ফারহান তানভীর :
একসময় সিনেমা হলের শহর হিসেবে পরিচিত ছিল বগুড়া। শহরের বিভিন্ন এলাকায় একসঙ্গে চলত একাধিক প্রেক্ষাগৃহ। নতুন সিনেমা মুক্তির দিন থেকেই হলগুলোতে থাকত দর্শকের ভিড়, টিকিটের জন্য দীর্ঘ সারি। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। দর্শক কমেছে, বেড়েছে পরিচালন ব্যয়, বন্ধ হয়েছে একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ। ফলে একসময় যে শহরে প্রায় ১০টি সিনেমা হল ছিল, বর্তমানে সেখানে নিয়মিত সিনেমা প্রদর্শনের সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে।

বর্তমানে বগুড়া শহর ও শহরসংলগ্ন এলাকায় সিনেমা প্রদর্শনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মধুবন সিনেপ্লেক্স, সোনিয়া সিনেমা হল এবং মমো ইন মুভি থিয়েটার। এর মধ্যে মধুবন ও সোনিয়া শহরের প্রচলিত সিনেমা হল হিসেবে পরিচিত। আর নওদাপাড়ার পাঁচ তারকা হোটেল-মমো ইনে রয়েছে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন মমো ইন মুভি থিয়েটার।
বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী মধুবন সিনেমা হল বর্তমানে মধুবন সিনেপ্লেক্স নামে পরিচালিত হচ্ছে। চেলোপাড়ায় অবস্থিত দীর্ঘদিনের পুরোনো প্রেক্ষাগৃহটি আধুনিকায়নের মাধ্যমে সিনেপ্লেক্সে রূপ দেওয়া হয়। ২০২১ সালে নতুন আঙ্গিকে যাত্রা শুরুর পর একাধিক আলোচিত দেশীয় সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রেক্ষাগৃহটি। বর্তমানে মধুবন সিনেপ্লেক্সের ওয়েবসাইটে দুপুর ১২টা, বিকেল ৩টা, সন্ধ্যা ৬টা ও রাত ৯টার শো-টাইমের টিকিট ক্রয় করা যাচ্ছে।
তবে দর্শক সংকট ও লোকসানের কারণে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মধুবন সিনেপ্লেক্স বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ২০২৬ সালে আবার চালু হয় প্রেক্ষাগৃহটি। এরপর থেকে নতুন সিনেমা প্রদর্শনের পাশাপাশি দর্শক ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সেখানে সিনেমার দর্শক কমে যাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছিল।
শহরের আরেকটি সচল প্রেক্ষাগৃহ সোনিয়া সিনেমা হল। নবাববাড়ি সড়কে অবস্থিত এই হলটি এখনো নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শন করছে। সাম্প্রতিক ঈদ মৌসুমেও সেখানে নতুন সিনেমা প্রদর্শিত হয়েছে এবং দর্শকের উপস্থিতি দেখা গেছে। বগুড়ার পুরোনো প্রেক্ষাগৃহগুলোর মধ্যে সোনিয়া এখনো টিকে থাকা হলগুলোর অন্যতম।
সোনিয়া সিনেমা হলে সাধারণত দুপুর থেকে সন্ধ্যার মধ্যে একাধিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সিনেমার দৈর্ঘ্য, দর্শকের চাহিদা এবং প্রদর্শনযোগ্য ছবির ওপর নির্ভর করে শোয়ের সংখ্যা পরিবর্তিত হয়ে থাকে। ঈদ বা বিশেষ কোনো মৌসুমে দর্শক বাড়লে প্রদর্শনীর সংখ্যাও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।

বগুড়ার সিনেমা হলের বর্তমান চিত্র বুঝতে হলে অতীতেও যেতে হয়। ২০০০ সাল পর্যন্ত শহরে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা ছিল নয়টি। সাতমাথার মাধু, মেট্রো ও মেরিনা, কবি নজরুল ইসলাম সড়কের উত্তরা, চারমাথার বীথি এবং জাহাঙ্গীরাবাদ ক্যান্টনমেন্টের উল্লাসসহ একাধিক হল পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। এসব প্রেক্ষাগৃহের কোনো কোনোটি ভেঙে সেখানে তৈরি হয়েছে বাণিজ্যিক ভবন ও শপিং সেন্টার। সর্বশেষ বন্ধ হওয়া হলগুলোর মধ্যে ছিল বাম্বি,যা বর্তমানে কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এর মধ্যেই মমো ইন মুভি থিয়েটার বগুড়ার সিনেমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মমো ইন কমপ্লেক্সে থাকা এই থিয়েটারে আধুনিক প্রজেকশন ও সাউন্ড ব্যবস্থার সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে সেখানে চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও টিকিটের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ফলে বগুড়ায় প্রচলিত সিনেমা হলের পাশাপাশি আধুনিক মুভি থিয়েটার হিসেবেও চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ রয়েছে।
তবে বগুড়ার সিনেমা প্রদর্শনের বর্তমান হিসাব এখানেই শেষ হচ্ছে না। শহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বড় মাল্টিপ্লেক্স চেইন স্টার সিনেপ্লেক্সের শাখা। সাতমাথার নবাববাড়ি রোডে পুলিশ প্লাজার ১০ ও ১১ তলায় এই শাখা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। শাখাটিতে দুটি স্ক্রিন থাকবে। ২০২১ সালেই স্টার সিনেপ্লেক্স ও বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল। তখন জানানো হয়েছিল, দুটি হলে মোট ৪২৫টি আসন থাকবে।
দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন পিছিয়ে থাকলেও ২০২৬ সালে আবারও বগুড়ায় স্টার সিনেপ্লেক্স চালুর বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। প্রথম আলো-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ প্লাজার স্টার সিনেপ্লেক্স শাখার কাজ এগিয়ে চলছে এবং চলতি বছরই এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। স্টার সিনেপ্লেক্সের সিনিয়র ম্যানেজার (মার্কেটিং) মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ সেখানে দুটি স্ক্রিনের এই শাখা চালুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বগুড়ার পুলিশ প্লাজায় স্টার সিনেপ্লেক্সের নতুন শাখা চালুর বিষয়ে আগামী ৩ অক্টোবর ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাতমাথার গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে শাখাটি চালু হলে উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান শহরে বড় মাল্টিপ্লেক্স চেইনের প্রবেশ ঘটবে।
তাই বর্তমানে বগুড়ায় মধুবন সিনেপ্লেক্স, সোনিয়া সিনেমা হল ও মমো ইন মুভি থিয়েটারে চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ রয়েছে। আর স্টার সিনেপ্লেক্সের পুলিশ প্লাজা শাখা চালু হলে শহরের চলচ্চিত্র প্রদর্শন ব্যবস্থায় যুক্ত হবে আরও দুটি আধুনিক স্ক্রিন। দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন এই সংযোজন বগুড়ার সিনেমা প্রদর্শনের চিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।

একসময় যে শহরে একসঙ্গে নয় বা তারও বেশি প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা চলত, সেখানে বর্তমানে সচল প্রদর্শনকেন্দ্রের সংখ্যা হাতে গোনা। পুরোনো হলগুলোর টিকে থাকার লড়াইয়ের মধ্যেই নতুন প্রজন্মের মাল্টিপ্লেক্স যুক্ত হওয়ার অপেক্ষা তৈরি হয়েছে। ফলে বগুড়ার সিনেমা হলের বর্তমান গল্পটি শুধু বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রেক্ষাগৃহের নয়; পুরোনো পর্দার পাশে নতুন পর্দা তৈরির গল্পও এখন সেই হিসাবের অংশ।