ফারহান তানভীর:
কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও আসলে চলে যান না। সময় তাঁদের বয়স বাড়াতে পারে না, নতুন কোনো অধ্যায়ও যোগ করতে পারে না। তাঁরা আটকে থাকেন ঠিক সেই বয়সটাতেই, যে বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। সালমান শাহ তেমনই একজন। আজ ৬ সেপ্টেম্বর, তাঁর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলো। তিন দশক আগে মাত্র ২৫ বছর বয়সে থেমে গিয়েছিল তাঁর জীবন, অথচ আশ্চর্য ব্যাপার হলো-বাংলাদেশের মানুষের কাছে সালমান শাহ এখনো যেন সেই তরুণ নায়কই। সেই চুল, সেই হাসি, সেই চোখে দুষ্টুমি মেশানো অভিব্যক্তি, সেই অনায়াস পোশাক আর পর্দায় হাজির হওয়ার নিজস্ব ভঙ্গি। নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাঁকে জীবিত অবস্থায় দেখেনি, কিন্তু তাঁর নামটা তারা চেনে। তাঁর সিনেমা দেখে, গান শুনে, ছবি দেখে এখনও মুগ্ধ হয়।

সিলেটে ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, অর্থাৎ সালমান শাহ, জীবনে খুব বেশি সময় পাননি। চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে। মৌসুমীর বিপরীতে সেই অভিষেকই যেন রাতারাতি বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের চেহারা। এরপর একের পর এক সিনেমায় তিনি নিজের জায়গাটা আরও শক্ত করেছেন। ‘সুজন সখী’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘আনন্দ অশ্রু’সহ মাত্র কয়েক বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। সংখ্যাটা আজকের হিসেবে খুব বড় মনে নাও হতে পারে, কিন্তু ওই সময়ের দর্শকপ্রিয়তার হিসাব করলে বোঝা যায়, কী দ্রুত তিনি মানুষের ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।
সালমান শাহর জনপ্রিয়তার গল্পটা শুধু তাঁর সিনেমার ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প নয়। তিনি সময়টাকেও বদলে দিয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশকের তরুণেরা তাঁকে শুধু সিনেমার পর্দায় দেখত না, নিজেদের মধ্যেও তাঁকে খুঁজে নিত। তাঁর পোশাক অনুকরণ করা হতো, চুলের স্টাইল নকল করা হতো, তাঁর মতো করে ছবি তোলার চেষ্টা চলত। নায়ক হওয়ার পাশাপাশি তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি প্রজন্মের ফ্যাশন ও রুচির অংশ। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সম্ভবত এই স্বাভাবিক ব্যাপারটাই-তাঁকে খুব দূরের কোনো নায়ক মনে হতো না।এই জায়গাটাই সালমান শাহকে নিয়ে আজও এত ‘যদি’ তৈরি করে।

