রাত ২ টায় স্টেজে উঠে নেমেছিলেন রাত সাড়ে ৯ টায়! কি হয়েছিল সেদিন?

ফারহান তানভীর:

২০০২ সালে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)-এর একটি কনসার্টের কথা।সেটা সাধারণ একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া এক অবিশ্বাস্য রাত হিসেবে জায়গা করে আছে। সেদিন রাত ঠিক দুইটায় মঞ্চে উঠেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু ও তার কিংবদন্তি ব্যান্ড এলআরবি। একটানা সকাল সাড়ে নয়টা পর্যন্ত টানা প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা পারফর্ম করে তারা পরিবেশন করেছিলেন ৭৪টি গান। এত দীর্ঘ সময় ধরে হাজারো দর্শককে একই উন্মাদনায় ধরে রাখা কোনো সাধারণ শিল্পীর পক্ষে সম্ভব নয়। এটি সম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র আইয়ুব বাচ্চুর মতো একজন মঞ্চজাদুকরের পক্ষেই।

সেদিন রাত ওতো গভীর হওয়ার পরও দর্শকদের একটুও ক্লান্ত মনে হয়নি। বরং প্রতিটি গান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটি গানের দাবি উঠছিল। আর আইয়ুব বাচ্চুও যেন নিজের সমস্ত শক্তি, আবেগ আর ভালোবাসা ঢেলে দিচ্ছিলেন প্রতিটি পরিবেশনায়। গিটার হাতে তার উপস্থিতিই ছিল দর্শকদের জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তাই তো তাকে বলা হতো ‘রূপালী গিটারের জাদুকর’। তার গিটারের প্রতিটি সুর, প্রতিটি সলো আর কণ্ঠের প্রতিটি উচ্চারণ মুহূর্তেই হাজারো মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলত।

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতকে জনপ্রিয় করার পেছনে যাদের সবচেয়ে বড় অবদান, আইয়ুব বাচ্চু তাদের অন্যতম। সোলস ব্যান্ডে দীর্ঘদিন কাজ করার পর ১৯৯১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এলআরবি (লাভ রানস ব্লাইন্ড)। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৯২ সালে এলআরবির প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের পর থেকেই ব্যান্ডটি দেশের তরুণদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। বাংলাদেশের প্রথম ডাবল ব্যান্ড অ্যালবাম প্রকাশের কৃতিত্বও এলআরবির।আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল তার গানের বৈচিত্র্য। প্রেম, বিরহ, জীবনসংগ্রাম, প্রতিবাদ কিংবা স্বপ্ন-সবকিছুই উঠে আসতো তার গানে। ‘ফেরারি মন’, ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘শেষ চিঠি’, ‘হকার’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘এক আকাশ’, ‘আমিও মানুষ’, ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘রূপালী গিটার’-এমন অসংখ্য গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার গান শুধু শোনা হয় না, অনুভব করা হয়। আর তাই আজও নতুন প্রজন্মের অসংখ্য তরুণ গিটার হাতে তুলে নেওয়ার অনুপ্রেরণা খুঁজে পায় আইয়ুব বাচ্চুর মধ্যেই।

শুধু ব্যান্ড সংগীত নয়, চলচ্চিত্রেও তার অবদান ছিল অসাধারণ। ‘আম্মাজান’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় প্লেব্যাক গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অমলিন। পাশাপাশি নিজের একক অ্যালবাম ‘ময়না’, ‘কষ্ট’, ‘সময়’, ‘একা’, ‘প্রেম তুমি কি’, ‘বলিনি কখনো’ কিংবা ‘জীবনের গল্প’ দিয়েও তিনি প্রমাণ করেছিলেন, তিনি কেবল একজন গিটারিস্ট নন; একজন পূর্ণাঙ্গ সংগীতশিল্পী।আইয়ুব বাচ্চুর কনসার্ট মানেই ছিল সবসময় অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে গান গাওয়া তার জন্য নতুন কিছু ছিল না। দর্শকদের অনুরোধে তিনি প্রায়ই একের পর এক গান গেয়ে যেতেন।

তবে চুয়েটের সেই ২০০২ সালের কনসার্ট ছিল সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাওয়া এক ইতিহাস। রাত দুইটা থেকে সকাল সাড়ে নয়টা পর্যন্ত ৭৪টি গান পরিবেশন করা শুধু শারীরিক সক্ষমতার বিষয় নয়, বরং শিল্পীর প্রতি দর্শকদের সীমাহীন ভালোবাসা এবং শিল্পীর নিজের সংগীতের প্রতি অসীম নিষ্ঠারও প্রমাণ।২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে আইয়ুব বাচ্চু পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তার সৃষ্টি, তার গিটার আর তার কণ্ঠ আজও বেঁচে আছে কোটি মানুষের হৃদয়ে।

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাস লেখা হলে তার নাম থাকবে একেবারে প্রথম সারিতে। কারণ তিনি শুধু গান গাইতেন না, তিনি মঞ্চে একটি আবেগ তৈরি করতেন এবং তিনিই একটি প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন। আর তাই আজও যখন কোথাও ‘রূপালী গিটার’ কিংবা ‘চলো বদলে যাই’ বাজতে শুরু করে, তখন হাজারো মানুষের মনে ভেসে ওঠে সেই চিরচেনা মুখ-গিটার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা আইয়ুব বাচ্চু।