ফারহান তানভীর:
‘হারানোর মতো কিছুই নেই’-Toxic নিয়ে হতাশার মাঝেও কেন ভয় পাচ্ছেন না Yash?
মানুষের প্রত্যাশা যত বড় হয়, সাফল্যের মাপকাঠিটাও তত কঠিন হয়ে যায়। আর সেই কঠিন পরীক্ষার মুখেই দাঁড়িয়ে কন্নড় তারকা Yash-এর বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘Toxic: A Fairy Tale for Grown-Ups’। ‘KGF: Chapter 2’-এর পর প্রায় চার বছর বড় পর্দায় না থাকার কারণে Yash-এর প্রত্যাবর্তন ঘিরে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, তা সাধারণ কোনো সিনেমার প্রচারণার পর্যায়ে ছিল না। দর্শকের অপেক্ষা, তারকাকে ঘিরে বিশাল প্রত্যাশা, ব্যতিক্রমী নির্মাতা গীতু মোহনদাস-এর সঙ্গে Yash-এর জুটি এবং সিনেমাটির অন্ধকার, গ্যাংস্টার-নির্ভর আবহ-সব মিলিয়ে ‘Toxic’ মুক্তির আগেই পরিণত হয়েছিল বছরের অন্যতম আলোচিত ভারতীয় সিনেমায়। মুক্তির পর ছবিটি সেই প্রত্যাশার সবটুকু পূরণ করতে না পারলেও বক্স অফিসে তারকা Yash-এর শক্তি যে এখনো অটুট, সেটিও প্রথম দিনেই স্পষ্ট করে দিয়েছিল।

২৬ আগস্ট ২০২৬ বিশ্বব্যাপী প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘Toxic’। Yash-এর সঙ্গে সিনেমাটিতে রয়েছেন কিয়ারা আদভানি,তারা সুতারিয়া,নয়নতারা,হুমা কুরেশি ও রুখমীনি ভাসান্ত। প্রায় ১৯৪ মিনিটের এই ‘A’ সার্টিফিকেট পাওয়া সিনেমাটি অ্যাকশন, ক্রাইম, থ্রিলার ও ড্রামার মিশেলে তৈরি।তবে সিনেমাটির গল্পের চেয়েও মুক্তির আগে আলোচনার বড় কারণ ছিল Yash নিজেই। ‘KGF: Chapter 2’ ২০২২ সালে ভারতীয় সিনেমার বক্স অফিসে যে ঝড় তুলেছিল, তার পর Yash আর কোনো সিনেমা নিয়ে পর্দায় ফেরেননি। ফলে ‘Toxic’ তাঁর চার বছরের বিরতির পর প্রত্যাবর্তন। ভারতীয় একাধিক সংবাদমাধ্যমও মুক্তির আগে ছবিটিকে বছরের সবচেয়ে বেশি হাইপ তৈরি করা সিনেমাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
শুধু Yash-এর ভক্তরাই নয়, তাঁর পরবর্তী সিনেমা কেমন হতে যাচ্ছে, সেটি নিয়ে সাধারণ দর্শকের মধ্যেও ছিল ব্যাপক কৌতূহল।হাইপের সেই চিত্র সবচেয়ে পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল মুক্তির আগের অগ্রিম বুকিংয়ে। মুক্তির দিন সকাল ১১টা পর্যন্ত ‘Toxic’-এর ভারতীয় অগ্রিম বুকিং থেকে প্রায় ৭২.৪৩ কোটি রুপি গ্রস আয় হয়েছিল বলে জনায় Indian Express। অর্থাৎ সিনেমা মুক্তির আগেই বিপুল সংখ্যক দর্শক Yash-এর নতুন সিনেমা দেখতে টিকিট কেটে ফেলেছিলেন।এরপর ২৬ আগস্ট প্রেক্ষাগৃহে আসার পর প্রথম দিনেই দেখা যায় Yash-এর তারকা-ক্ষমতার আসল চেহারা। বিভিন্ন বক্স অফিস ট্র্যাকারের হিসাবে ‘Toxic’ ভারতে প্রথম দিনে ১০০ কোটি রুপির ঘর অতিক্রম করে। NDTV-এর হিসাবে ভারতীয় নেট আয় ছিল ১০১.১০ কোটি রুপি, ভারতীয় গ্রস ১২০.৭৫ কোটি এবং বিশ্বব্যাপী গ্রস ১৪০.৭৫ কোটি রুপি। Hindi belt থেকেই এসেছিল প্রায় ৫৫ কোটি রুপি, Kannada সংস্করণ থেকে ২৩.৩০ কোটি এবং Telugu সংস্করণ থেকে ১৬ কোটি রুপি।

