উৎসব না ঝুঁকি? ঈদে একসাথে নয় সিনেমা মুক্তি নিয়ে প্রশ্ন!

ফারহান তানভীর :

ঈদ মানেই দেশের প্রেক্ষাগৃহে নতুন সিনেমার উৎসব। বছরের দুই বড় উৎসব-ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে ঘিরে চলচ্চিত্র অঙ্গনে তৈরি হয় আলাদা উন্মাদনা। দর্শকের বাড়তি আগ্রহ, পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখার সংস্কৃতি এবং ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে প্রযোজক-নির্মাতারাও এই সময়টাকেই বেছে নেন নতুন ছবি মুক্তির জন্য। তবে এবারের ঈদুল আজহা সেই চেনা উৎসবের আবহের সঙ্গে নিয়ে এসেছে আরেক বাস্তবতা-স্ক্রিন সংকট আর তীব্র প্রতিযোগিতার চাপ।

প্রযোজক ও নির্মাতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের ঈদে মুক্তির লাইনে রয়েছে একসঙ্গে নয়টি সিনেমা। তালিকায় রয়েছে ‘রকস্টার’, ‘মালিক’, ‘রইদ’, ‘মাসুদ রানা’, ‘নাকফুলের কাব্য’, ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’, ‘পিনিক’, ‘বনলতা সেন’ এবং ‘তছনছ’। সংখ্যার দিক থেকে যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় মুক্তি তালিকা।বাংলাদেশে বর্তমানে নিয়মিত সিনেমা হলের সংখ্যা সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০-এর মধ্যে। প্রদর্শক মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ঈদ উপলক্ষে আরও ২০ থেকে ৩০টি হল সাময়িকভাবে সচল হতে পারে। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়-এতগুলো সিনেমার জন্য পর্যাপ্ত স্ক্রিন কোথায়?

প্রতি বছর ঈদের আগে একাধিক সিনেমা মুক্তির ঘোষণা এলেও শেষ মুহূর্তে অনেক ছবিকেই সরে দাঁড়াতে দেখা যায়। কখনও সেন্সর জটিলতা, কখনও হলসংকট, আবার কখনও ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের কারণে প্রযোজকরা সিদ্ধান্ত বদলান। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। ঈদের একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসেও কোনো সিনেমা মুক্তির তালিকা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়নি। অর্থাৎ নয়টি ছবিই ঈদে প্রেক্ষাগৃহে আসতে যাচ্ছে।এতে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে স্ক্রিন সংকটের আশঙ্কা। হল মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একই সময়ে এত সিনেমা মুক্তি পেলে কোনো ছবিই পর্যাপ্ত শো পাবে না। বিশেষ করে মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে তারকানির্ভর ও বড় বাজেটের ছবিগুলো বেশি অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। ফলে মাঝারি বা তুলনামূলক ছোট বাজেটের সিনেমাগুলো চাপে পড়ে যায়। সিঙ্গেল স্ক্রিনেও পরিস্থিতি খুব আলাদা নয়। সেখানে ব্যবসায়িক সম্ভাবনাই প্রধান বিবেচনা হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিকে বড় ধরনের ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জল। তাঁর মতে, ঈদকে কেন্দ্র করে সবাই একসঙ্গে ছবি মুক্তি দেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে প্রযোজকদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ একই সময়ে অনেক ছবি এলে দর্শক বিভক্ত হয়ে যায়, শো ভাগ হয়ে যায়, আর প্রত্যাশিত আয় থেকে বঞ্চিত হয় অধিকাংশ সিনেমাই।একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্টার সিনেপ্লেক্সের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মেসবাহ উদ্দিন আহমেদও। তাঁর মতে, পরিকল্পনা ও সমন্বয় ছাড়া একসঙ্গে এত সিনেমা মুক্তি দেওয়া প্রযোজক ও হল মালিক-দুই পক্ষের জন্যই লোকসানের ঝুঁকি তৈরি করে। তিনি মনে করেন, সমস্যার মূল জায়গা শুধু ঈদকেন্দ্রিক মুক্তি নয়; বরং সারা বছর নতুন সিনেমার ধারাবাহিক অভাব। বছরের অধিকাংশ সময় দর্শক নতুন চলচ্চিত্র থেকে বঞ্চিত থাকেন। এতে যেমন নতুন দর্শক তৈরি হয় না, তেমনি হল মালিকদেরও লোকসান গুনতে হয়। তাঁর ভাষায়, প্রযোজক, পরিবেশক ও প্রদর্শকদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি পরিকল্পিত মুক্তি সূচি তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

অন্যদিকে প্রযোজকদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্ন মত। ‘মাসুদ রানা’-এর প্রযোজক ও পরিবেশক আব্দুল আজিজ মনে করেন, একসঙ্গে এত সিনেমা মুক্তি পাওয়া সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে না। তবুও বাস্তবতা হচ্ছে, ঈদ দেশের সবচেয়ে বড় সিনেমা মৌসুম। ফলে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর সময় হিসেবেই তাঁরা ঈদকে বেছে নিয়েছেন।তবে ‘মালিক’-এর নির্মাতা সাইফ চন্দন প্রতিযোগিতার বিষয়টিকে দেখছেন অন্য দৃষ্টিতে। তাঁর মতে, ঈদের বাইরে এখনও বড় ছবি মুক্তি দেওয়া কঠিন। চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবাই সহকর্মী, তাই বিষয়টিকে প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং তিনি মনে করেন, সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দর্শকের জন্য ভালো কাজ উপহার দেওয়ার চেষ্টা করছেন।তবু বাস্তবতা বলছে, ঈদের এই সিনেমা যুদ্ধ শুধু দর্শকের বিনোদনের লড়াই নয়, এটি ব্যবসা, স্ক্রিন বণ্টন এবং টিকে থাকারও লড়াই।

নয়টি সিনেমার ভিড়ে কে দর্শকের মন জয় করবে আর কে হারিয়ে যাবে শো সংকটে-সেই উত্তর মিলবে ঈদের পরেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, পরিকল্পিত মুক্তি নীতির অভাব বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে ঈদের উৎসবমুখর মুক্তি মিছিল ভবিষ্যতে অনেক প্রযোজকের জন্য আনন্দের বদলে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।