ফারহান তানভীর :
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের নির্বাচনকে ঘিরে এফডিসি প্রাঙ্গণে ছিল উৎসবের আমেজ। শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিল্পীদের পদচারণায় মুখর ছিল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর সবার নজর ছিল ফলাফলের দিকে। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রকাশিত হয়েছে প্রাথমিক ফলাফল, যেখানে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদে জয় পেয়েছে শিবা সানু-জয় চৌধুরী পরিষদ। ফলে দীর্ঘদিন পর শিল্পী সমিতির নেতৃত্বে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলা যায়।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়। দুপুরে জুমার নামাজের জন্য এক ঘণ্টার বিরতি দিয়ে আবারও ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে চলে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৫৭৩ জন। তাদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪৮০ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৮৪ শতাংশ। সকালে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে শিল্পীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। প্রবীণ শিল্পীদের মধ্যে ভোট দিতে দেখা গেছে অভিনেতা আবুল হায়াত, চিত্রনায়ক আলমগীর, সোহেল রানা, উজ্জ্বল, অভিনেত্রী আনোয়ারা, সুজাতা ও ডলি জহুরকে। তবে ঢাকাই চলচ্চিত্রের বর্তমান সময়ের অনেক জনপ্রিয় মুখকে ভোটকেন্দ্রে দেখা যায়নি। অনুপস্থিত ছিলেন শাকিব খান, সিয়াম আহমেদ, আরিফিন শুভ, ইমন, নিরব, অপু বিশ্বাস, পরীমনি ও বুবলীসহ অনেকে। এমনকি শুরুতে সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া বাপ্পারাজও ভোট দিতে আসেননি। অন্যদিকে অনন্ত জলিল, বাপ্পী চৌধুরী ও ইয়াশ রোশান ভোট দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন।
এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে দুটি প্যানেল। একদিকে ছিলেন সভাপতি পদে আরমান ও সাধারণ সম্পাদক পদে রুমানা ইসলাম মুক্তি। অন্যদিকে সভাপতি পদে শিবা সানু এবং সাধারণ সম্পাদক পদে জয় চৌধুরী। আরমান-মুক্তি প্যানেলে সহসভাপতি পদে ছিলেন নূতন ও ইলিয়াস কোবরা। শিবা-জয় প্যানেলে সহসভাপতি পদে ছিলেন রোজিনা ও ডি এ তায়েব। গত মেয়াদের সভাপতি মিশা সওদাগর এবং সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন ডিপজল কোনো পদেই প্রার্থী না হওয়ায় এবারের নির্বাচন শুরু থেকেই ছিল ভিন্ন মাত্রার।
সবচেয়ে বেশি নজর ছিল সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের দিকে। প্রাথমিক ফলাফলে সভাপতি পদে ২৪৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন অভিনেতা শিবা সানু। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আরমান পেয়েছেন ১৭৩ ভোট। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে জয় পেয়েছেন জয় চৌধুরী। তিনি পেয়েছেন ২৩৭ ভোট আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী রুমানা ইসলাম মুক্তি পেয়েছেন ১৭৯ ভোট। শিল্পী সমিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদেই শিবা-জয় পরিষদের জয়কে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সহসভাপতির দুটি পদেও ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। ডি এ তায়েব ২৬০ ভোট এবং ইলিয়াস কোবরা ২১৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। খুব কাছাকাছি অবস্থানে থেকেও নির্বাচিত হতে পারেননি নূতন, তার প্রাপ্ত ভোট ২০৪। অন্য প্রার্থী রোজিনা পেয়েছেন ১৫২ ভোট।সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে ২৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন সুব্রত। তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিনা খান পেয়েছেন ১৫০ ভোট। সাংগঠনিক সম্পাদক পদে জয় পেয়েছেন সনি রহমান। তিনি পেয়েছেন ২৩৩ ভোট।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে এসেছে সবচেয়ে আলোচিত ফলাফলগুলোর একটি। এম এ পারভেজ চৌধুরী আবীর ২৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, যা প্রকাশিত ফলাফলের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ ভোট। একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এক সময়ের চিত্রনায়িকা পলি পেয়েছেন মাত্র ১৪৪ ভোট।দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক পদে ২২১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন জ্যাকি আলমগীর। সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে ২২৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন মারুফ আকিব। আর কোষাধ্যক্ষ পদে ২২১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন কামরুজ্জামান কমল।
প্রাথমিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদেই জয় পেয়েছে শিবা সানু-জয় চৌধুরী পরিষদ। যদিও কিছু পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বেশ কাছাকাছি, তবু সামগ্রিকভাবে ভোটারদের আস্থার বড় অংশ এই পরিষদের দিকেই ঝুঁকেছে। দীর্ঘদিন পর মিশা সওদাগর-ডিপজল যুগের বাইরে গিয়ে শিল্পী সমিতি পেল নতুন নেতৃত্ব, যা চলচ্চিত্রাঙ্গনের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন সবার দৃষ্টি চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার দিকে। তবে প্রাথমিক ফলই স্পষ্ট করে দিয়েছে, শিল্পীরা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন এবং সেই রায়ের ভিত্তিতেই আগামী দুই বছর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে নতুন নেতৃত্ব।