ফারহান তানভীর:
তামিলনাড়ুতে সিনেমা মানেই শুধু বড় পর্দার বিনোদন নয়, এটি সেখানে আবেগ, সংস্কৃতি এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক। বহু দশক ধরে তামিলনাড়ুতে সিনেমা, তারকা আর রাজনীতি এক অদ্ভুত বন্ধনে জড়িয়ে আছে। সেই কারণেই যখন তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী অভিনেতা জোসেফ বিজয় সিনেমা প্রদর্শন সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা ঘোষণা করলেন, তখন তা পুরো দক্ষিণি সিনেমা অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মুক্তির প্রথম সাত দিন নতুন তামিল সিনেমা দিনে পাঁচটি শো চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে ভোররাতের শো নিষিদ্ধই থাকছে।

তামিলনাড়ুতে সিনেমা দীর্ঘদিন ধরেই উৎসবের অংশ। বিশেষ করে বড় তারকাদের ছবি মুক্তি পাওয়া মানে সেখানে সাধারণ বিনোদনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। রজনীকান্ত, অজিত কুমার, কমল হাসান কিংবা বিজয়ের সিনেমা মুক্তি ঘিরে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তা অনেক সময় ধর্মীয় উৎসবকেও হার মানায়। সিনেমা হলের বাইরে ভক্তদের ভিড়, আতশবাজি, ঢাক-ঢোল, বিশাল কাটআউট আর সেই কাটআউটে দুধ ঢালার দৃশ্য তামিল সংস্কৃতির এক পরিচিত চিত্র। ‘ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো’ সেখানে কেবল একটি সিনেমা দেখা নয়, বরং প্রিয় তারকার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের সামাজিক আয়োজন।একসময় সিনেমা হলগুলোতে শো শুরু হতো দুপুর বা বিকেলের দিকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতি জনপ্রিয় হওয়ার পর পাল্টে যায় সেই চিত্র। বড় বাজেটের সিনেমার ক্ষেত্রে ভোর ৫টা, এমনকি রাত ১টার শোও চালু হতে শুরু করে। দর্শকরা রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেন শুধুমাত্র প্রিয় নায়কের সিনেমা সবার আগে দেখার জন্য। প্রযোজক ও হলমালিকদের কাছেও এটি ছিল লাভজনক ব্যবসার কৌশল। কারণ মুক্তির প্রথম দিন ও প্রথম সপ্তাহই সাধারণত একটি সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয় নির্ধারণ করে।

তবে এই উন্মাদনার পেছনে ধীরে ধীরে জমতে থাকে বিতর্কও। বিশেষ করে ২০২৩ সালের পঙ্গল উৎসবে মুক্তিপ্রাপ্ত অজিত অভিনীত ‘থুনিভু’ এবং বিজয়ের ‘ভারিসু’ সেই বিতর্ককে চরমে পৌঁছে দেয়। দুই সুপারস্টারের ছবিকে ঘিরে উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। কোথাও রাত একটার শো, কোথাও আবার ভোর চারটার প্রদর্শনী-সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই উৎসবেই ঘটে ট্র্যাজেডি। অজিতের এক ভক্তের মৃত্যু পুরো পরিস্থিতিকে বদলে দেয়। এর আগেও কাটআউট ভেঙে পড়া, ভক্তদের সংঘর্ষ কিংবা জনসম্পত্তি নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল। ফলে সরকার বাধ্য হয় কঠোর অবস্থান নিতে।এরপরই তামিলনাড়ুতে ভোররাতের শো বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, সিনেমা হলের বাইরে দুধ ঢালা কিংবা অতিরিক্ত উন্মাদনামূলক কর্মকাণ্ডেও আসে নিয়ন্ত্রণ। নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দিয়েই সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব দ্রুতই গিয়ে পড়ে সিনেমা ব্যবসায়। কারণ ভারতের অন্য অনেক রাজ্যে যখন সকাল ৫টা বা ৬টার শো চালিয়ে দর্শক ও আয় বাড়ানো হচ্ছিল, তখন তামিলনাড়ুতে প্রথম শো সাধারণত সকাল ৯টা বা ১০টার আগে শুরু করা সম্ভব হচ্ছিল না। এতে প্রযোজক ও পরিবেশকদের অভিযোগ ছিল, রাজ্যের দর্শকরাই নিজেদের প্রিয় তারকার সিনেমা পরে দেখছেন এবং একই সঙ্গে আয়েও বড় ধাক্কা লাগছে।

এই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর জোসেফ বিজয়ের নতুন সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই বলা হচ্ছে। গত ২৫ মে ঘোষিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত তামিল সিনেমা প্রথম সাত দিন দিনে পাঁচটি শো চালাতে পারবে এবং এর জন্য আর আলাদা সরকারি অনুমতি প্রয়োজন হবে না। আগে সাধারণ নিয়মে দিনে চারটি শোর অনুমতি ছিল, আর পঞ্চম শো চালাতে প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হতো। ফলে মুক্তির আগে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো এবং প্রযোজকদের বাড়তি চাপ নিতে হতো।নতুন নিয়ম সেই জটিলতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। একটি অতিরিক্ত শো মানে শত শত প্রেক্ষাগৃহে হাজার হাজার বাড়তি দর্শক, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে বক্স অফিস আয়ে। তাই প্রযোজক, পরিবেশক ও হলমালিকরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। অভিনেতা বিশালসহ ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
তবে সবচেয়ে আলোচনার বিষয় হলো-বিজয় পাঁচটি শোর অনুমতি দিলেও ভোররাতের শো ফিরিয়ে আনেননি। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, দীর্ঘদিন সিনেমা জগতের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে তিনি হয়তো আবার রাত বা ভোরের প্রদর্শনী চালুর পথ খুলে দেবেন। কিন্তু সরকার আপাতত সে পথে হাঁটেনি। অর্থাৎ অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হলেও নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করা হয়নি।বিজয়ের এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন সিনেমা শিল্পকে ব্যবসায়িক স্বস্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমন মনে করিয়ে দিচ্ছে-তারকাপূজার পুরোনো উন্মাদনা ফিরলেও সেটি আর নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলবে না।

বিজয় নিজে ৩৩ বছর তামিল সিনেমার বড় তারকা ছিলেন। ফলে ইন্ডাস্ট্রির সমস্যাগুলো তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই প্রযোজক ও হলমালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে ইতিবাচক সংকেত। আপাতত তামিল সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি পেয়েছে ‘পাঁচ শো’র স্বস্তি, তবে ‘ভোররাতের ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো’ সংস্কৃতি এখনো স্মৃতি আর অপেক্ষার মধ্যেই রয়ে গেছে।