ফারহান তানভীর :
একটা সময় ছিল, যখন বগুড়া শহরে সিনেমা দেখতে যাওয়াটাই ছিল আলাদা এক আয়োজন। হাতে টিকিট, পকেটে সামান্য কিছু টাকা, সঙ্গে বন্ধু কিংবা পরিবারের কেউ-তারপর সিনেমা হলের সামনে গিয়ে মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা। ঈদের আগে হলের সামনে নতুন সিনেমার পোস্টার লাগত, শহরের দেয়ালজুড়ে দেখা যেত নায়ক-নায়িকার মুখ। কোনো সিনেমা ভালো চললে টিকিটের জন্য লাইন পড়ত অনেক দূর পর্যন্ত। শো শুরুর আগে হলের আশপাশে জমে উঠত আড্ডা। পর্দায় আলো জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন অন্য এক পৃথিবীতে ঢুকে যেত বগুড়ার সিনেমা প্রেমী মানুষরা।

অথচ আজ সেই দৃশ্য কল্পনা করতেও অনেকের হয়তো পুরোনো দিনের গল্প মনে হবে। কারণ বগুড়া শহরের যে জায়গাগুলো একসময় সিনেমার আলোয় মুখর থাকত, তার অনেকগুলোতেই এখন আর সিনেমা হলেরই অস্তিত্ব নেই। একসময় শুধু বগুড়া শহরেই ছিল ১০টি সিনেমা হল এবং পুরো জেলায় ছিল ৩৮ টি। দুঃখের ব্যাপার, গত এক দশকে ৩১টি হলই ভাঙন দেখেছে বা বিলুপ্ত হয়েছে। যে শহরে একসময় একসঙ্গে এতগুলো রুপালি পর্দা জ্বলত, সেখানে সেসব হলগুলোর অধিকাংশই এখন কেবল নাম আর স্মৃতিতে বেঁচে আছে।
বগুড়ার সিনেমা হলের পুরোনো মানচিত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি ছিল বগুড়ার প্রাণকেন্দ্র খ্যাত সাতমাথা। সেখানেই কাছাকাছি ছিল মাধু সিনেমা হল, মেট্রো সিনেমা হল ও মেরিনা টকিজ। আর একই এলাকায় একাধিক হল থাকায় দর্শকের সামনে সিনেমা বেছে নেওয়ার সুযোগও ছিল। কিন্তু দর্শক কমতে কমতে একসময় বন্ধ হয়ে যায় তিনটি হলই। শেষ পর্যন্ত শুধু দরজা-জানালা নয়, ভেঙে ফেলা হয় সিনেমা হলগুলোর কাঠামোও। সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন। মাধু ও মেট্রোর জায়গায় হয়েছে ‘মাধু-মেট্রো টাওয়ার’, আর মেরিনার জায়গায় নির্মিত হয়েছে ‘মেরিনা নদী-বাংলা কমপ্লেক্স’। যে জায়গাগুলো একসময় সিনেমার পোস্টার আর দর্শকের ভিড়ে চেনা যেত, এখন সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততা।
মেরিনা টকিজের গল্পটা এখন পুরোটাই স্মৃতির। পুরোনো এই প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হওয়ার পর তার জায়গায় গড়ে উঠেছে বহুতল বিপণিকেন্দ্র। সিনেমার পর্দা হারিয়ে গেছে, কিন্তু জায়গাটির নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে পুরোনো দর্শকদের কাছে। আজ সেখানে কেউ হয়তো কেনাকাটা করতে যান, কেউ অফিস করেন, কেউ ব্যবসা করেন-কিন্তু একসময় একই জায়গায় মানুষ সিনেমার টিকিট হাতে নিয়ে অপেক্ষা করত, সেটি নতুন প্রজন্মের কাছে হয়তো অবিশ্বাস্যই মনে হতে পারে।

