নায়ক মান্নার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন পরিচালকরা…

ফারহান তানভীর :

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক মান্না। সময় তার সীমানা ছাড়িয়ে গেলেও নামের পাতায় নায়ক মান্না আজও অমর।জীবিত থাকাকালীন মান্না বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এমন সব কথা বলেছিলেন যেগুলো তখন ছিল সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া বক্তব্য। যার জন্য তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারই এতো বছর পরে এসেও মাঝে মাঝেই আলোচনায় আসে।

তেমনই এক সাক্ষাৎকারে মান্না একটি কথা বলেছিলেন-“পরিচালকরা হয়তো সাধারণ দর্শকের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নন, কিন্তু একজন অভিনেতার জীবনে তাদের গুরুত্ব অসীম। তারাই একজন সাধারণ মানুষকে নায়ক বানান, তারাই গড়ে তোলেন একজন সুপারস্টার।” চলচ্চিত্র মানে আমরা যা দেখি, তা আসলে একটি সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। কিন্তু সেই সম্মিলিত প্রয়াসের নেতৃত্বে থাকেন একজনই- তিনিই পরিচালক। একজন অভিনেতা যতই প্রতিভাবান হোন না কেন, তাকে সঠিকভাবে পর্দায় তুলে ধরার জন্য প্রয়োজন একজন দক্ষ পরিচালকের দৃষ্টি, পরিকল্পনা এবং নির্মাণশৈলী। মান্নার সেদিনের কথায় এই বাস্তবতাই প্রতিফলিত হয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একজন অভিনেতার জনপ্রিয়তা অনেকটাই নির্ভর করে তিনি কী ধরনের গল্পে, কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছেন তার ওপর। আর এই উপস্থাপনার পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকে পরিচালকের হাতে।

বাংলা সিনেমার এক সময় ছিল, যখন একটি সিনেমা হিট হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করত নায়ক-নায়িকার নামের ওপর। দর্শকরা হলে যেতেন শুধুমাত্র প্রিয় তারকার অভিনয় দেখতে। মান্নার সময়টাও অনেকাংশে এমনই ছিল। তার নাম শুনলেই দর্শকরা হলে ভিড় করতেন। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার পেছনে যে নির্মাতাদের নিরলস পরিশ্রম ছিল, তা অনেক সময়ই আলোচনার বাইরে থেকে যেত। তবে সময় বদলেছে, বদলেছে দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গিও। এখনকার দর্শক আগের মতো সরল নন; তারা গল্প বোঝেন, নির্মাণশৈলী বিচার করেন, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-তারা পরিচালকের নামও মনে রাখেন।

এই পরিবর্তন শুধু বিশ্ব চলচ্চিত্রেই নয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এখন অনেক দর্শক সিনেমা দেখতে যাওয়ার আগে খোঁজ নেন-এই সিনেমার পরিচালক কে? বরং কোনো সিনেমার প্রমোশনের এখন অনেক বড় অংশ পরিচালক নিজে।বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু পরিচালক উঠে এসেছেন, যাদের নামই দর্শকদের হলে টানার জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠছে। যেমন: রায়হান রাফি-যিনি ধারাবাহিকভাবে ভিন্নধর্মী ও বাস্তবধর্মী গল্প দিয়ে দর্শকদের মন জয় করছেন। তার নির্মিত সিনেমাগুলোতে একটি আলাদা ধাঁচ, একটি শক্তিশালী বক্তব্য থাকে, যা দর্শকদের হলমুখী হতে বাধ্য করে। আবার মেহেদী হাসান হৃদয় কিংবা তানিম নূর-এনাদের কাজেও দেখা যায় নতুন প্রজন্মের চিন্তাভাবনা, আধুনিক গল্প বলার কৌশল এবং ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনার ভিন্নতা। ফলে অনেক দর্শক এখন সরাসরি বলেন-“এই পরিচালকের সিনেমা, মানেই কিছু একটা ভালো হবে।”

এই পরিবর্তন আসলে চলচ্চিত্র শিল্পের পরিণত হওয়ারই একটি লক্ষণ। যখন দর্শক শুধু তারকা নির্ভরতা থেকে বের হয়ে নির্মাণশৈলীকে মূল্য দিতে শুরু করে, তখনই একটি ইন্ডাস্ট্রি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারে। মান্নার সেই বক্তব্য আজকের বাস্তবতায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ এখন শুধু অভিনেতারা নয়, দর্শকরাও বুঝতে শুরু করেছেন-একটি ভালো সিনেমার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা কার।তবে এর মানে এই নয় যে অভিনেতাদের গুরুত্ব কমে গেছে। বরং এখন একটি ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে। একজন দক্ষ পরিচালক যেমন একজন অভিনেতাকে তার সেরাটা বের করে আনতে সাহায্য করেন, তেমনি একজন প্রতিভাবান অভিনেতা সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে রূপ দেন। এই পারস্পরিক নির্ভরতার জায়গাটিই চলচ্চিত্রের আসল শক্তি।

মান্নার সেই কথাগুলো শুধু একটি ব্যক্তিগত উপলব্ধি নয়, বরং একটি চিরন্তন সত্য। পরিচালকরা হয়তো সবসময় আলোয় থাকেন না, কিন্তু তারাই আলো তৈরি করেন। আর সেই আলোতেই জ্বলে ওঠেন নায়ক-নায়িকারা। সময়ের পরিবর্তনে দর্শক এখন সেই আলোর উৎসকেও চিনতে শিখছে-এটাই চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় আশার জায়গা।