প্রেম ও বন্ধুত্ব নিয়ে যে দুইটি স্মৃতির কথা জানিয়েছিলেন- হুমায়ুন ফরীদি!

ফারহান তানভীর:

বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি।তিনি শুধু অভিনয়ের জন্যই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেননি, বরং তাঁর ব্যক্তিত্ব, কথাবার্তা এবং জীবনের প্রতি গভীর দৃষ্টিভঙ্গিও তাঁকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। পর্দায় তিনি কখনো ভয়ংকর খলনায়ক, কখনো রহস্যময় মানুষ, কখনো বা সমাজের নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ক্যামেরার বাইরের হুমায়ুন ফরিদী ছিলেন অসম্ভব রকম আবেগী একজন মানুষ। তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এই সংবেদনশীল মানুষটিকে বারবার আবিষ্কার করেছে দর্শক। এমনই এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল-জীবনের দুটি স্মৃতির কথা শেয়ার করতে।

হুমায়ুন ফরীদির ভাগ করা প্রথম স্মৃতিটি ছিল তাঁর স্কুলজীবনের। তখন তিনি ক্লাস সেভেনে পড়েন। কৈশোরের সেই সময়ে পৃথিবীকে মানুষ অন্যরকম চোখে দেখতে শুরু করে। অনুভূতিগুলো হয় নতুন, অদ্ভুত এবং অনেক বেশি গভীর। হুমায়ুন ফরিদীর ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছিল। তিনি পড়তেন একটি বয়েজ স্কুলে আর সেই স্কুলের পাশেই ছিল একটি গার্লস স্কুল। সেখানকার এক শিক্ষিকাকে তিনি মনে মনে ভীষণ পছন্দ করে ফেলেন। ধীরে ধীরে সেই ভালো লাগা রূপ নেয় গভীর প্রেমে। তবে সেটি ছিল না কোনো কিশোরসুলভ ক্ষণিকের মোহ-ফরিদীর ভাষায়, সেটি ছিল “একটি গভীর রোমান্টিক সম্পর্ক”, যদিও সেই সম্পর্ক কখনো বাস্তবে পূর্ণতা পায়নি।আশ্চর্যজনক ভাবে সেই শিক্ষিকার বাসাও ছিল তাদের বাসার পাশেই। ফলে প্রতিদিন তাঁকে দেখা, তাঁর উপস্থিতি অনুভব করা, হয়তো দূর থেকে তাকিয়ে থাকা-এসবই কিশোর ফরিদীর জীবনে এক অন্যরকম আবেগ তