হল আছে, সিনেমা আছে-নেই শুধু দর্শক!

রবিউল ইসলাম বিদ্যুৎ :

সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে সিনেমা হল, দু-একটা চলছে জোড়াতালি দিয়ে। গাইবান্ধায় একসময় ছিল তিনটি সিনেমা হল। এখন টিকে আছে মাত্র একটি। শো চলছে, কিন্তু দর্শক হাতে গোনা। সিনেমার গল্প, হলের পরিবেশ ও বিকল্প বিনোদনের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বড় পর্দার আকর্ষণ।একসময় সিনেমা হলের সামনে টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ত। প্রিয় নায়ক-নায়িকার নতুন ছবি মুক্তি পেলে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হতো বাড়তি উন্মাদনা। বন্ধুবান্ধব মিলে দল বেঁধে সিনেমা দেখতে যাওয়া ছিল বিনোদনের সবচেয়ে বড় উপলক্ষ। টিকিট কাটার জন্য হুড়োহুড়ি, কখনো হাতাহাতি-সবই ছিল সেই সময়ের চেনা দৃশ্য। সেই দিন এখন অনেকটাই অতীত।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের বিনোদনের অভ্যাস। টেলিভিশন, ডিশ সংযোগ, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের হাতের নাগালে এনে দিয়েছে বিনোদনের অসংখ্য মাধ্যম। অন্যদিকে, নতুন সিনেমার সংকট, হলের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। সবমিলিয়ে সারাদেশে যে কয়েকটি সিনেমা হল রয়েছে সেগুলো দর্শকশূন্য হয়ে পড়েছে।গাইবান্ধাও এর ব্যতিক্রম নয়। জেলা শহরটিতে একসময় ছিল মায়া টকিজ, চৌধুরী ও নূপুর সিনেমা হল। একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে সিনেমা হলগুলো। এখন টিকে আছে একটি মাত্র হল। তাজ সিনেমা হল। সেটিও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। দিনের পর দিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। নতুন সিনেমার অভাবের মধ্যেও হলটি বন্ধ হয়নি; বরং জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।গাইবান্ধার তাজ সিনেমা হলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পর্দায় সিনেমা চলছে, কিন্তু দর্শকসংখ্যা খুবই কম।

যে হলে একসময় দর্শকের ভিড় জমত, সেখানে এখন কয়েকজন দর্শক নিয়েই শো চালাতে হচ্ছে। কেন এমন অবস্থা হলো? সিনেমার মান, দর্শকের রুচি, প্রদর্শনের পরিবেশ, নাকি বিনোদনের নতুন মাধ্যম-কোনটি বেশি দায়ী? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসে একাধিক কারণ।হলটির কাউন্টারম্যান নুরুল ইসলামের মতে, আগের সিনেমার সঙ্গে এখনকার সিনেমার বড় পার্থক্য রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, গল্পের দুর্বলতা দর্শককে হলবিমুখ করছে।নুরুল ইসলাম বলেন, “এখনকার সিনেমা এবং আগের সিনেমার মধ্যে অনেক ফারাক। এখন সিনেমার গল্প নেই। শাকিব খান সিনেমায় থাকলেও সব জায়গায় তাঁকে কেন্দ্র করেই সবকিছু। মনে রাখার মতো কিছু সিনেমায় থাকে না।”

সাম্প্রতিক কয়েকটি সিনেমার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘রকস্টার’ ও ‘প্রিন্স’-এই দুটি ছবিতেই তাঁর মতে, গল্পের ঘাটতি ছিল। দর্শকও সেভাবে সাড়া দেননি। তাঁর ধারণা, শাকিব খানের পারিশ্রমিকও চলচ্চিত্র নির্মাণের অর্থনৈতিক হিসাবের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।নুরুল ইসলামের কথায়, একসময় শাবানা, আলমগীর, জসিম ও মান্নার মতো শিল্পীদের সিনেমার প্রতি দর্শকের আলাদা আকর্ষণ ছিল। তাঁদের অভিনীত ছবি দেখতে দর্শকেরা হলে ভিড় করতেন। এখন সেই তারকানির্ভর আকর্ষণ ও দর্শকের উপস্থিতি-দুটিই কমে গেছে বলে মনে করেন তিনি।গাইবান্ধা শহরের সিনেমাপ্রেমী আব্দুল আহাদ মিয়ার স্মৃতিতেও রয়েছে সেই সময়ের সিনেমা হলের আলাদা জায়গা। তাঁর মতে, আগে মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল সিনেমা হল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই জায়গা দখল করেছে ঘরে বসে টেলিভিশন দেখা এবং পরে ইন্টারনেটভিত্তিক বিনোদন।