এখানেই অবশ্য গল্পের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু। প্রথম দিনের রেকর্ডধর্মী সাফল্যের পরও ‘Toxic’ নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া একেবারে একমুখী থাকেনি। একদল Yash-এর অভিনয়, পর্দায় তাঁর উপস্থিতি, অ্যাকশন, আবহ, ভিজ্যুয়াল এবং সিনেমাটির আলাদা ধরনের নির্মাণশৈলীর প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে আরেকদল দর্শকের অভিযোগ, সিনেমাটি যতটা স্টাইলিশ হওয়ার চেষ্টা করেছে, গল্প ও চিত্রনাট্য ততটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি।বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধ নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে বেশি। সমালোচকদের একাংশের মতে, প্রথমার্ধে চরিত্র, দ্বন্দ্ব, আবেগ ও রহস্য দর্শককে ধরে রাখলেও বিরতির পর গল্পের গতি ও আবেগ দুর্বল হয়ে পড়ে। অ্যাকশন ও ভিজ্যুয়াল থাকলেও গল্পের সঙ্গে দর্শকের আবেগগত সংযোগ অনেকের কাছেই কমে যায়। সমালোচক Taran Adarsh-এর ভাষ্যেও ছবিটির প্রথমার্ধের প্রশংসার পাশাপাশি দ্বিতীয়ার্ধে লেখার দুর্বলতা ও অতিরিক্ত অ্যাকশনের কারণে ছবির গ্রাফ নেমে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াতেও একই বিভাজন দেখা যায়। কেউ Yash-এর প্রত্যাবর্তনকে উদযাপন করেছেন, কেউ আবার গল্প, তীব্র সমালোচনা করেছেন। মুক্তির দিনই এমন দর্শক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায় যেখানে সিনেমাটিকে অত্যন্ত হতাশাজনক বা বিরক্তিকর বলেও মন্তব্য করা হয়। অর্থাৎ যে সিনেমার জন্য মুক্তির আগে প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া, মুক্তির পর সেই প্রত্যাশাই অনেক ক্ষেত্রে ছবিটির বিরুদ্ধে চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
বক্স অফিসেও সেই প্রভাব দেখা যায়। প্রথম দিনের বিশাল সাফল্যের পর ছবিটির আয় ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। Rediff-এর ৩১ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, Hindi version প্রথম দিনে ৫৫.৪০ কোটি রুপির দুর্দান্ত সূচনা করলেও পরের দিনগুলোতে প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যায়। একই প্রতিবেদনে তখন পর্যন্ত ‘Toxic’-এর বিশ্বব্যাপী সংগ্রহ প্রায় ২৮৫.২০ কোটি রুপি বলে উল্লেখ করা হয়।তবে yash-কে ঘিরে যখন বক্স অফিসের প্রত্যাশা, সিনেমার বাজেট, প্রথম দিনের সাফল্য এবং পরবর্তী দিনের পতন নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন Yash বলেছেন, মানুষ হয়তো ভাবে তাঁর সিনেমা বক্স অফিসে ১০০ বা ২০০ কোটি টাকা লোকসান করলে তাঁর খুব গায়ে লাগে। কিন্তু তাঁর কাছে বিষয়টি নাকি তেমন নয়। তাঁর বক্তব্যের সারকথা-একসময় তাঁর পকেটে কিছুই ছিল না; এখন যা আছে, তার পুরোটাই তাঁর কাছে বোনাস। জীবনে হারানোর মতো কিছু নেই বলেই ভয়ও নেই।