তবে সব হল যে সাতমাথাতেই ছিল,তা কিন্তু না।সাতমাথার বাইরে ছিল উত্তরা টকিজ। এই হলের অবস্থান সম্পর্কে যদিও নির্দিষ্ট ঠিকানা পাওয়া যায়নি তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর অবস্থান কবি নজরুল ইসলাম সড়ক ও থানা রোড এলাকায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই হলটিও অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তবে অন্য কয়েকটি হলের মতো এর জায়গায় নতুন কোনো সিনেমা হল বা বড় বাণিজ্যিক ভবন দাঁড়িয়েছে-এমন কথা শোনা যায়নি। সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরা সিনেমা হলের পুরোনো জায়গাটি এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলে রয়েছে। অর্থাৎ একসময় যে জায়গায় মানুষ অন্ধকার হলঘরে বসে পর্দার আলো দেখত, সেই জায়গাটির ব্যবহারই এখন বদলে গেছে।
শহরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান চারমাথায় ছিল বীথি সিনেমা হল। শহরের সিনেমাপ্রেমীদের পুরোনো স্মৃতিতে এই নামটিও আলাদা করে জায়গা নিয়ে আছে। কারণ বীথির পর্দাও অনেক আগেই নিভে গেছে। জাহাঙ্গীরাবাদ ক্যান্টনমেন্টে ছিল সেনা অডিটরিয়াম এবং মাঝিড়া ক্যান্টনমেন্টে ছিল উল্লাস সিনেমা হল। সময়ের সঙ্গে দুটিও আর আগের মতো সিনেমা প্রদর্শনের জায়গা হিসেবে টিকে থাকেনি। চকসূত্রাপুর এলাকার মাসুম সিনেমা হল ও বনানী সিনেমা হলের পর্দাও এখন অতীতের অংশ।
হারানোর তালিকায় সবচেয়ে কষ্টের জায়গা নিয়ে আছে হয়তো বাম্বী সিনেমা হল। কারণ বাম্বী শুধু একটি হল ছিল না, বগুড়ার নওয়াব পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক ছিল। নওয়াববাড়ির কিছু অংশে নির্মিত আলতাফ আলী মার্কেটের ওপর আশির দশকে তৈরি হয়েছিল বাম্বী। ১৯৮৮ সালে ‘জবরদস্ত’ সিনেমা দিয়ে এর যাত্রা শুরু। তখন হলটির আসনসংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার। শুরুর দিকে বাম্বীতে থাকতো হাউসফুল দর্শক। নব্বইয়ের দশকেও ব্যবসাসফল সিনেমার প্রদর্শনীতে জমজমাট থাকতো হলটি। কিন্তু ২০০৫ সালের পর থেকেই দর্শক কমতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে ‘আমি একাই একশো’ সিনেমা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বাম্বী বন্ধ হয়ে যায়।

তবে বাম্বীর গল্প তখনো শেষ হয়নি। টানা ছয় বছর বন্ধ থাকার পর পুরোনো হলটি নতুন রূপে ফিরে এসেছিল ‘বাম্বী ডিজিটাল সিনেপ্লেক্স’ নামে। এক হাজার আসন কমিয়ে করা হয় মাত্র ১৬০টি। শরিফুল রাজের ‘পরাণ’ সিনেমা দিয়ে নতুন করে পর্দা জ্বলে ওঠে। পুরোনো বিশাল হলকে ছোট করে আধুনিকভাবে চালানোর সেই উদ্যোগে প্রথম দিকে দর্শকের ভালো সাড়াও পাওয়া যায়। হলটির অস্তিত্ব এখনো থাকলেও সিনেমা চলেনা।হলটি বর্তমানে কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আর ধুনট উপজেলার কথা না বললেই নয়। উপজেলা সদরে একসময় ছিল ক্লিওপেট্রা, ঝংকার ও সিকতা-আর গোসাইবাড়ি বাজারে ছিল কাজল সিনেমা হল। দর্শক চাহিদা থেকেই একে একে তৈরি হয়েছিল এসব প্রেক্ষাগৃহ। ঝংকারের পর্দা প্রথম জ্বলে ওঠে ১৯৮৪ সালে উজ্জ্বল-শাবানা অভিনীত ‘নসীব’ সিনেমা দিয়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কাজল সবার আগে বন্ধ হয়ে যায়। ক্লিওপেট্রা ও ঝংকারও অনেক আগেই বন্ধ হয়ে পড়ে। এরপর প্রায় ২৮ বছরের পুরোনো সিকতা সিনেমা হলটিও ভেঙে ফেলা হয়। করোনার সময়ের লোকসান, দর্শকসংকট এবং সিনেমা ব্যবসার দুরবস্থার কারণে শেষ পর্যন্ত সিকতার ভবিষ্যৎও সিনেমা হল হিসেবে আর থাকেনি।
অন্যদিকে ১৯৭৪ সালের কোরবানির ঈদে ‘ডাকু মনসুর’ সিনেমা দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল মধুবন। এরপর ‘পৃথিবী আমারে চায়’, ‘গোপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘বসুন্ধরা’, ‘নাগ নাগিনী’, ‘লাইলী মজনু’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুজন সখী’সহ বহু সিনেমা এই হলের পর্দায় দর্শক টেনেছে। তাই মধুবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক প্রজন্মের বগুড়াবাসীর সিনেমা দেখার স্মৃতি।অবশ্য মধুবনের পথও মসৃণ ছিল না। ২০০৬ সালে হলটি প্রথমবার বন্ধ হয়ে যায় এবং ২০১৪ সালে আবার চালু হয়। এরপর ২০১৭ সালে ‘ঢাকা অ্যাটাক’ প্রদর্শনের পর বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালে পুরোনো মধুবন নতুন রূপে ‘মধুবন সিনেপ্লেক্স’ হিসেবে ফিরে আসে। ৩৩৬ আসনের আধুনিক এই প্রেক্ষাগৃহে ‘পরাণ’, ‘হাওয়া’, ‘প্রিয়তমা’, ‘তুফান’, ‘বরবাদ’, ‘জওয়ান’ ও ‘পাঠান’-এর মতো সিনেমায় দর্শকের ব্যাপক সাড়া মিলেছিল। কোনো কোনো সময় দর্শকের চাপ সামলাতে মধ্যরাতের শোও চালাতে হয়েছে।কিন্তু সেই সাফল্যও সারা বছর ধরে রাখা যায়নি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দর্শকসংকট ও লোকসানের কারণে মধুবন সিনেপ্লেক্স বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ভালো সিনেমার অভাব, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। কয়েক মাসের জন্য জায়গাটি কমিউনিটি সেন্টার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।তারপর শুরু হয় মধুবনের গল্পের নতুন অধ্যায়। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে শাকিব খানের ‘প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’ দিয়ে আবারও চালু হয় মধুবন সিনেপ্লেক্স।

