কাটনারপাড়ার অবন্তী থেকে ঢালিউডের অপু বিশ্বাস!

ফারহান তানভীর :

ঢালিউডের পর্দায় তিনি অপু বিশ্বাস। জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খানের সঙ্গে জুটি বেঁধে একসময় একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তারকাখ্যাতি, ব্যক্তিজীবনের নানা অধ্যায় আর চলচ্চিত্রের ব্যস্ততা মিলিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের পরিচিত মুখ। তবে এই পরিচিতির আড়ালে রয়েছে অন্য এক গল্প-বগুড়ার সিটি কর্পোরেশনের কাটনারপাড়ায় বেড়ে ওঠা এক কিশোরীর গল্প। যে মেয়েটি একসময় বান্ধবীদের সঙ্গে পাড়ায় ঘুরে বেড়াতেন, স্কুল-কলেজে যেতেন, নাচ শিখতেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন; একসময় তিনিই জায়গা করে নেন দেশের বড় পর্দায়। তারকাখ্যাতি বদলে দিয়েছে জীবনের অনেক কিছু, কিন্তু শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি আর জন্মশহরের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো অপু বিশ্বাসের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ললিতকলা একাডেমির রাস্তা

অপু বিশ্বাসের পারিবারিক নাম অবন্তী বিশ্বাস। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা বগুড়া শহরে। বাবা উপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস ও মা শেফালী বিশ্বাসের তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে তিনি সবার ছোট। পরিবারের কাছে তিনি অপু বিশ্বাস মেঘা নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর শৈশব-কৈশোরের বড় একটি অংশ কেটেছে শহরের কাটনারপাড়া এলাকার এসকে লেনে। সেখানকার বাড়ি, আশপাশের পরিচিত মানুষ, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময় এবং পরিবারের সঙ্গে উৎসব উদ্‌যাপনের স্মৃতি তাঁর জীবনের শুরুর অধ্যায়কে আলাদা করে চেনায়।ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে স্মৃতিচারণ করেছেন অপু। কাটনারপাড়ার দিনগুলোকে তাঁর কাছে স্বপ্নের মতো বলে নিজেই জানিয়েছেন তিনি। সিমিম, বৃষ্টি ও রিক্তা-এই তিন বান্ধবীকে নিয়ে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুমহল। একে অপরকে না দেখে থাকতে পারতেন না তাঁরা। বন্ধুদের সঙ্গে দুষ্টুমি, পাড়ার পরিচিত পরিবেশে বেড়ে ওঠা আর ছোটখাটো ঘটনায় পরিবারের বকুনি খাওয়ার স্মৃতিও রয়েছে সেই দিনগুলোতে।

তারকাখ্যাতির অনেক আগে জীবন ছিল অনেক বেশি সাধারণ; বন্ধুত্ব, পরিবার, পড়াশোনা আর আনন্দের ছোট ছোট মুহূর্তেই কাটত সময়।তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু বগুড়ার এসওএস হারম্যান মেইনার স্কুলে। পরে আলোর মেলা কেজি স্কুলে পড়াশোনা করেন। এরপর ক্রিসেন্ট হাইস্কুল ও ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁর শিক্ষাজীবন। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে সরকারি মুজিবুর রহমান কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন তিনি। পর্দার পরিচিত মুখ হওয়ার পরও কলেজজীবনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যায়নি। চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করার পরও শুটিং শেষে বগুড়ায় ফিরে এসে ক্লাস করা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া এবং আগের মতো ঘোরাফেরা করার কথা জানিয়েছেন তিনি। তখন অভিনয়জীবন দ্রুত বিস্তৃত হলেও জন্মশহরের পরিচিত পরিবেশে নিজের স্বাভাবিক জীবন ধরে রাখার চেষ্টা ছিল তাঁর মধ্যে।অভিনেত্রী হওয়ার আগে অপু বিশ্বাসের জীবনে নাচের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বাবা-মায়ের উৎসাহে ছোটবেলা থেকেই নাচ শেখা শুরু করেন তিনি। বগুড়ার নৃত্যগুরু আবদুস সামাদের কাছে নাচের তালিম নিয়েছেন। পরে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি এবং নৃত্যাঞ্চলের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর নাচের প্রশিক্ষণের সম্পর্ক তৈরি হয়। স্কুলজীবনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নৃত্যচর্চায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে মঞ্চের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তাঁর। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় নৃত্যাঞ্চল আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দশম স্থান অধিকার করেছিলেন জানিয়েছিলেন তিনি। এই সাংস্কৃতিক চর্চাই পরবর্তী সময়ে তাঁকে বিনোদনজগতে প্রবেশের পথে এগিয়ে দেয়।

ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ-বিদ্যালয়

অপুর চলচ্চিত্রে আসার গল্পেও রয়েছে বগুড়ার সংযোগ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভিনয়শিল্পী আহসানুল হক মিনুর মাধ্যমে পরিচালক আমজাদ হোসেনের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র তৈরি হয়। এরপর আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘কাল সকালে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে বড় পরিসরে পরিচিতি আসে এফ আই মানিক পরিচালিত ‘কোটি টাকার কাবিন’ ছবির মাধ্যমে। শাকিব খানের বিপরীতে অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়েন অপু। এরপর দুজনের জুটি ঢালিউডে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। একের পর এক ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ আসতে থাকে, বদলাতে থাকে তাঁর জীবনের গতিপথ।