একসময় কন্নড় সিনেমার পরিচিত মুখ থেকে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করে তিনি ‘KGF’ দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে তারকা হয়ে ওঠেন। ‘KGF: Chapter 1’ ও ‘KGF: Chapter 2’ তাঁকে ভারতের অন্যতম বড় pan-India তারকায় পরিণত করে। ফলে ‘Toxic’-এর মতো একটি বিশাল বাজেটের সিনেমা নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রত্যাশার চাপে নিজের সৃজনশীল সিদ্ধান্ত থেকে সরে না গিয়ে Yash বরং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার কথাই সামনে আনে। কন্নড়ের আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা কিচ্চা সুদীপ নিজেও যশের এই সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন।

‘Toxic’-এর ব্যর্থতা বা সাফল্যকে শুধু বক্স অফিসের অঙ্ক দিয়ে বিচার করাও ঠিক হবে না। কারণ প্রথম দিনের ১০০ কোটির বেশি ভারতীয় নেট সংগ্রহ এবং ১৪০ কোটির বেশি বিশ্বব্যাপী গ্রস প্রমাণ করে, দর্শক Yash-কে দেখার জন্য এখনো বিপুল অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে প্রথম দিনের পর সংগ্রহের পতন এবং মিশ্র দর্শক-প্রতিক্রিয়া এটাও দেখিয়েছে যে শুধু তারকার জনপ্রিয়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বক্স অফিস সাফল্য নিশ্চিত করা যায় না।সবচেয়ে বড় কথা, ‘Toxic’ হয়তো Yash-এর জন্য আরেকটি ‘KGF’ হয়ে উঠতে পারেনি কিন্তু সিনেমাটি তাঁকে অন্য একটি জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। তিনি এমন এক সময়েও বড় বাজেটের, প্রচলিত ধারার বাইরে যাওয়া সিনেমার পেছনে দাঁড়িয়েছেন, যখন তাঁর কাছে সবচেয়ে নিরাপদ পথ ছিল আবারও KGF-এর মতো কোনো mass entertainer বেছে নেওয়া। দর্শকের একাংশ সেই ঝুঁকিকে স্বাগত জানিয়েছে, অন্য অংশ প্রত্যাশামতো গ্রহণ করেনি। আর এই দ্বন্দ্বই হয়তো ‘Toxic’-এর সবচেয়ে বড় গল্প।
শেষ পর্যন্ত তাই Yash-এর ‘হারানোর মতো কিছু নেই’ মন্তব্যটি শুধু আত্মবিশ্বাসের কথা নয়; এটি তাঁর ক্যারিয়ার দর্শনেরও প্রতিফলন। একজন শিল্পী যখন শূন্য থেকে উঠে এসে নিজের স্বপ্নের জায়গায় পৌঁছান, তখন সাফল্যের পর প্রতিটি নতুন অর্জন তাঁর কাছে অতিরিক্ত পাওয়া। সেই জায়গা থেকেই হয়তো ‘Toxic’-এর ১০০ কোটি, ২০০ কোটি বা তার বেশি আয় তাঁর কাছে শেষ কথা নয়। দর্শক সিনেমাটিকে কতটা গ্রহণ করল, বক্স অফিস কোথায় গিয়ে থামল-এসব গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাঁর কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে নতুন কিছু করার সাহস। আর তাই ‘Toxic’ প্রত্যাশার সবটুকু পূরণ করতে না পারলেও Yash-এর নিজের ভাষায়, ভয় পাওয়ার মতো কিছু তাঁর নেই; কারণ যে মানুষ একসময় শূন্য হাতে শুরু করেছিলেন, তাঁর কাছে আজকের অবস্থানটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।