বাবা-মায়ের হাতে যারা মার খায়নি,তারা মানুষ হতে পারেনি-দেব

ফারহান তানভীর :

“বাবা-মায়ের হাতে যারা মার খায়নি তারা মানুষ হতে পারেনি”-সম্প্রতি এমন মন্তব্য করে আলোচনায় এসেছেন ভারতীয় অভিনেতা দেব। তিনি আরও বলেন, তাদের সময়ে শিক্ষার পাশাপাশি শাসনও ছিল, আর এখনকার অনেক বাবা-মা সন্তানদের অতিরিক্ত আদর করতে গিয়ে ছোট বয়সেই মোবাইল ফোন হাতে তুলে দিচ্ছেন। ফোন চাইলে তাদের সময়ে নাকি উল্টো চড়-থাপ্পড়ই জুটত। দেবের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কেউ একে বাস্তবতা বলে সমর্থন করছেন, আবার কেউ বলছেন, মানুষ হওয়ার জন্য মারধর নয়, প্রয়োজন সঠিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ।

আসলে আমাদের সমাজে বিষয়টি নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি প্রজন্মই মনে করে, তাদের সময়ের শাসনব্যবস্থা বর্তমান সময়ের তুলনায় বেশি কার্যকর ছিল। যারা নব্বইয়ের দশক কিংবা তারও আগে বড় হয়েছেন, তাদের অনেকের শৈশব কেটেছে কঠোর পারিবারিক পরিবেশে। বাবা-মায়ের কথা অমান্য করা, পরীক্ষায় খারাপ ফল করা কিংবা কোনো দুষ্টুমি করলে শাস্তি পাওয়া ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। সেই প্রজন্মের অনেকে বিশ্বাস করেন, এই শাসনের কারণেই তারা দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী এবং বাস্তববাদী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পেরেছেন।

অন্যদিকে বর্তমান সময়ে সন্তান পালনের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তির বিস্তার, ব্যস্ত জীবনযাপন এবং নতুন ধরনের প্যারেন্টিং ধারণার কারণে অনেক বাবা-মা শারীরিক শাস্তি থেকে দূরে থাকতে চান। তারা সন্তানকে বোঝানোর মাধ্যমে শিক্ষা দিতে বেশি আগ্রহী। তবে সমালোচকদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে এই স্বাধীনতা ও আদর অতিরিক্ত মাত্রায় চলে যাচ্ছে। ছোট বয়স থেকেই মোবাইল ফোন, ট্যাব কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতা শিশুদের বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ফলে ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক আচরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অনেকে মনে করেন।

দেবের বক্তব্যের মূল জায়গাটাও সম্ভবত এখানেই। তিনি হয়তো সরাসরি মারধরকে উৎসাহিত করতে চাননি, বরং বলতে চেয়েছেন যে একটি শিশুর জীবনে শাসনের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ কোনো সীমারেখা ছাড়া বেড়ে ওঠা সন্তানের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অতিরিক্ত কঠোরতাও সমস্যার কারণ হতে পারে। বাস্তবতা হলো, শাসন এবং নির্যাতন এক জিনিস নয়। একজন অভিভাবক সন্তানের ভুল ধরিয়ে দিতে পারেন, তাকে নিয়ম মেনে চলতে শেখাতে পারেন, কিন্তু তা অবশ্যই এমনভাবে হওয়া উচিত যাতে সন্তানের আত্মসম্মান বা মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

বর্তমান প্রজন্মকে নিয়ে প্রায়ই অভিযোগ করা হয় যে তারা আগের মতো কষ্ট সহ্য করতে পারে না, দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে এবং মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল। এই অভিযোগের পেছনে কিছু বাস্তবতাও রয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে আজকের প্রজন্ম অনেক বেশি তথ্যসমৃদ্ধ, প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং বিশ্ব সম্পর্কে সচেতন। ফলে শুধু অতীতকে আদর্শ এবং বর্তমানকে ব্যর্থ বলা হয়তো সঠিক মূল্যায়ন হবে না।

আসলে মানুষ গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক পরিবেশ। কেউ শৈশবে মার খেয়েছে বলেই ভালো মানুষ হয়েছে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আবার কেউ কখনো শারীরিক শাস্তি পায়নি বলেই খারাপ মানুষ হবে, সেটাও সত্য নয়। একজন মানুষের চরিত্র গঠনে ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।

দেবের মন্তব্য তাই শুধু মারধর নিয়ে বিতর্ক নয়, বরং বর্তমান সমাজে সন্তান পালনের ধরন নিয়ে একটি বড় আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে সন্তানকে কীভাবে বড় করা উচিত, কতটা স্বাধীনতা দেওয়া উচিত এবং কোথায় গিয়ে শাসনের প্রয়োজন-এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু একজন ভালো মানুষ তৈরির চ্যালেঞ্জ আজও একই রয়ে গেছে।