তবে চলচ্চিত্রে ব্যস্ততা বাড়লেও বগুড়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে কেবল অতীতের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়। ২০১৩ সালে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের প্রিয় ভ্রমণস্থানের কথা বলতে গিয়ে বগুড়ার নাম উল্লেখ করেছিলেন অপু। ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত সেখানে যাওয়া সম্ভব না হলেও জন্মশহরের প্রতি টান থাকার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। দুর্গাপূজার স্মৃতির সঙ্গেও বগুড়া জড়িয়ে রয়েছে তাঁর। ছোটবেলায় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, নতুন পোশাক পরা, মন্দিরে ঘুরতে যাওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে উৎসব উদ্‌যাপনের কথা বিভিন্ন সময়ে স্মরণ করেছেন এই অভিনেত্রী।

তাঁর মা শেফালী বিশ্বাসও ছিলেন নাচ শেখার ক্ষেত্রে অন্যতম অনুপ্রেরণা। ২০২০ সালে মায়ের মৃত্যুর পর উৎসবের দিনগুলোতে সেই স্মৃতি আরও আবেগপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারেও জানিয়েছেন অপু।চলতি বছরের ৭ এপ্রিল জন্মশহর বগুড়ায় এসে আবারও পুরোনো স্মৃতিতে ফিরে যান তিনি। টিএমএসএস-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসের আয়োজনে অংশ নিতে এসে শহরের পরিচিত জায়গাগুলো ঘুরে দেখেন। সরকারি মুজিবুর রহমান কলেজের সামনে গিয়ে স্মৃতিচারণ করেন নিজের কলেজজীবনের। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর বক্তব্য ও সেই সফরের খবর থেকে জানা যায়, বগুড়ায় ফিরে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছিল তাঁর। কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে শাকিব খানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু স্মৃতির কথাও আলোচনায় আসে। একসময় যে শহরে পড়াশোনা ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় কাটাতেন, সেখানে বহু বছর পর তারকা হিসেবে ফিরে আসা তাঁর জীবনের দুই ভিন্ন সময়কে যেন পাশাপাশি এনে দাঁড় করায়।

বর্তমান টিটু মিলনায়তন

ব্যক্তিজীবনেও সময়ের সঙ্গে অনেক পরিবর্তন এসেছে। শাকিব খানের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য সম্পর্ক, তাঁদের ছেলে আব্রাম খান জয়কে ঘিরে জীবন এবং চলচ্চিত্রে কাজের ধরন-সব মিলিয়ে অপু বিশ্বাসের জীবন এখন আগের চেয়ে আলাদা। সাম্প্রতিক সময়ে সিনেমায় নিয়মিত উপস্থিতির পাশাপাশি ফটোশুট, ব্র্যান্ডের প্রচারমূলক কাজ, নিজের ব্যবসা ও সন্তানকে সময় দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের আগস্টে ‘শিকার’ ছবির শুটিং করতে নেপালে গিয়েছিলেন অপু। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শুটিং স্থগিত করে দেশে ফিরতে হয় তাঁকে। অক্টোবরে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ‘শিকার’, ‘দুর্বার’ ও ‘সিক্রেট’সহ কয়েকটি সিনেমার কাজের কথা জানান। একই সাক্ষাৎকারে দুর্গাপূজা এলেই মায়ের কথা বেশি মনে পড়ার কথাও বলেছেন তিনি।আগামী ১৭ অক্টোবর একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধনে অংশ নিতে বগুড়ায় যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও ওই সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন অপু। অর্থাৎ চলচ্চিত্রের কাজ, ব্যবসা ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততার মাঝেও জন্মশহরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। এই যোগাযোগের গভীরতা কতটা, তা কেবল সফরের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না; বরং পুরোনো স্মৃতিচারণ, উৎসবের কথা বলতে গিয়ে বগুড়ার প্রসঙ্গ তোলা এবং পরিচিত জায়গায় ফিরে আবেগাপ্লুত হওয়ার মধ্যেও তার প্রকাশ দেখা যায়।

কাটনারপাড়ার সেই শৈশব আর আজকের তারকাজীবনের মধ্যে ব্যবধান অনেক। একসময় বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ায় ঘুরে বেড়ানো, স্কুলে যাওয়া কিংবা কলেজের আড্ডায় অংশ নেওয়া ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এখন তাঁকে ঘিরে থাকে ক্যামেরা, সংবাদমাধ্যম, ভক্তদের আগ্রহ ও পেশাগত ব্যস্ততা। কিন্তু অপু বিশ্বাসের জীবনকে শুধু তারকাখ্যাতির গল্প হিসেবে দেখলে তাঁর বেড়ে ওঠার অধ্যায়টি আড়ালেই থেকে যায়। বগুড়া তাঁকে শুধু জন্মপরিচয় দেয়নি; দিয়েছে শৈশবের স্মৃতি, সাংস্কৃতিক চর্চার ভিত্তি, বন্ধুত্বের অভিজ্ঞতা এবং চলচ্চিত্রে প্রবেশের আগের পরিচিত পৃথিবী। সেই শহর থেকেই শুরু হয়েছিল অবন্তী বিশ্বাসের পথচলা, যে পথ তাঁকে পরবর্তী সময়ে পরিচিত করেছে অপু বিশ্বাস নামে।