ফারহান তানভীর :
দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা ও রাজনীতিবীদ জোসেফ বিজয় চন্দ্রকেশর বা ভক্তদের কাছে “থালাপতি বিজয়।” একজন অভিনেতা হিসেবে ইনি এতোটা জনপ্রিয় যে সিনেমার গল্প যা-ই হোক না কেন কেবোল ওনার নামেই সিনেমাটি হিট হতে পারে।মাস্টার,বিস্ট,লিও,থেরি-র মতো সিনেমাগুলোতে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের মনে এমন জায়গা করে নিয়েছেন যে তা চাইলেও মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তবে জনপ্রিয় এই অভিনেতা ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের এখন পর্যন্ত একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যা তার দীর্ঘদিনের গড়া সাম্রাজ্যকে বড় বাঁধার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

বিজয়ের এই ধারাবাহিক সংকটের শুরু ধরা হচ্ছে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, যখন তামিলনাড়ুর কারুরে তার রাজনৈতিক দল Tamilaga Vettri Kazhagam(TVK)এর একটি বড় সমাবেশ আয়োজন করা হয়। সেই জনসভায় অনুমোদিত সংখ্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি মানুষ উপস্থিত হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়েছিল পদদলনের ঘটনা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে থেকে জানা গেছে, সেদিনের ওই ঘটনায় অন্তত ৩০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং বহু মানুষের আহত হয়েছে। একজন নতুন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বিজয়ের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় একটি ধাক্কা ছিল। ঘটনাটি যেমন তার সাংগঠনিক সক্ষমতা ও নেতৃত্বের ওপর যেমন সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিল তেমনইতার বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগও দায়ের করা হয়েছিল।যদিও বিজয় পরবর্তীতে আহত বা নিহত হওয়া পরিবারের সদস্যদের সকল দায়িত্বই নিয়েছিলেন।

জনসভায় ছত্রভঙ্গ হওয়ার সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২০২৬ সালের শুরুতেই তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বড় ধরনের আলোচনার সূত্রপাত হয়। জানুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারির শুরুতে বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমে এই খবর প্রকাশ করে যে বিজয়ের স্ত্রী সঙ্গীতা চেঙ্গালপট্টু আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করেছেন। মোটামুটি ১৯৯৯ সাল থেকে শুরু হওয়া তাদের এই দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে ভাঙনের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সঙ্গীতার সেই অভিযোগের মধ্যে ছিল বিজয়ের পরকিয়ার ফলে সম্পর্কের অবনতি, দূরত্ব এবং মানসিক অশান্তির বিষয়, যদিও সেইসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি কোনো পক্ষ থেকেই। ওই একই সময়ে অভিনেত্রী তৃষা কৃষ্ণানের সঙ্গে বিজয়ের সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল। যদিও এসব অভিযোগের কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি, তবে একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে বিজয় ও তৃষাকে একসাথে দেখা এবং বিজয়ের ছবির সাথে তৃষার হোম লিখে ক্যাপশন ব্যবহার করাতেই অনেকে ভেবেছেন গুঞ্জনটি আসলেও সত্য।

জীবন যখন এমনিতেই চাপের মুখে তখন যেন কফিনের শেষ পেরেক হিসেবে এসেছে বিজয়ের শেষ সিনেমা `Jana Nayagan’। সিনেমাটি এই বছরের জানুয়ারিতে মুক্তির জন্য প্রস্তুত করা হলেও সেন্সর বোর্ডের আপত্তির কারণে সেটি আটকে যায়। Central Board of Film Certification ছবিটিকে পুনর্বিবেচনার জন্য পাঠিয়েছিল, যার ফলে মুক্তির তারিখ অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যায়। নির্মাতারা বিষয়টি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হলেও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে ছবির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এইসব জটিলতার মধ্যেই গত ১০-ই এপ্রিল ঘটে যায় সবচেয়ে বড় ঝড়। ৯ এপ্রিল সিনেমাটির ৫ মিনিটের একটি সিন লিক হলেও ১০ তারিখে সিনেমাটির সম্পূর্ণ HD ভার্সন অনলাইনে ফাঁস হয়ে যায়। আর প্রতিটি সিনেমা সাইটেই এখন Jana Nayagan সহজলভ্য হয়ে গেছে। মুক্তির আগেই এতো বড় বাজেটের সিনেমা লিক হওয়া যেমন কলাকৌশলীদের জন্য ক্ষতি তেমনই তা গোদের উপর বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজয়ের জন্যও।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের নিজের রাজনৈতিক সমাবেশের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের শুরুতে ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন এবং এপ্রিল মাসে মুক্তির আগেই নিজের সর্বশেষ সিনেমা Jana Nayagan অনলাইনে ফাঁস হয়ে যাওয়া- সব মিলিয়ে নিঃসন্দেহে এক বাজে সময়ের মধ্যে দিয়েই যাচ্ছেন থালাপতি বিজয়। এতে একদিকে জননেতা হিসেবে যেমন তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙন তার সম্মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং পাইরেসির ফলে পেশাগত ক্ষেত্রেও বড় ধরনের আর্থিক ও সুনামগত ক্ষতি হয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এখন সবার মনে প্রশ্ন একটাই,অভিনয় ছেড়ে রাজনীতিতে যোগদানই কি কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজয়ের জন্য নাকি নিয়তির লিখন বলেই ছেড়ে দেয়া হবে সব?