তবে ফিরে আসার পরও মধুবনের লড়াই শেষ হয়নি। ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালীন তারা নিয়েছিল অভূতপূর্ব এক উদ্যোগ।২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখিয়ে হলটি অনেক দর্শক টানতে পেরেছিল-এক ম্যাচে প্রায় ১৫০ দর্শক বড় পর্দায় খেলা দেখতে এসেছিলেন। অথচ নিয়মিত সিনেমার একটি শোতে দর্শক ছিল মাত্র সাতজন। হল কর্তৃপক্ষের হিসাবে, তখন ৩৩৬ আসনের প্রেক্ষাগৃহে দিনে মাত্র একটি সিনেমার শো চলছিল এবং অনেক সময় পাঁচ থেকে সাতজন দর্শকও পাওয়া যাচ্ছিল। অর্থাৎ সিনেমা হলের ভবন ফিরেছে, আলো ফিরেছে, পর্দাও জ্বলছে-কিন্তু সেই পুরোনো দর্শকস্রোত এখনো পুরোপুরি ফেরেনি।
বগুড়ার পুরোনো সিনেমা হলগুলোর পতনের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। টেলিভিশন ও আকাশ সংস্কৃতি, পরে ইন্টারনেট ও অনলাইন বিনোদনের বিস্তার, দর্শকের রুচির পরিবর্তন, ভালো সিনেমার সংকট, পুরোনো হলের পরিবেশ ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, পরিচালন ব্যয় এবং সিনেমা হলের জায়গার বাণিজ্যিক মূল্য-সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই দীর্ঘ পতনের গল্প। যে জায়গায় সিনেমা চালিয়ে আয় করা কঠিন, সেখানে সেই জায়গায় মার্কেট বা অন্য বাণিজ্যিক স্থাপনা করা অনেক সময় মালিকের কাছে বেশি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাধু, মেট্রো ও মেরিনার পরিণতিই তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।
তবু পুরোনো বগুড়ার মানুষের কাছে এসব হলের গল্প শুধু ব্যবসার হিসাব নয়। কারও প্রথম সিনেমা দেখা হয়েছিল মাধুতে, কারও কৈশোরের বিকেল কেটেছে মেরিনার সামনে, কেউ হয়তো ঈদের সকালে বাবার হাত ধরে গিয়েছিলেন বাম্বীতে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে উত্তরা কিংবা বীথির টিকিটের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। কোনো কোনো মানুষের কাছে একটি হল মানেই একটি সিনেমা; আবার কারও কাছে একটি হল মানেই জীবনের একটি বয়স।

আজ সেই হলগুলোর অনেক জায়গায় শপিং সেন্টার, মার্কেট কিংবা অন্য স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও পুরোনো ভবনের চিহ্নটুকুও নেই। কিন্তু স্মৃতির শহরে তারা এখনো আছে-মাধু আছে, মেট্রো আছে, মেরিনা আছে, উত্তরা আছে, বীথি আছে, মাসুম আছে, বনানী আছে, উল্লাস আছে আর আছে পুরোনো বাম্বীর সেই এক হাজার আসনের অন্ধকার হলঘর।
একসময় বগুড়া জেলায় ৩৮টি সিনেমা হল ছিল। আজ সেই সংখ্যার অধিকাংশই ইতিহাস। কিন্তু মধুবনের মতো কিছু পর্দা এখনো নিভতে চায় না, বাম্বীর মতো কোনো কোনো হল আবার ফিরে আসার চেষ্টা করে। আর সেই ধারাবাহিকতা রক্ষার্থেই স্টার সিনেপ্লেক্স বগুড়া পুলিশ প্লাজায় তাদের দুইটি শাখা খোলার চুক্তি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন করেছে।