ফারহান তানভীর:
৯০-এর দশকের সেই সময়টার কথা কি মনে আছে? যখন বিকেল বেলা সিনেমার শো দেখার জন্য বন্ধুরা মিলে হলের সামনে লাইন ধরা হতো এবং হাতে টিকিট পেলে যেন ছোট খাটো যুদ্ধ জেতার আনন্দ অনুভূত হতো। আর হলের ভেতরে ঢুকেই যখন স্ক্রিনে চোখ রাখলে সালমান শাহকে দেখা যেত তখন যেন সেই আনন্দ আরো বেড়ে যেতো। সালমান শাহ এবং মৌসুমি অভিনীত “কেয়ামত থেকে কেয়ামত” সিনেমাটি তাই সেই সময় শুধু একটা সিনেমা ছিল না, ছিল এক প্রজন্মের আবেগ এবং প্রেমে পড়ার গল্প।

১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া সেই “কেয়ামত থেকে কেয়ামত” সিনেমা দিয়েই চলচ্চিত্র জগতে একসাথে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন সালমান শাহ ও মৌসুমি। পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তখন তার সিনেমার জন্য নতুন শিল্পী খুঁজছিলেন এবং সেই খোঁজ থেকেই উঠে এসেছিল প্রয়াত নায়ক সালমান শাহ এবং মৌসুমি। কেয়ামত থেকে কেয়ামত সিনেমাটির গল্প যে সে সময়ের অন্যান্য সিনেমাগুলোর তুলনায় আলাদা ছিল তা না। বরং দুই পরিবারের বিরোধ, তার মাঝখানে জন্ম নেয় প্রেম আর পারিবারিক বিরোধের কারণে সেই প্রেমের করুণ পরিণতি-এটিই ছিল সিনেমার গল্প। অন্য সিনেমাগুলোর মতোই সাধারণ গল্প হওয়ার পরেও তাহলে কিভাবে এতো জনপ্রিয় হয়েছিল কেয়ামত থেকে কেয়ামত?এর পেছনে অবশ্য কারণ ছিল সিনেমার নায়ক সালমান শাহ ও নায়িকা মৌসুমির।নিজেদের প্রথম সিনেমা হওয়া সত্ত্বেও পুরো গল্পটাকে তারা এমনভাবে ফুটে তুলেছিল যে গান, সংলাপ, আবেগ-সবকিছু মিলিয়ে সিনেমাটি হয়ে উঠেছিল দর্শকের নিজের গল্প।

কেয়ামত থেকে কেয়ামত সিনেমাটি নিয়ে বলতে গেলে এর গানগুলো নিয়েও আলাদা করে বলতেই হয়। “ ও আমার বন্ধু গো,একা আছি তো কি হয়েছে,এখন তো সময় ভালোবাসার”-এই গানগুলো তখন শুধু শোনা হতো না, গানপাগলরা অন্তর দিয়ে অনুভবও করতো। বাসায় কিংবা দোকানের ক্যাসেট প্লেয়ারে বারবার বাজানো হতো এই গানগুলো আর হলের ভেতরে গান শুরু হলেই দর্শকরা আবেগের সাগরে ভাসতে শুরু করতো। এমন অনেক মানুষ আছে এখনো যাদের কাছে কেয়ামত থেকে কেয়ামত সিনেমা মানে আসলে তার গান।

কেয়ামত থেকে কেয়ামত সিনেমাটি যে বাংলা সিনেমা জগতে একটা নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল তা বলাই যায়। সিনেমাটি দর্শকমহলে অভাবনীয় সাড়া পাবার পর বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে রোমান্টিক সিনেমা বানানোর হিরিক পড়ে গিয়েছিল।যার ফলে দেনমোহর,স্নেহ,অন্তরে অন্তরে-এর মতো সিনেমাগুলো দর্শক উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছিল।সে সময় সালমান শাহর চুলের স্টাইল, তার বেশভূষা, এমনকি চোখের সানগ্লাস -সবকিছুই সে সময়ের তরুণদের ব্যাপক চর্চার বিষয় ছিল। সালমান শাহ যেন শুধু নায়ক ছিল না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটা ফ্যাশন মডেলও। প্রথম সিনেমা হিসেবে মৌসুমিও কম আলোচনায় ছিলেন না।প্রথম সিনেমাতেই তাক লাগানো অভিনয় করে দর্শকদের মন এমনভাবে জয় করেছিলেন যেন তিনি সিনেমা জগতের অনেক পুরোনো মুখ।
অবাক করা একটি ব্যাপার হলো সিনেমাটিতে সালমান শাহ এর আগে নায়ক হিসেবে ভাবা হয়েছিল সে সময়ের জনপ্রিয় মডেল আদিল হোসেন নোবেলকে। একটা সাক্ষাৎকারে আদিল হোসেন নোবেলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল-এই সিনেমাটা নাকি তার করার কথা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো তিনি করেননি। এই নিয়ে কোনো আফসোস আছে কি না? নোবেলও বিনা ভাবনায় সরাসরি বলেছিলেন -তার কোনো আফসোস নেই, বরং তিনি মনে করেন তিনি বেঁচে গেছেন।সেদিন নোবেল নিজেই বলেছিলেন- হলে বসে কেয়ামত থেকে কেয়ামত দেখে তার মনে হয়েছে, সালমান শাহ যেভাবে চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলেছেন, সেটা তার পক্ষে সম্ভব হতো না। এমনকি তিনি অকপটে এটাও স্বীকার করেছিলেন, যদি তিনি সিনেমাটি করতেন, তাহলে হয়তো সিনেমাটাই নষ্ট হয়ে যেত।

তাই বলে যে তিনি আফসোস করেন না তা ঠিক না। আর সেজন্যই আফসোসের প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, যদি কোনো আফসোস থাকে, তাহলে সেটা কেয়ামত থেকে কেয়ামত মিস করা না-বরং সালমান শাহর অকাল মৃত্যু।মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র জীবনেই সালমান শাহ যে পরিমাণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন,তার প্রমাণ এখনো ভক্তদের পাগলামি দেখলেই পাওয়া যায়।সহশিল্পী হিসেবে নোবেলও তাই আফসোস করেন সালমান শাহকে হারানোর জন্য,কেয়ামত থেকে কেয়ামতে অভিনয় না করার জন্য নয়।