তিনি যদি ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা না যেতেন, আজ তাঁর বয়স হতো ৫৫ বছর। বয়সের এই হিসাবটা করলেই বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়। কারণ আমরা তাঁর ৩০ বছর বয়সটা দেখিনি, ৪০ বছর বয়সটা দেখিনি, দেখিনি ৫০ পেরোনো একজন সালমান শাহকে। আমরা জানি না সময় তাঁর অভিনয়কে কোথায় নিয়ে যেত। জানি না তিনি আগের মতোই নায়ক হয়ে থাকতেন, নাকি চরিত্রাভিনয়ের দিকে ঝুঁকতেন। প্রযোজনায় আসতেন কি না, পরিচালনা করতেন কি না, নতুনদের নিয়ে কাজ করতেন কি না-কিছুই জানা নেই।তবে তাঁর ক্যারিয়ারের গতি আর সৃজনশীলতার প্রতি আগ্রহ দেখলে এটুকু কল্পনা করা অস্বাভাবিক নয় যে, তিনি হয়তো শুধু নায়ক হয়ে থেমে থাকতেন না। সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলানোর সুযোগ পেলে সালমান শাহ হয়তো নব্বইয়ের দশকের রোমান্টিক নায়ক থেকে পরিণত অভিনেতায় পরিণত হতেন। আর সেই বিবর্তনটাই হয়তো তাঁকে আরও বড় করে তুলত।
এই জায়গায় ভারতীয় সিনেমার বলিউড বাদশাহ খ্যাত শাহরুখ খানের কথা মনে পড়ে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যে শাহরুখ খান রোমান্টিক নায়ক হিসেবে দর্শকের হৃদয় জয় করেছিলেন, তিনিই পরবর্তী তিন দশকে নিজেকে বারবার বদলেছেন। প্রেমের নায়ক থেকে হয়েছেন অ্যাকশন তারকা, চরিত্রাভিনেতা, প্রযোজক এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ভারতীয় সিনেমার অন্যতম মুখ। আজও তিনি জাওয়ান,পাঠান,ডানকি কিংবা কিং এর মতো সিনেমা করছেন। তাঁর বয়স বেড়েছে, চরিত্র বদলেছে, সিনেমার ধরন বদলেছে; কিন্তু তারকা হিসেবে তাঁর উপস্থিতি হারিয়ে যায়নি।মজার ব্যাপার হলো, সেই সময় বাংলাদেশেও একই রকম উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন সালমান শাহ। শাহরুখ খান তখন ভারতে জনপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় উঠছেন আর বাংলাদেশে সালমান শাহ ছিলেন তরুণ দর্শকের স্বপ্নের নায়ক। দুজনের সাক্ষাতের একটি পুরোনো ছবিও বহু বছর ধরে ভক্তদের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সালমান শাহর সঙ্গে শাহরুখ খানের পরিচয় ও সাক্ষাতের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

তবু কল্পনাটা করা যায়। সালমান শাহ যদি আরও তিন দশক কাজ করতেন, বাংলাদেশের সিনেমায় তাঁর অবস্থান হয়তো আজ অন্য উচ্চতায় থাকত। শাহরুখ খানের মতো তাঁরও হয়তো নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থাকত, নতুন পরিচালক ও অভিনেতাদের সুযোগ দিতেন। হয়তো দেশের সিনেমাকে আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। হয়তো বয়সের সঙ্গে নিজের অভিনয়ের ধরন পাল্টাতেন। অথবা হয়তো এসবের কিছুই করতেন না। একজন শিল্পীর ভবিষ্যৎ কখনো আগে থেকে লেখা থাকে না।
তবে একটা বিষয় বেশ নিশ্চিতভাবেই বলা যায়-সালমান শাহ বেঁচে থাকলে ঢালিউডের তারকা-মানচিত্রটা আজকের মতো হতো না।কারণ তাঁর অনুপস্থিতির পর যে জায়গাটা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল, সেটি একসময় দখল করেন শাকিব খান। শাকিবের সাফল্যকে সালমান শাহর মৃত্যুর সরাসরি ফল বলা অন্যায় হবে। শাকিব নিজের দীর্ঘ পরিশ্রম, অসংখ্য সিনেমা এবং বদলে যাওয়া চলচ্চিত্র বাজারের মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। কিন্তু সালমান শাহ যদি সেই সময় থেকে আরও দুই-তিন দশক সক্রিয় থাকতেন, তাহলে শাকিবের উত্থানের পথটা নিঃসন্দেহে আরও কঠিন ও প্রতিযোগিতাময় হতে পারত।বরং বাংলাদেশের সিনেমা হয়তো একসঙ্গে দুই প্রজন্মের দুই বড় তারকাকে দেখতে পেত। একজন নব্বইয়ের দশকের স্বপ্নের নায়ক, অন্যজন পরবর্তী প্রজন্মের সুপারস্টার। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকত, হয়তো একই সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগও তৈরি হতো। সালমান শাহর মতো একজন প্রতিষ্ঠিত তারকার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা শাকিবের ক্যারিয়ারকেও অন্যভাবে প্রভাবিত করতে পারত। শাকিব খান নিজেও বিভিন্ন সময়ে সালমান শাহকে তাঁর অনুপ্রেরণা হিসেবে স্মরণ করেছেন। ফলে এখানে দুই তারকার গল্পটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে উত্তরাধিকার আর প্রভাবের গল্প হিসেবেও দেখা যায়।

