স্টেডিয়ামে ব্যান থেকে স্টেডিয়ামের মালিক – শাহরুখ খানের অবিশ্বাস্য যাত্রা!

ফারহান তানভীর:

একটা সময় যে মানুষটিকে একটি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, আজ সেই মানুষটিরই ক্রিকেট সাম্রাজ্যের নিজস্ব স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। সময় যে কত বড় প্রতিশোধ নিতে পারে, শাহরুখ খানের গল্প যেন তারই জীবন্ত উদাহরণ।

২০১২ সালের ১৬ মে,আইপিএলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কলকাতা নাইট রাইডার্স মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সকে হারিয়ে প্লে-অফ নিশ্চিত করেছিল সেদিন। আর তখনই ম্যাচ শেষে মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ঘটে গিয়েছিল এক বিতর্কিত ঘটনা। শোনা যায়, নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন শাহরুখ খান। অন্যদিকে শাহরুখের দাবি ছিল, তার সঙ্গে থাকা শিশুদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণই তাকে ক্ষুব্ধ করেছিল এবং একজন বাবা হিসেবে তিনি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। ঘটনার পর মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন তাকে পাঁচ বছরের জন্য ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

সেই সময়ও বিষয়টি ভারতজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।যদিও সেই নিষেধাজ্ঞা পুরো পাঁচ বছর বহাল থাকেনি। ২০১৫ সালেই মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে শাহরুখের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। পরবর্তীতে তদন্তেও জানানো হয়, তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের মতো কোনো বিষয় প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু সেই বিতর্কের স্মৃতি ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে রয়ে যায়।সময় অবশ্য কারও জন্য থেমে থাকে না। বরং অনেক সময় একই মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যা একসময় কল্পনাও করা কঠিন ছিল।

২০১২ সালের সেই বিতর্কের পর শাহরুখ শুধু অভিনেতা হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রাখেননি, ক্রিকেট উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজের সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেছেন। ২০০৮ সালে শুরু হওয়া কলকাতা নাইট রাইডার্স এখন আর শুধু একটি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি নয়। ক্যারিবিয়ানে ট্রিনবাগো নাইট রাইডার্স, সংযুক্ত আরব আমিরাতে আবুধাবি নাইট রাইডার্স এবং যুক্তরাষ্ট্রে লস অ্যাঞ্জেলেস নাইট রাইডার্স-সব মিলিয়ে ‘নাইট রাইডার্স’ এখন একটি বৈশ্বিক ক্রিকেট ব্র্যান্ড। যাদের রয়েছে ৯ টি বড় বড় শিরোপাও।আর সেই যাত্রায় এবার যোগ হয়েছে নতুন এক মাইলফলক।

২০২৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার পোমোনায় উদ্বোধন করা হয়েছে ‘নাইট রাইডার্স ক্রিকেট গ্রাউন্ড’। এটি লস অ্যাঞ্জেলেস নাইট রাইডার্সের নিজস্ব হোম ভেন্যু, যেখানে ইতিমধ্যেই মেজর লিগ ক্রিকেটের ম্যাচ আয়োজন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ক্রিকেটের ফেরার প্রেক্ষাপটেও এই ভেন্যুকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্রিকেটকে যুক্তরাষ্ট্রে আরও জনপ্রিয় করে তুলতে এই প্রকল্পকে বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।বলা দরকার,বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ২৫৬ কোটি টাকা গুণতে হয়েছে এই স্টেডিয়াম নাইট রাইডার্সের নামে নিতে।স্টেডিয়াম উদ্বোধনের সময় শাহরুখ খান বলেছিলেন, এটি শুধু একটি ক্রিকেট মাঠ নয়; এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ একত্রিত হবে, খেলাকে উদযাপন করবে এবং নতুন প্রজন্ম ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হবে। তার বহু বছরের স্বপ্নের বাস্তব রূপ এটি।

জীবনের সবচেয়ে সুন্দর উত্তর অনেক সময় তর্কে নয়, অর্জনে লুকিয়ে থাকে। যে মানুষকে একসময় একটি স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, তিনি আজ এমন এক ক্রিকেট ব্র্যান্ডের অন্যতম কর্ণধার, যার নিজস্ব আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম রয়েছে। এটা শুধু একজন সুপারস্টারের সাফল্যের গল্প নয়; এটি ধৈর্য, সময় এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিরও গল্প।শাহরুখ খান কখনও প্রকাশ্যে ওয়াংখেড়ে বিতর্ককে নিজের পরিচয় বানিয়ে রাখেননি। বরং তিনি নিজের কাজ, নিজের স্বপ্ন আর নিজের বিনিয়োগ দিয়েই নতুন পরিচয় তৈরি করেছেন।

সিনেমার পর্দায় তিনি বহুবার ‘কিং’ উপাধি পেয়েছেন। কিন্তু ক্রিকেটের দুনিয়ায়ও যে তিনি কেবল একজন দলের মালিক নন, বরং একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড গড়ে তোলার কারিগর-সেটা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।এক যুগেরও বেশি সময় আগে একটি স্টেডিয়ামের দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর আজ, হাজার হাজার দর্শকের জন্য আরেকটি স্টেডিয়ামের দরজা খুলছে তার স্বপ্নের হাত ধরেই। হয়তো এ কারণেই বলা হয়, সাময়িকভাবে কোনো দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানেই পথ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনও কখনও সেটিই নতুন এক ইতিহাসের শুরু।