এবার পোশাক নিয়ে বিপাকে দিশা পাটানি!

ফারহান তানভীর:

২০২৬ সালের গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে মুম্বাইয়ে আম্বানি পরিবারের আয়োজন ঘিরে বলিউড তারকাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সালমান খান, ক্যাটরিনা কাইফ, রণবীর কাপুরসহ একাধিক তারকা এই আয়োজনে অংশ নেন। তবে উৎসবের ছবিতে নজর কাড়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলাদা আলোচনার জন্ম দিয়েছেন অভিনেত্রী দিশা পাটানি। কারণ, তাঁর অভিনয় বা কোনো নতুন সিনেমা নয়, এবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে তাঁর উৎসবের পোশাক।

গণেশ চতুর্থীর সেই আয়োজনে দিশাকে দেখা যায় লাল রঙের লেহেঙ্গায়। পোশাকে ছিল সূক্ষ্ম কারুকাজ, সঙ্গে একই রঙের ব্লাউজ এবং এক কাঁধে জড়ানো লাল ওড়না। কানে বড় দুল, হাতে চুড়ি এবং খোলা চুলে উৎসবের সাজ সম্পূর্ণ করেছিলেন অভিনেত্রী। আম্বানি পরিবারের অনুষ্ঠানে প্রবেশের সময় আলোকচিত্রীদের জন্য পোজও দেন তিনি। সেই ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই পোশাকের গলার কাটকে ঘিরে শুরু হয় আলোচনা।

দিশার পোশাক নিয়ে অবশ্য সবাই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাননি। কেউ কেউ তাঁর সাজকে উৎসবের উপযোগী ও আকর্ষণীয় বলেও মন্তব্য করেছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অংশের আপত্তি ছিল মূলত ব্লাউজের গভীর গলার কাট নিয়ে। তাঁদের বক্তব্য, গণেশ চতুর্থী যেহেতু একটি ধর্মীয় উৎসব, তাই এমন অনুষ্ঠানে তারকাদের পোশাকের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট শালীনতা থাকা উচিত। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার সময় তারকাদের কি আলাদা ধরনের পোশাক বেছে নেওয়া উচিত নয়?

এমন মন্তব্যের মধ্যে কেউ কেউ বিষয়টিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন করেছে, ধর্মীয় উৎসবের আয়োজনগুলো কি ধীরে ধীরে তারকাদের ফ্যাশন প্রদর্শনের জায়গায় পরিণত হচ্ছে? আবার অন্য একটি পক্ষের বক্তব্য, পোশাকের ধরন দেখে কারও ধর্মীয় অনুভূতি বা কোনো উৎসবের প্রতি তাঁর সম্মান বিচার করা ঠিক নয়। ফলে দিশার পোশাককে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি কেবল একজন অভিনেত্রীর সাজ নিয়ে আলোচনা না থেকে ব্যক্তিস্বাধীনতা, ধর্মীয় পরিবেশ এবং তারকাদের প্রকাশ্য উপস্থিতির সামাজিক প্রত্যাশা-এই তিনটি বিষয়েরই সমান প্রতিফলন।

দিশা পাটানি অনেক আগে থেকেই তাঁর ফ্যাশন পছন্দের কারণে আলোচনায় থাকেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও রেড কার্পেট আয়োজনে তাঁর সাহসী পোশাক নতুন করে সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়েছে বহুবার। এবারের ঘটনাটিও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলা যায়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দিশার বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনাগুলো মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মতামত; এগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক ড্রেস কোড বা আয়োজকদের আপত্তি নয়।

এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি যে আম্বানি পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর পোশাক নিয়ে কোনো আপত্তি জানানো হয়েছে। বরং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে মূল আলোচনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াকেই ঘিরে।দিশাকে ঘিরে নতুন এই বিতর্কের সময়টা আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই প্রায় একই ধরনের আলোচনা হয়েছিল কৃতি শ্যাননকে নিয়ে। আগস্টে গয়না ব্র্যান্ড জিআইভিএর রক্ষাবন্ধন উপলক্ষে তৈরি একটি বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেছিলেন কৃতি। বিজ্ঞাপনে তাঁকে ব্রালেটধাঁচের ব্লাউজ, কেপ এবং ড্রেপ করা স্কার্টে দেখা যায়। পাশাপাশি বিজ্ঞাপনে রক্ষাবন্ধনের ভালোবাসা ও পারিবারিক উদযাপনের অংশ হিসেবে একটি পোষা কুকুরকেও দেখানো হয়েছিল। বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অংশ কৃতির পোশাক এবং বিজ্ঞাপনের উপস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বিতর্ক ক্রমে এতটাই বাড়ে যে ২৬ আগস্ট জিআইভিএ বিজ্ঞাপনটি সব মাধ্যম থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ব্র্যান্ডটি জানায়, ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উৎসবের প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। বিজ্ঞাপনটির উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ধারণাকে পোষা প্রাণীদের ক্ষেত্রেও প্রসারিত করা। তবে বিজ্ঞাপনটি সমাজের একটি অংশের অনুভূতিতে অনিচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করে থাকলে সেটি তাদের উদ্দেশ্য ছিল না-এ কথা জানিয়ে তারা বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করে।

তবে বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহারের আগেই কৃতি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, উৎসবের আসল বিষয় পোশাক নয়, বরং ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের অনুভূতি ও বিশ্বাস। তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল-`Culture & Traditions are in her heart, not in her neckline!’ অর্থাৎ একজন নারীর পোশাকের গলার কাট দেখে তাঁর সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের প্রতি সম্মানকে বিচার করা উচিত নয়-এমন অবস্থানই তিনি তুলে ধরেছিলেন।

কৃতির সেই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই দিশার গণেশ চতুর্থীর পোশাক নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসায় দুই ঘটনাকে পাশাপাশি দেখা হচ্ছে। অবশ্য দুই ঘটনার মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। কৃতির ক্ষেত্রে বিতর্কিত ছিল একটি ব্র্যান্ডের তৈরি বিজ্ঞাপন, যেখানে পোশাকের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনাও আলোচনায় এসেছিল। অন্যদিকে দিশার ক্ষেত্রে ঘটনাটি একটি বাস্তব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তাঁর ব্যক্তিগত পোশাককে কেন্দ্র করে। তাই দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট এক নয়, যদিও উভয় ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উৎসব ও পোশাকের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ভারতে উৎসবের সঙ্গে ফ্যাশনের সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে বলিউড তারকারা কোনো বড় ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আয়োজনে উপস্থিত হলে তাঁদের পোশাক, গয়না, সাজসজ্জা ও ছবি প্রায়ই উৎসবের খবরের একটি বড় অংশ হয়ে ওঠে। আম্বানি পরিবারের গণেশ চতুর্থীর আয়োজনও বহু বছর ধরে বলিউড তারকাদের উপস্থিতির কারণে ব্যাপকভাবে সংবাদমাধ্যমের নজরে থাকে। এবারের আয়োজনে যেমন নীতা আম্বানির বিশেষ গয়নাও আলাদা করে আলোচিত হয়েছে, তেমনি পরিবারের সদস্য রাধিকা আম্বানির গণেশ বন্দনার নৃত্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজর কেড়েছে।

ফলে দিশা পাটানির ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি লাল লেহেঙ্গা বা ব্লাউজের গলার কাটের গল্পে আটকে থাকছে না। এর মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে তারকাদের ব্যক্তিগত পোশাক পছন্দ এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সামাজিক প্রত্যাশার সংঘাত। এক পক্ষ মনে করছে, ধর্মীয় আয়োজনের নিজস্ব পরিবেশ ও রীতির প্রতি পোশাকে সম্মান দেখানো প্রয়োজন। অন্য পক্ষের যুক্তি, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পোশাক তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় এবং সেটিকে কেন্দ্র করে তাঁর বিশ্বাস বা সংস্কৃতিকে বিচার করা উচিত নয়। দিশা নিজে এখন পর্যন্ত এই সমালোচনা নিয়ে কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া জানাননি। ফলে আপাতত বিতর্কটি সীমাবদ্ধ রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন মতামত, পাল্টা মতামত এবং তারকাদের উৎসবের পোশাক নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যেই।