কিন্তু বাস্তবতা বরাবরই কল্পনার চেয়ে নির্মম।সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য অবশ্য ৩০ বছর পরও পুরোপুরি কাটেনি। ১৯৯৬ সালে তাঁর বাবা অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও পিবিআইয়ের তদন্তে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও পরিবার সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে আদালত ঘটনাটি হত্যা হিসেবে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেন। এরপর তাঁর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়। মামলাটি এখনো তদন্তাধীন; সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।আইনের খাতায় তাই সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য এখনো একটি অসমাপ্ত অধ্যায়। আর দর্শকের মনে অসমাপ্ত অধ্যায়টি আরও বড়-সেটি তাঁর জীবন নিয়ে।
আজ তাঁর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও ছড়িয়ে পড়বে তাঁর ছবি। টেলিভিশনে হয়তো চলবে তাঁর সিনেমা। ইউটিউবে কেউ শুনবে তাঁর সিনেমার গান। কোনো তরুণ হয়তো প্রথমবার ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দেখবে এবং অবাক হয়ে ভাববে-এই মানুষটি সত্যিই ত্রিশ বছর আগে মারা গেছেন?আর এটাই হয়তো সালমান শাহর সবচেয়ে বড় অর্জন। তিনি সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যাননি।শাহরুখ খান তাঁর ৩০ বছরের ক্যারিয়ার দিয়ে দেখিয়েছেন, একজন তারকা সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলে যেতে পারেন। সালমান শাহ সেই সুযোগটি পাননি। তাই তাঁর গল্পে আমরা তাঁর অর্জনের চেয়ে সম্ভাবনাগুলোই বেশি দেখতে পাই। হয়তো তিনি আরও বড় তারকা হতেন। হয়তো বাংলাদেশের সিনেমার জন্য আরও অনেক কিছু করতেন। হয়তো শাকিব খানের সঙ্গে একসময় একই আকাশের দুই বড় নক্ষত্র হয়ে থাকতেন। হয়তো কোনো একদিন ৫০ পেরিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে পুরোনো দিনের গল্প করতেন।কিন্তু সেই ‘হয়তো’গুলোর কোনো উত্তর আর পাওয়া যাবে না।

সালমান শাহ চলে যাওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৫। বাংলাদেশের সিনেমার জন্য সেটি ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি, আর তাঁর নিজের জীবনের জন্য ছিল আরও বড় এক অসমাপ্তি। তিনি আমাদের দেখিয়ে যাওয়ার মতো দীর্ঘ ক্যারিয়ার রেখে যেতে পারেননি; রেখে গেছেন এমন এক ছাপ, যেটা মুছে দেওয়ার জন্য তিন দশকও যথেষ্ট হয়নি।তাই সালমান শাহকে মনে করার দিনে শুধু তাঁর মৃত্যুর কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে সেই তরুণটাকে, যে খুব অল্প সময়েই মানুষের এত আপন হয়ে উঠেছিল। মনে পড়ে তাঁর হাসি, তাঁর অভিনয়, তাঁর গান, তাঁর পোশাক, তাঁর চোখের সেই চেনা দৃষ্টি।আর অজান্তেই মনে হয়-মানুষটা যদি আর একটু সময় পেতেন!হয়তো আজ তাঁর গল্পটা অন্যরকম হতো।কিন্তু ইতিহাস তাঁকে যতটুকু সময় দিয়েছে, সেই সময়টুকুতেই তিনি এমন একজন হয়ে গেছেন, যাঁকে ৩০ বছর পরও বাংলাদেশের মানুষ ভুলতে পারেনি।