ফারহান তানভীর:
একসময় সিনেমা দেখতে মানুষের ভিড় জমত প্রেক্ষাগৃহে। প্রিয় নায়ক-নায়িকার অভিনয়, বড় পর্দায় গল্পের জগতে হারিয়ে যাওয়া আর সিনেমা শেষে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা-সব মিলিয়ে সিনেমা হল ছিল গোবিন্দগঞ্জবাসীর বিনোদনের অন্যতম প্রধান এবং বৈধ ঠিকানা। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র বদলেছে। একসময় গোবিন্দগঞ্জে ছিল তিনটি সিনেমা হল। অথচ আজ সেখানে নেই একটিও। পুরোনো প্রেক্ষাগৃহগুলোর জায়গা দখল করেছে নতুন স্থাপনা, কোথাও বদলে গেছে ব্যবহারের ধরন, কোথাও মুছে গেছে হলের অস্তিত্বই।

তবে সিনেমার প্রতি গোবিন্দগঞ্জবাসীর আগ্রহ যে ফুরিয়ে যায়নি, তা উঠে এসেছে রুপালি জগতের এক জরিপে। স্থানীয়দের বড় একটি অংশ আবারও গোবিন্দগঞ্জে সিনেমা হল চান। তাঁদের প্রত্যাশা, পুরোনো দিনের সাধারণ প্রেক্ষাগৃহ নয়, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন সিনেপ্লেক্স গড়ে উঠুক এই জনপদে।স্থানীয়ভাবে প্রচলিত স্মৃতি ও মানুষের বয়ান অনুযায়ী, গোবিন্দগঞ্জে একসময় হীরক, তীথি ও একতা নামে তিনটি সিনেমা হল ছিল। হীরক সিনেমা হলের অবস্থান ছিল হীরক পাড়ায়। তীথি সিনেমা হল গড়ে উঠেছিল গোবিন্দগঞ্জ-মহিমাগঞ্জ সড়কের পাশে। অন্যদিকে, একতা সিনেমা হল ছিল রংপুর-বগুড়া মহাসড়কসংলগ্ন দক্ষিণ চারমাথা এলাকায়।
এই তিনটি প্রেক্ষাগৃহ ঘিরে একসময় স্থানীয় মানুষের বিনোদনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে হলগুলোর প্রতিষ্ঠাকাল, প্রতিষ্ঠাতা, মালিকানা কিংবা ঠিক কোন সময় থেকে সেখানে নিয়মিত সিনেমা প্রদর্শন শুরু হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।সিনেমা হল তিনটি ঠিক কবে বন্ধ হয়ে গেছে, তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কারও ধারণা, প্রায় ১৫ বছর বা তারও আগে থেকে হলগুলো বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে। আবার স্থানীয়দের কারও কারও ভাষ্য, জনপ্রিয় চিত্রনায়ক মান্নার মৃত্যুর পর থেকেই সিনেমা হলগুলোর অবস্থা ক্রমে খারাপ হতে থাকে। হলগুলোর অবনতির পেছনে ঠিক কোন কোন কারণ কাজ করেছিল, তাও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
বর্তমানে হীরক সিনেমা হলের পুরোনো পরিচয় অনেকটাই বদলে গেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে হীরক ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টার। যে জায়গাটি একসময় সিনেমাপ্রেমীদের আনাগোনায় মুখর থাকত, সেখানে এখন স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, তীথি সিনেমা হলের জায়গায় গড়ে উঠছে নতুন স্থাপনা। একতা সিনেমা হলের অস্তিত্বও বর্তমানে আর নেই। ফলে তিনটি প্রেক্ষাগৃহের কোনোটিতেই এখন সিনেমা দেখার সুযোগ নেই। গোবিন্দগঞ্জের মানুষকে বড় পর্দায় সিনেমা দেখতে হলে যেতে হয় অন্য এলাকায়।এই বাস্তবতায় স্থানীয়দের কাছে সিনেমা হলের স্মৃতি কেবল একটি পুরোনো বিনোদনব্যবস্থার স্মৃতি নয়; বরং গোবিন্দগঞ্জের নাগরিক জীবনে বিনোদনের একটি অনুপস্থিত অধ্যায়।

সময়ের সঙ্গে জনপদটির অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন এসেছে। নতুন নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ব্র্যান্ডের শোরুম ও শপিং কমপ্লেক্স গড়ে উঠছে। শিক্ষা বিস্তারের জন্য রয়েছে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় ফ্লাইওভার নির্মাণ এবং মিনি স্টেডিয়াম গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে গোবিন্দগঞ্জের অবকাঠামোগত উন্নয়নও দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে সিনেমা দেখার জন্য একটি আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ নেই।
রুপালি জগতের পরিচালিত এক জরিপে স্থানীয় মানুষের মধ্যে সিনেমা হল নিয়ে আগ্রহের বিষয়টি উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া স্থানীয়দের বড় একটি অংশ গোবিন্দগঞ্জে আবারও সিনেমা হল প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, নতুন করে হল নির্মাণ করা হলে সেটি যেন আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন সিনেপ্লেক্সের আদলে গড়ে তোলা হয়। তাঁদের মতে, মানুষের হাতে স্মার্টফোন এসেছে, ঘরে বসে সিনেমা দেখার সুযোগও বেড়েছে। তারপরও বড় পর্দায়, উন্নত শব্দব্যবস্থায় এবং পরিবারের সদস্য কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতার আলাদা আকর্ষণ রয়েছে।স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেন, গোবিন্দগঞ্জের জনসংখ্যা, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন বিবেচনায় এখানে আধুনিক সিনেমা হল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁদের বিশ্বাস, ভালো পরিবেশ, মানসম্মত সিনেমা, উপযুক্ত টিকিটের দাম এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দর্শক পাওয়া সম্ভব।

বর্তমানে গোবিন্দগঞ্জ থেকে সিনেমা দেখতে আগ্রহীদের বগুড়া অথবা দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে যেতে হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। দূরের শহরে যাতায়াতের সময় ও খরচের কারণে অনেকের জন্য নিয়মিত সিনেমা দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। নিজ উপজেলায় একটি আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ থাকলে স্থানীয় দর্শকদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষও সেখানে সিনেমা দেখতে আসতে পারেন-এমন প্রত্যাশা তাঁদের।
একসময় যে গোবিন্দগঞ্জে তিনটি সিনেমা হল ছিল, সেখানে আজ একটিও নেই। পুরোনো হলগুলোর জায়গায় নতুন স্থাপনা গড়ে উঠলেও মানুষের বিনোদনের চাহিদা রয়ে গেছে। তাই প্রশ্ন উঠছে, দ্রুত পরিবর্তনশীল এই জনপদে আধুনিক সিনেমা হল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কি নেওয়া হবে?
স্থানীয়দের আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা সম্ভাব্যতা যাচাই করলে হয়তো গোবিন্দগঞ্জে আবারও বড় পর্দায় সিনেমা দেখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পুরোনো প্রেক্ষাগৃহের স্মৃতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও আধুনিক সিনেপ্লেক্সের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের জন্য তৈরি হতে পারে সিনেমা দেখার নতুন ঠিকানা।