ফারহান তানভীর:
বাংলাদেশে এসে গরুর মাংস খাওয়ার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে নিজ দেশেই তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছেন ভারতীয় বাংলা সিনেমা ও টেলিভিশনের প্রবীণ অভিনেতা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। বাংলাদেশ সফরের সময় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের খাবারের প্রসঙ্গ উঠতেই গরুর মাংস ও ইলিশ মাছের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানান তিনি। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ঘিরে শুরু হয় নানা ধরনের কটাক্ষ, ট্রল এমনকি হুমকিও। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন এই অভিনেতা।

সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। সেখানে তাঁকে বাংলাদেশের খাবার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নিজের পছন্দের খাবারের তালিকায় গরুর মাংস ও ইলিশের কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশে এসে এসব খাবার খাওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে অভিনেতা জানান, দুপুরে হোটেলে মাছ-ভাত খেয়েছেন এবং রাতে গরুর মাংস খাওয়ার আশা করছেন। পরদিন ইলিশ মাছ খাওয়ার ইচ্ছার কথাও জানান তিনি। তাঁর এই স্বাভাবিক খাদ্যপছন্দের মন্তব্যই পরবর্তী সময়ে দুই বাংলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
বিশ্বজিতের মন্তব্যের পর ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাংশের ব্যবহারকারীর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিশেষ করে তিনি যে হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে আসা একজন অভিনেতা-এই পরিচয়কে ব্যবহার করেই অনেকে তাঁকে আক্রমণ করেন। কেউ তাঁকে নিয়ে কটূক্তি করেন, কেউ বয়কটের ডাক দেন, আবার কারও কারও পোস্টে তাঁকে কলকাতায় ফিরলে ডিম ছোড়ার মতো হুমকিও দেওয়া হয়। এমনকি তাঁর ছবি বিকৃত করে জুতোর মালা পরানো অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে।

তবে সমালোচনার মুখে নিজের বক্তব্য থেকে সরে যাননি বিশ্বজিৎ। বরং খাবার নিয়ে অন্যের হস্তক্ষেপের প্রশ্ন তুলে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল-কী খাবেন, কতটা খাবেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার পেট, আমার মন, আমার হাত-খাবারের জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হবে, সেটিও তাঁর নিজের; ফলে কী খাবেন বা কতটা খাবেন, সেটি অন্য কেউ ঠিক করে দেওয়ার অধিকার রাখে না।”বাংলাদেশ সফর নিয়েও পরে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন অভিনেতা। প্রথম দিকে তাঁর বাংলাদেশে আসার কারণ নিয়ে শুটিংয়ের কথা ছড়ালেও বিশ্বজিৎ জানান, সিনেমার শুটিং নয়, এক বোনের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতেই তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। ৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আসার পর ৫ সেপ্টেম্বরই কলকাতায় ফিরে যান তিনি। স্বল্প সময়ের এই সফরে বাংলাদেশের আতিথেয়তাতেও তিনি মুগ্ধ হয়েছেন বলে জানান।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণের মাত্রা বাড়তে থাকায় বিষয়টি আর শুধু মতের বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বজিৎ জানিয়েছেন, তাঁকে নিয়ে ট্রল, কটূক্তি ও হুমকির ঘটনায় তিনি আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি তিনি।এদিকে বিতর্কের মধ্যে বিশ্বজিতের পাশে দাঁড়িয়েছেন পশ্চিমবঙ্গেরই একাধিক শিল্পী।

অভিনেতা সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হন। বিশ্বজিতের ছবি বিকৃত করে কিংবা তাঁকে জুতোর মালা পরানো অবস্থায় দেখিয়ে যারা পোস্ট করেছেন, তাঁদের সমালোচনা করেন তিনি। পাশাপাশি শিল্পীদের এমন আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান সুরজিৎ। নিজের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করে তিনি জানান, তিনিও দুবার বিফ রোল খেয়েছেন।অভিনেত্রী মানসী সিনহাও বিশ্বজিৎকে নিয়ে করা আপত্তিকর পোস্টের নিন্দা জানিয়েছেন। এসব পোস্টের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিও আহ্বান জানান তিনি। অভিনেতা আদৃত রায়সহ আরও কয়েকজন শিল্পী বিশ্বজিতের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশ টিভি।সবচেয়ে সরব প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি এসেছে অভিনেত্রী তিথি বসুর কাছ থেকে। জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘মা’-এর ঝিলিক চরিত্রের মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া তিথি একটি ভিডিও বার্তায় বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর সমর্থনে কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশে গিয়ে কে কী খাবেন বা খাবেন না, সেটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। বিশ্বজিতের সততারও প্রশংসা করেন তিনি।তিথি আরও দাবি করেন, বিনোদন জগতের অনেকেই প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে গরুর মাংস খান। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁদের ধারাবাহিকে এমন ব্রাহ্মণ অভিনেতাও ছিলেন, যারা সেটে বসে বিফ নিয়ে আলোচনা করতেন। কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় বিফ খেতে যাওয়া অনেক হিন্দুর কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এমনকি তাঁর দাবি, মুসলিমদের তুলনায় হিন্দুদের মধ্যেও অনেকে গরুর মাংস খান।
বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বাংলা বিনোদন জগতের দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ।১৯৯৩ সালে ‘শূন্য থেকে শুরু’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’, ‘বাই বাই ব্যাংকক’, ‘মিশর রহস্য’, ‘জাতিস্মর’, ‘রাজকাহিনি’র মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। ১৪০ টির বেশি সিনেমায় অভিনয়সহ টেলিভিশনেও দীর্ঘদিন ধরে তাঁর উপস্থিতি রয়েছে।

বাংলাদেশ সফর শেষে কলকাতায় ফিরে যাওয়ার পরও থামেনি তাঁকে ঘিরে আলোচনা। বরং গরুর মাংস খাওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলার কারণে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখন দুই বাংলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার বিষয়। তবে ট্রল কিংবা হুমকির মুখে নিজের খাদ্যপছন্দ নিয়ে ক্ষমা চাওয়া বা বক্তব্য প্রত্যাহারের পথে হাঁটেননি বিশ্বজিৎ। বরং নিজের পছন্দের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিজের কাছেই রাখার বার্তাই দিয়েছেন তিনি। আর তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তিথি বসু, মানসী সিনহা, সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো শিল্পীরাও মনে করিয়ে দিয়েছেন-একজন মানুষের খাবারের পছন্দকে কেন্দ্র করে তাঁকে অপমান বা হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই সুস্থ মতপ্রকাশের অংশ হতে পারে না।