‘তুফান’-এর মতো ছবিতে দেখিয়েছেন নতুন ধাঁচের শাকিব- আরও আক্রমণাত্মক, আরও স্টাইলিশ, আরও আধুনিক।‘তান্ডব’ ও ‘রাজকুমার’-এর মতো কাজ তাঁর বহুমাত্রিকতার প্রমাণ দিয়েছে। আর দর্শকরা এখন অপেক্ষা করছে তাঁর নতুন সিনেমা ‘সোলজার’-এর জন্য-যেখানে বলা হচ্ছে, তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নতুন এক অ্যাকশন অবতারে হাজির করবেন।
এই ধারাবাহিকতা দেখলেই বোঝা যায় কেন মান্না ভাই বলেছিলেন, “সুপারস্টার হওয়ার ফুল প্যাকেজ।” কারণ তিনি বুঝতেন-সময় যতই বদলাক, প্রকৃত তারকার সংজ্ঞা বদলায় না। সৌন্দর্য, মেধা, পরিশ্রম, প্যাশন-সব কিছু মিলেই তৈরি হয় এক ‘সুপারস্টার’।এফডিসির সেই কইড়তলার ছোট্ট আলাপচারিতা আজ যেন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে পরিণত হয়েছে। তখন মান্না ভাই ছিলেন ইন্ডাস্ট্রির রাজা, আর শাকিব খান ছিলেন নবাগত নায়ক। কিন্তু দুই প্রজন্মের সেই সংযোগ মুহূর্তেই যেন ভবিষ্যতের এক প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল।

আজ যখন ঢালিউডে একের পর এক নতুন মুখ উঠে আসছে, কেউ কেউ তারকা হচ্ছে, আবার হারিয়েও যাচ্ছে-তখনও শাকিব খান নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন অবিচলভাবে। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি একাই টেনে এনেছেন বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমার হাল, বদলে দিয়েছেন তার গতি, রুচি ও মান।সম্ভবত মান্না ভাই ঠিকই বলেছিলেন।বাংলা চলচ্চিত্র হয়তো অনেক নায়ক দেখবে, অনেক হিট সিনেমাও হবে, কিন্তু “সুপারস্টার হওয়ার ফুল প্যাকেজ”-এমন সম্পূর্ণতা হয়তো আর দেখা যাবে না।