অভাব যেন পিছুই ছাড়ছেনা কৌতুক অভিনেতা শামীম হোসেনের!

মেহেদী হাসান :

নাটক আর সিনেমার পর্দায় ছোট ছোট কমেডি চরিত্রে হাজির হয়ে বছরের পর বছর দর্শকদের হাসিয়েছেন অভিনেতা শামীম হোসেন। কখনও সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি, কখনও বা দুই-একটি সংলাপ-তবু তার উপস্থিতি দর্শকের মুখে হাসি ফোটাতে যথেষ্ট ছিল। অথচ আজ সেই মানুষটিই নিজের জীবনের কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো সাহায্যের প্রত্যাশা করছেন। দীর্ঘদিন কাজ না থাকায় অর্থকষ্টে দিন কাটছে তার, আর সেই দুঃসময়ের কথা জানাতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েছেন এই অভিনেতা।

অভিনেতা শামীম হোসেন – ফেসবুক থেকে

সম্প্রতি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন শামীম হোসেন। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নিজের বর্তমান অবস্থার কথা তুলে ধরছেন। সেখানে তিনি বলেন, হাতে কোনো কাজ নেই আর কাজ না থাকার এই অনিশ্চয়তা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে। টেনশনে কখনো কখনো মনে হয় পাগল হয়ে যাবেন। জীবনের এই কঠিন সময়ে তার পাশে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই বলেও জানান তিনি। আল্লাহর কাছে নিজের জন্য এবং সবার রিজিকে বরকত কামনা করেন এই অভিনেতা।নিজেকে মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে শামীম বলেন, মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের বাস্তবতা অনেক সময় বড় নির্মম। অনেক সময় জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়-হয়তো কেউ কোনো কাজের ডাক দেবে, হয়তো কেউ পাশে এসে দাঁড়াবে।

অভিনেতা শামীম হোসেন – ফেসবুক থেকে

অভাব কাকে বলে, সেই বাস্তবতা এখন নতুন করে উপলব্ধি করছেন তিনি।রোজার মাসের প্রায় অর্ধেক সময় পার হয়ে গেলেও হাতে কোনো কাজ না থাকায় মানসিকভাবে ভীষণ চাপে আছেন শামীম হোসেন। সাধারণত প্রতি মাসে পরিবারের জন্য একটি নির্দিষ্ট আয়ের লক্ষ্য থাকে তার। কিন্তু কাজ না থাকায় সেই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সংসারে তৈরি হয়েছে আর্থিক টানাপোড়েন।রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় বসে এক প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের অসহায়তার কথাও খোলামেলাভাবে তুলে ধরেন এই অভিনেতা।

তিনি জানান, অভিনয় পেশা ছেড়ে অন্য কিছু করতে গেলেও বাস্তবতা তাকে আটকে দেয়। তার কথায়, একজন শিল্পী হিসেবে অন্য কোনো পেশায় নামতে গেলেও নিজের মধ্যে এক ধরনের সংকোচ কাজ করে। তিনি বলেন, চেহারার কারণে সাধারণ ব্যবসা বা অন্য কাজেও নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছেন না। বাদাম বিক্রি করা, কাঁচামালের ব্যবসা কিংবা অটোরিকশা চালানো-কোনোটাই যেন সহজ মনে হয় না তার কাছে। একজন শিল্পী হিসেবে নিজের সম্মানবোধও তাকে অনেক সময় আটকে দেয়। তাই অনেক সময় না খেয়ে দিন কাটানোর পরিস্থিতিও তৈরি হয়।

অভিনেতা শামীম হোসেন ও হারুন কিসিঞ্জার – ফেসবুক থেকে

শামীম হোসেনের পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পুরো পরিবারের দায়িত্ব তার একার কাঁধে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় এই চাপটা আরও বেশি অনুভব করেন তিনি। সঞ্চয়ও তেমন কিছু নেই বলে জানান এই অভিনেতা। তার ভাষায়, সামান্য যে অর্থ আছে, হয়তো কষ্ট করে রোজার মাসটা কোনোভাবে পার করা যাবে।সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান সন্তানদের কথা ভাবলে। তিনি জানান, তার সন্তানদের কোনো বড় চাওয়া-পাওয়া নেই। ঈদ সামনে রেখে যখন তিনি সন্তানদের বলেন-পরিস্থিতি ভালো না, হয়তো নতুন কিছু কেনা সম্ভব হবে না-তখন সন্তানরাই তাকে সান্ত্বনা দেয়। তারা বলে, তাদের কোনো চাওয়া নেই। সন্তানদের এই কথাগুলো একজন বাবার জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি আবার গভীর কষ্টেরও।

অভিনেতা শামীম হোসেন – ফেসবুক থেকে

তবে জীবনের সংগ্রাম শামীম হোসেনের জন্য নতুন কিছু নয়। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় আগে জীবিকার তাগিদে কুলিগিরি, রিকশা চালানোসহ নানা ধরনের কাজ করেছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে বেইলি রোডের মহিলা সমিতির অফিসে পিয়নের চাকরি নেওয়ার পরই তার জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করে। সেখান থেকেই পরিচয় ঘটে অভিনেত্রী ও নির্মাতা আফসানা মিমি-র সঙ্গে। তার হাত ধরেই ‘বন্ধন’ নাটকে কয়েকটি দৃশ্যে অভিনয়ের সুযোগ পান শামীম। সেই ছোট্ট সুযোগই ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় অভিনয়ের জগতে।এরপর বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

ক্যারিয়ারে হাজারের বেশি নাটক এবং দুই ডজনেরও বেশি সিনেমায় ছোট ছোট কমেডি চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। কিন্তু সেই পরিচিতি আজ নিয়মিত কাজ বা আয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।তবুও আশাবাদ হারাতে চান না শামীম হোসেন। তার বিশ্বাস, মানুষ তার বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানলে হয়তো কেউ না কেউ তাকে আবার কাজের সুযোগ দেবেন। ইতোমধ্যে তার আর্থিক সংকটের খবর প্রকাশের পর কয়েকটি জায়গা থেকে ফোনও পেয়েছেন বলে জানান তিনি। সেই ফোনগুলোই এখন তার জন্য নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। শামীমের আশা, খুব শিগগিরই হয়তো আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারবেন-আর আগের মতোই মানুষকে হাসাতে পারবেন নিজের অভিনয়ে।