আব্দুল আহাদ মিয়া বলেন, “সে সময়ের পরিবেশ ছিল অন্য রকম। তখন বিনোদন বলতে বুঝতাম হলে গিয়ে সিনেমা দেখা। এরপর ডিশ আসার পর হলে গিয়ে দর্শকের আগ্রহ কমে যায়। এখন তো হাতে হাতে মোবাইল। ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকে চোখ রাখতেই সময় চলে যায়।”তাঁর পর্যবেক্ষণে, এখন দর্শকের হাতে বিনোদনের বিকল্প এত বেশি যে শুধু সিনেমা মুক্তি দিলেই তাঁদের হলে টেনে আনা কঠিন। ঘরে বসে কিংবা চলার পথে মুঠোফোনে স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও থেকে শুরু করে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র-সব ধরনের কনটেন্ট দেখার সুযোগ রয়েছে। ফলে সিনেমা হলের সঙ্গে দর্শকের আগের সম্পর্কও বদলে গেছে।

তবে আব্দুল আহাদ মিয়ার মতে, দর্শক কমে যাওয়ার জন্য শুধু প্রযুক্তির বিস্তারকে দায়ী করলে চলবে না। সিনেমা দেখার পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, গাইবান্ধার একমাত্র চালু সিনেমা হলে বসে ছবি দেখার মতো পরিবেশ নেই। আধুনিক দর্শক এখন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আরামদায়ক আসন ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা চান। তাঁর ভাষায়, “এখন মানুষ চায় অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা। সিনেপ্লেক্সে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আছে। এখন সিনেমা হল নয়, বরং সিনেপ্লেক্স হলে দর্শক ফিরতে পারে।”বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে ঈদকে ঘিরে নতুন সিনেমা মুক্তির প্রবণতা দীর্ঘদিনের। উৎসবের সময় দর্শকের আগ্রহ বাড়ে, প্রেক্ষাগৃহেও তৈরি হয় বাড়তি প্রত্যাশা। কিন্তু বছরের অন্য সময়গুলোতে পর্যাপ্ত নতুন সিনেমা না থাকলে হলের নিয়মিত দর্শক ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

আব্দুল আহাদ মিয়ার মতে, সিনেমা হলকে সচল রাখতে সারা বছরই মানসম্মত সিনেমা মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন। শুধু ঈদকেন্দ্রিক মুক্তির ওপর নির্ভর করলে দর্শকের ধারাবাহিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাবে না। একই সঙ্গে নতুন নায়ক তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, একজন জনপ্রিয় নায়ককে কেন্দ্র করে পুরো চলচ্চিত্রশিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। শাকিব খানের পাশাপাশি আরও জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান শিল্পী তৈরি করতে হবে। তাঁদের উপযোগী গল্প, বৈচিত্র্যময় চরিত্র ও মানসম্মত সিনেমা নির্মাণের পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে।এই বক্তব্যে উঠে আসে দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দর্শক ধরে রাখতে শুধু পরিচিত মুখ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী চিত্রনাট্য, নির্মাণের মান, বৈচিত্র্য এবং দর্শকের সঙ্গে গল্পের সংযোগ।

পাশাপাশি সিনেমা নির্মাণের পর তা দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কার্যকর প্রদর্শনব্যবস্থাও জরুরি।বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সংকটকে শুধু দর্শক কমে যাওয়ার সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। সিনেমা নির্মাণ থেকে শুরু করে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন-পুরো ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা বিষয়। ভালো সিনেমা নির্মিত হলেও তা নিয়মিত প্রদর্শনের সুযোগ না পেলে দর্শকের কাছে পৌঁছানো কঠিন। আবার হলের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও তাঁরা বিকল্প বিনোদনের দিকে ঝুঁকবেন।গাইবান্ধার চিত্রটি তাই বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনে-প্রেক্ষাগৃহকে কীভাবে আবার মানুষের বিনোদনের আকর্ষণীয় জায়গা করে তোলা যায়? এ জন্য প্রয়োজন মানসম্মত ও বৈচিত্র্যময় সিনেমা নির্মাণ, সারা বছর নতুন ছবি মুক্তির ধারাবাহিকতা, নতুন অভিনয়শিল্পী তৈরি এবং প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ উন্নত করা। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে আধুনিক সিনেমা প্রদর্শনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দর্শকদের আগ্রহ নতুন করে তৈরি হতে পারে।

তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নির্মাতা, প্রযোজক, হল মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর।একসময় যে সিনেমা হল ছিল মানুষের মিলনমেলা, সেটি আজ অনেক জায়গায় টিকে থাকার লড়াই করছে। গাইবান্ধার মায়া টকিজ, চৌধুরী ও নূপুরের স্মৃতি এখন পুরোনো দিনের গল্পের অংশ। শহরের শেষ সিনেমা হলটিও চলছে সীমিত দর্শক নিয়ে। কিন্তু এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা একেবারে শেষ হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোরও সুযোগ নেই।

প্রশ্ন হলো, চলচ্চিত্রশিল্প কি দর্শকের বদলে যাওয়া রুচি ও চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে? সিনেমা হল কি আবার হয়ে উঠবে মানুষের একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার জায়গা? নাকি বড় পর্দার সেই উন্মাদনা ক্রমেই স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে? গাইবান্ধার তাজ সিনেমা হলের ফাঁকা আসনগুলো যেন সেই প্রশ্নই সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।