মেহেদী হাসান :
ময়মনসিংহের এক কনসার্টে যাচ্ছিলেন এলআরবি ব্যান্ডের সদস্যরা। রাতভর উচ্ছ্বাস, আলো, গিটার আর মানুষের প্রতীক্ষা-সব প্রস্তুত। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা। ব্যান্ডের ড্রামার রোমেল সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। খবরটা পৌঁছায় তাদের দলে আগুনের মতো। এলআরবির অন্য সদস্য মাসুদ ছুটে যান হাসপাতালে, আহত বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে।আর অন্যদিকে গিটারিস্ট স্বপনকে নিয়ে রওনা দেন আইয়ুব বাচ্চু- কারণ মঞ্চে হাজারো মানুষ অপেক্ষায়, যারা এসেছে কেবল তার গান শুনতে, তাকে দেখতে।

কিন্তু সঙ্গে তো ড্রামার নেই। একটা ব্যান্ডে ড্রামার ছাড়া গান মানে শরীরের নাড়ি ছাড়া হৃদস্পন্দন- চলবে কীভাবে?মঞ্চে উঠে বাচ্চু কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারপর মাইক্রোফোনে বললেন-“এখানে ড্রামার কেউ আছো?”পুরো মাঠ নিস্তব্ধ। তারপর হঠাৎ দর্শকদের ভিড় থেকে উঠে এল এক তরুণ-একেবারে অচেনা, অপরিচিত। হয়তো বয়স কুড়িরও কম। বাচ্চু তাকিয়ে দেখলেন, ছেলেটার চোখে ভয় নেই, আছে একরাশ উচ্ছ্বাস। তিনি মৃদু হেসে বললেন, “তাহলে আয়, দেখি কী পারিস।”

সেই রাতেই শুরু হলো এক অদ্ভুত সঙ্গীতযাত্রা-যেখানে এক কিংবদন্তি গিটারিস্ট বাজাচ্ছেন নিজের হৃদয়ের তারে আর তার পাশে বাজছে এক অজানা ছেলের ড্রাম। তালে তালে দুলছে ময়মনসিংহের জনসমুদ্র। কে জানে, হয়তো বাচ্চু নিজেই তখন বুঝেছিলেন-মঞ্চে সংগীত কখনও একা হয় না, সেটি মানুষের ভেতরের আগুনকে জ্বালিয়ে তোলে।বাচ্চু কনসার্ট বাতিল করতে পারতেন। দর্শকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ তাঁর কাছে সংগীত মানে ছিল জীবনের শ্বাসের মতো- যা চলতে হবে, যত বাধাই আসুক।তিনি বিশ্বাস করতেন, “গান থামলে মনও থেমে যায়।”সেদিনও তাই তিনি গান থামতে দেননি। এক অপরিচিত ছেলেকে পাশে বসিয়ে পুরো কনসার্ট শেষ করেছিলেন।

ড্রামবিটগুলো হয়তো নিখুঁত ছিল না, কিন্তু তাতে ছিল কাঁচা আগুন, আর বাচ্চুর গিটারে ছিল সেই আগুনের সুর।সেই রাতের পর ছেলেটির নাম কেউ জানে না। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তার কোনো ছবি নেই, কোনো সাক্ষাৎকারও নয়। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অনামা নায়ক-যে প্রমাণ করেছিল, সংগীত কখনও শুধু পেশাদারদের ব্যাপার নয়, এটা এক আত্মার সংযোগ।

বছর পেরিয়ে গেছে। মঞ্চ পাল্টেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু “এখানে ড্রামার কেউ আছো?”- এই চারটি শব্দ আজও যেন বাতাসে ভেসে বেড়ায়।কারণ ওই প্রশ্নটা শুধু একজন ড্রামারকে খুঁজে পাওয়া নয়; এটা ছিল সাহস, অদম্যতা আর সংগীতের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার আহ্বান।আইয়ুব বাচ্চু চলে গেছেন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই রাত্রিটা আজও বেঁচে আছে।