ফারহান তানভীর :
বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণালী সময়ের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নায়ক আলমগীর-যার নাম উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে এক অদম্য নায়কোচিত উপস্থিতি।তিনি ছিলেন সেই সময়ের সেই পর্দা কাঁপানো নায়ক, যার চোখের চাহনি আর সংলাপ বলার ভঙ্গিতে মুগ্ধ হয়ে থাকত পুরো এক প্রজন্ম। পর্দার বাইরেও আলমগীরের উপস্থিতি ছিল সমান শক্তিশালী। আর সেই উপস্থিতি শক্তিরই এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন তাঁর কন্যা আঁখি আলমগীর , যিনি নিজেও সংগীতাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত একজন শিল্পী। আঁখির ছোটবেলার সেই অভিজ্ঞতা শুধু একজন বাবার জনপ্রিয়তার গল্পই নয়, বরং ‘নায়ক’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ কী-সেটাই আমাদের বুঝিয়েছেন।

আঁখি আলমগীরের ভাষ্যে জানা যায়, ছোটবেলায় তিনি কখনোই বাবা আলমগীরের সঙ্গে সিনেমা হলে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। কারণটা ছিল এমন যে-আলমগীর কোনো হলে প্রবেশ করলেই সেখানকার পরিবেশ আর সিনেমা দেখার মতো থাকত না। দর্শকদের উচ্ছ্বাস, চিৎকার আর এক নজর দেখার জন্য অবিশ্বাস্য উন্মাদনা পুরো হলকে যেন অন্য এক মঞ্চে পরিণত করত। সিনেমা পর্দায় চললেও, দর্শকের চোখ আটকে থাকত বাস্তবের নায়কের দিকে।

এরপরেই আঁখি বলেন-এ. জে. মিন্টু পরিচালিত সত্য-মিথ্যা সিনেমার কথা।জ্ঞাতব্য,সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল ৩ মার্চ,১৯৮৯ সালে।সিনেমাটিতে আলমগীর ছাড়াও অভিনয় করেছিলেন শাবানা,নূতন,আনোয়ার হোসেন এবং রাজীবসহ আরো অনেকে। এই সিনেমাটি ছিল সেই সময়ের জনপ্রিয় ও আলোচিত কাজগুলোর একটি, যেখানে সামাজিক বাস্তবতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং নৈতিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গল্প গড়ে উঠেছিল। ছবিটি মুক্তির পর সেই সময়ে দর্শকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। আর সেই কারণেই চট্টগ্রামের বনানী কমপ্লেক্সে সত্য-মিথ্যা সিনেমার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে ছবির কলাকুশলীদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল।সেই উপলক্ষে আলমগীর, আঁখি আলমগীর,শাবানা,নূতন এবং পুরো টিম অবস্থান করছিলেন চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ হোটেলে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী সবাই একসঙ্গে বাসে করে সিনেমা হলে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিলেন। কিন্তু হোটেল থেকে রাস্তায় আসতেই তারা বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় ভিড় জমিয়েছিল শুধু একবার কাছ থেকে প্রিয় নায়ক আলমগীরকে দেখার জন্য। মানুষের ঢল এতটাই হয়ে উঠেছিল যে বাসের একটি চাকাও সামনে এগোতে পারছিল না। অবস্থা সামাল দিতে আলমগীর নিজেই বাস থেকে নেমে আসেন এবং একা একা সামনে হাঁটতে শুরু করেন। তিনি এগোচ্ছেন আর তার পেছনে হাজারো মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে অনুসরণ করছে। কোনো নির্দেশ ছিল না, কোনো রাজনৈতিক মিছিলও নয়-তবুও পুরো শহর যেন এক অদৃশ্য স্রোতে ভেসে চলছিল তার পেছনে।আঁখি পরবর্তীতে এই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, সেদিনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ‘হিরোয়িজম’ আসলে কী। এটি যে কেবল পর্দার লড়াই, সংলাপ বা স্টাইল নয়-বরং মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার এক অদৃশ্য শক্তি, যা একজন মানুষকে ভিড়ের মাঝেও আলাদা করে তোলে সেটা হয়তো আকখি সেদিনই বুঝেছিলেন।

আঁখি আলমগীর নিজেও অবশ্য সংগীতজগতে নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। প্লেব্যাক, আধুনিক গান কিংবা স্টেজ পারফরম্যান্স-সব জায়গাতেই তিনি নিজের স্বকীয়তা প্রমাণ করেছেন।তুমি যে আমার সাধনা,জল পড়ে পাতা নড়ে,তোমার দুনিয়া,পিরিতি বিষের কাটা,পিয়া গেছে দুবাই,ধিন তানা,টিপ টিপ বৃষ্টিসহ অসংখ্য গানে তিনি নিজের কন্ঠ দিয়েছেন। তারপরেও বাবা আলমগীরের সেই দিনের ঘটনাটি তার কাছে শুধু স্মৃতি নয়, বরং একটি উপলব্ধি-খ্যাতি কীভাবে মানুষের ভালোবাসার সঙ্গে মিশে যায় আর একজন শিল্পী কীভাবে হয়ে ওঠেন মানুষের আবেগের অংশ।