ফারহান তানভীর :
সমুদ্রকে যেমন দু’হাতে ধরা যায় না, তেমনই সুরের বিশাল আকাশে আশা ভোঁসলে নামের এই নক্ষত্রকে কয়েকটি শব্দে বেঁধে ফেলা প্রায় অসম্ভব। তবুও ইতিহাস, স্মৃতি আর অনুভূতির ভেতর দিয়ে তাঁর জীবনকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করলেই বোঝা যায়-গল্পটা শুধু একজন গায়িকার নয়, এটা এক সংগ্রামী, নিরবচ্ছিন্ন সাধক আর বারবার ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ানো এক অসাধারণ নারীর গল্প ।

১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলিতে জন্মগ্রহণ করেন আশা ভোঁসলে। তাঁর বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও নাট্যাভিনেতা। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের আবহে বেড়ে ওঠা আশার জীবনে হঠাৎই নেমে আসে অন্ধকার-মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতৃহারা হন তিনি। তখন তাঁর বড় বোন লতা মঙ্গেশকর নিজের সহ পাঁচ ভাইবোন এবং সংসারের সকল দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন আর ছোট্ট আশাও তার পাশে দাঁড়ান।
খুব অল্প বয়সেই শুরু হয়েছিল আশার সঙ্গীতজীবন। ১৯৪৩ সালে মারাঠি চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার মাধ্যমে পথচলা শুরু হয় এবং ১৯৪৭ সালে এসেছিল হিন্দি চলচ্চিত্রে প্রথমবার প্লেব্যাকের সুযোগ। কিন্তু তাঁর এই শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। যখন লতা মঙ্গেশকর ও গীতা দত্ত ইতিমধ্যেই সঙ্গীতজগতে প্রতিষ্ঠিত, তখন আশার ভাগ্যে জুটত দ্বিতীয় সারির সুযোগ, বি-গ্রেড বা সি-গ্রেড ছবির গান। কিন্তু ‘না’ শব্দটি যেন তাঁর অভিধানেই ছিল না-যে সুযোগই পেয়েছেন, সেটাকেই করেছেন নিজের অস্ত্র।

আশা ভোঁসলের ব্যক্তিগত জীবনেও কম ঝড় আসেনি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিজের পরিবারের অমতে দিদি লতা মঙ্গেশকরের ম্যানেজার ৩১ বছর বয়সী গণপত রাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন, যা ছিল তাঁর জীবনের এক অন্যতম কঠিন অধ্যায়। সংসারের চাপ, নির্যাতন, সন্তান লালন-সবকিছুর মধ্যেও গান থামাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক ভেঙে গেলে তিনি আবার ফিরে আসেন নিজের পরিবারে, কিন্তু থেমে থাকেননি।
গণপত রাও এর পর আশার জীবনে আশার আলো হয়ে আসেন সঙ্গীত পরিচালক ওপি নাইয়ার। তাদের সেই জুটি ভারতীয় সঙ্গীতে এক নতুন ধারা তৈরি করেছিল। ‘সিআইডি’ সিনেমার ”নয়া দওর” গানসহ একের পর এক হিট গান তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। যেহেতু নাইয়ার তখন বিবাহিত এবং চার সন্তানের পিতা তাই আশাকে বিয়ে করা সম্ভব না হলেও তারা প্রায় ১৪ বছর ছিলেন লিভইন-এ।নাইয়ারের সন্তানরা বড় হওয়ার সাথে সাথে আশা এবং নাইয়ারের মাঝেও দূরত্ব বাড়তে থাকে।ব্যক্তিগত জীবনের এসব ঘটনার জন্য বড় বোন লতার সাথেও দূরত্ব তৈরি হয়েছিল আশার।এতে অবশ্য আশার জন্য একদিক থেকে ভালোও হয়েছিল।লতার প্রায় অনেকগুলো গানই গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে।

ওপি নাইয়ার জীবন থেকে চলে গেলে তারপর আশার জীবনে এসেছিল রাহুল দেব বর্মণ। ‘তিসরি মঞ্জিল’ থেকে শুরু করে অসংখ্য গানে এই জুটি শুধু হিটই দেয়নি, ভারতীয় সঙ্গীতে পশ্চিমা সুরের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কও ধীরে ধীরে গভীর হয় এবং ১৯৮০ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।সমগসার বেশ ভালোই চললেও ১৯৯৪ সালে রাহুল দেব বর্মনের মৃত্যুর পর আবারও একাকিত্বে ডুবে যান আশা।
প্রথমে গণপত রাও,তারপর ওপি নাইয়ার এবং সবশেষে রাহুল দেবকে হারিয়েও জীবন সংগ্রাম থামাননি আশা। ৭০ বছর বয়সে এসেও এ আর রহমান -এর সুরে ‘রঙ্গিলা’ ছবিতে গান গেয়ে প্রমাণ করেছিলেন-প্রতিভার কোনো বয়স নেই। জীবনের শেষপ্রান্তেও তিনি ছিলেন সমান সক্রিয়, সমান প্রাসঙ্গিক।ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক আঘাত-নিজের জীবনসঙ্গী হারানো,মেয়ের আত্মহত্যা, ছেলের মৃত্যু-কোনোকিছুই আশাকে ভেঙে দিতে পারেনি। বরং তিনি নিজেকে আরও বেশি করে সুরের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছিলেন। ২০টিরও বেশি ভাষায় প্রায় ১৪ হাজার গান গেয়ে তিনি গড়েছেন এক অনন্য রেকর্ড, যা তাঁকে স্থান দিয়েছে গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে। পুরস্কারের দিক থেকেও পিছিয়ে ছিলেন না আশা।৯ টি ফিল্মফেয়ার,১ টি আইআইএফএ এওয়ার্ড সহ মোট ৭৬ টি পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।

শুধু গানে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আশা ভোঁসলে ছিলেন বহুমুখী-রান্না থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ ব্যবসা, সব জায়গাতেই রেখেছেন নিজের ছাপ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিচয় একটাই-তিনি সুরের মানুষ,তিনি গানের মানুষ। আজ আশা ভোঁসলে আর আমাদের মাঝে নেই, তবুও তাঁর গান বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে আমাদেরই মাঝে। প্রেমে, বিরহে, উচ্ছ্বাসে, একাকিত্বে-জীবনের প্রতিটি অনুভূতিতে বারবার ফিরে আসবে সেই কণ্ঠ। কারণ কিছু শিল্পী সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না, তাঁরা হয়ে থাকেন সময়েরই অংশ। আশা ভোঁসলে তেমনই এক নাম-যতদিন সুর থাকবে, ততদিন তিনি থাকবেন, অমলিন, অনন্ত।