ফারহান তানভীর :
একটা সময় ছিল যখন দিল্লির এক সাধারণ ছেলেটা স্বপ্ন দেখত-বড় পর্দায় রাজত্ব করার। আজ সেই ছেলেটাই বলিউডের “কিং খান”-শাহরুখ খান। তাঁর জন্ম ১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর, নয়াদিল্লিতে। বাবা মীর তাজ মোহাম্মদ খান ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, মা লতিফ ফাতিমা ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। শাহরুখ দিল্লির সেন্ট কলম্বাস স্কুলে পড়াশোনা করেছেন, পরে দিল্লি ইউনিভার্সিটির হান্সরাজ কলেজ থেকে অর্থনীতিতে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। কিন্তু তাঁর মন তো বইয়ের পাতায় নয়- ছিল থিয়েটারের আলোয়, মঞ্চের সংলাপে। সেখান থেকেই শুরু তার অভিনয়ের গল্প।

টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রথম পরিচিতি পান “ফৌজি” সিরিজে এক সৈনিকের ভূমিকায় অভিনয় করে। এরপর “সার্কাস”, “দিল দরিয়া”-এই সিরিজগুলো তাকে ঘরের ছেলে বানিয়ে তোলে। কিন্তু শাহরুখের চোখ ছিল সিনেমায়। ১৯৯২ সালে “দিওয়ানা” সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে তাঁর অভিষেক হয়। প্রথম ছবিতেই জিতে নেন ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট মেল ডেবিউ। এরপরের পথটা মোটেও সহজ ছিল না। অন্যরা যখন রোম্যান্টিক হিরোর চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরছিল, শাহরুখ তখন সাহস করে নিলেন খলনায়কের চরিত্র-“বাজিগর”, “ডর”, “অনজাম”-এ। ঠিক সেই ভয়ংকর চোখের দৃষ্টিতেই শুরু হয় কিং খানের উত্থান।
১৯৯৫ সালে “দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে” মুক্তির পর সব বদলে গেল। রাজ সিং চরিত্রে তিনি হয়ে উঠলেন এক প্রজন্মের প্রেমের প্রতীক। আজও ছবিটা চলে মুম্বাইয়ের মারাঠা মন্দির হলে-এ যেন ইতিহাস। একের পর এক ব্লকবাস্টার-“কাভি খুশি কাভি গাম”, “মাই নেম ইজ খান”, “কাল হো না হো”, ” দেবদাস”,”মোহাব্বাতে”,“চেন্নাই এক্সপ্রেস”, “পাঠান”, “জওয়ান”,”ডানকি”-সব সিনেমাই প্রমাণ করেছে-সময় যতই পাল্টাক, শাহরুখ খান এখনও বলিউডের চূড়ায়।তাঁর ফিল্মোগ্রাফিতে এখন অব্দি রয়েছে ৬৩ টির বেশি সিনেমা।যার মধ্যে ৪১ টি সিনেমাই ব্যবসা সফল।তাঁর লাস্ট তিনটি সিনেমার প্রত্যেকটিই আয় করেছে ৫০০ কোটির উপরে। তাই “জাওয়ান” আর “পাঠান” মুক্তির পর এটাই প্রমাণ হয়েছে যে এতো সময় পেরিয়েও শাহরুখ খানই এখনও বক্স অফিসের রাজা।বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে ধনী অভিনেতাও তিনি।তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

তবে কিং খানের জাদু শুধু পর্দাতেই সীমাবদ্ধ নয়।তাঁর ফ্যানডম যেন এক মহাসমুদ্র।তাঁর বাসভবন মান্নাতের সামনে হাজার মাইল দূর থেকে আসা মানুষদের দেখা যায়-কেউ বাংলাদেশ থেকে, কেউ মিশর থেকে, কেউ আবার ব্রাজিল থেকে। প্রতি বছর ২ নভেম্বর মান্নাতের সামন অংশ পরিণত হয় মেলার মাঠে। কেউ পোস্টার হাতে, কেউ চোখে অশ্রু নিয়ে, শুধু এক ঝলক দেখার আশায় দাঁড়িয়ে থাকে। শাহরুখ তখন ব্যালকনিতে এসে হাত নেড়ে হাসেন আর সেই এক হাসি যেন লক্ষ মানুষের ঈদের চাঁদ দেখা।বিশ্বজুড়ে তাঁর কোটি কোটি ভক্তদের কেউ ধর্মে ভিন্ন, কেউ ভাষায়, কিন্তু সবাই এক জায়গায় মিলে যায়-“আমরা শাহরুখ ভক্ত।” সংলাপ, ভঙ্গি, রোম্যান্স, এমনকি হাত ছড়ানো সেই বিখ্যাত পোজ-সবই আজ সাংস্কৃতিক প্রতীক। তিনি ভারতের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ, যিনি বলিউডকে বিশ্বের মানচিত্রে পৌঁছে দিয়েছেন।একই সঙ্গে অনলাইনে চলছে আরেক রাজত্ব-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ #HappyBirthdaySRK ট্রেন্ড করছে ১ নম্বরে।বলিউড, হলিউড, ঢালিউডের তারকা থেকে শুরু করে বিশ্বের বড় বড় খেলোয়াড় কিংবা রাজনীতিবিদ-সবাই শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তাঁকে।

অন্যদিকে শাহরুখও এতো ভালোবাসার প্রতিদান দিতে ভোলেননি।আজকের দিনেই নিজের ভক্তদের জন্য এনেছেন নতুন চমক।জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে শাহরুখ খানের পরবর্তী সিনেমা “King”-এর টাইটেল রিভিল ভিডিও-১ মিনিট ১১ সেকেন্ডের এক দুর্দান্ত টিজার, সঙ্গে পোস্টারও। সিনেমাটি পরিচালনা করছেন সিদ্ধার্থ আনন্দ, যিনি “পাঠান” আর “ওয়ার”-এর পরিচালক। ২০২৬ সালে মুক্তি পাবে সিনেমাটি। টাইটেলটি মুক্তির পর থেকেই শুরু হয়েছে চরম উন্মাদনা।সবাই আশা করছে আরেকটি এক হাজার কোটির গ্রোসার দিতে যাচ্ছেন শাহরুখ।

তবে এই খ্যাতি, সম্পদ আর সাফল্যের মাঝেও শাহরুখ খান রয়ে গেছেন মাটির মানুষ।তিনি একবার বলেছিলেন-“আমার সব সম্পত্তি, টাকা-পয়সা, গাড়ি—সব কেড়ে নিতে পারো। কিন্তু কেউ আমার ভক্তদের ভালোবাসা কেড়ে নিতে পারবে না।”তাঁর এই কথার মধ্যেই বোঝা যায় কেন শাহরুখ শুধু অভিনেতা নন-তিনি এক অনুভূতি, এক ভালোবাসার প্রতীক।
অভিনেতা হিসেবে তিনি যেমন সফল, উদ্যোক্তা হিসেবেও অনন্য। তাঁর Red Chillies Entertainment, VFX division, আর ক্রিকেটে Knight Riders ফ্রাঞ্চাইজি-সব জায়গায়ই তাঁর নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা আর দূরদর্শিতা স্পষ্ট। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য-তিনি লাখো মানুষকে বিশ্বাস করিয়েছেন, স্বপ্ন সত্যি হয়, যদি তাতে ভালোবাসা মেশানো থাকে।
রুপালি জগতের পক্ষ থেকে আমরা জানাই-“শুভ জন্মদিন কিং খান, আপনি সময়েরও ওপারে এক অনুপ্রেরণার নাম।”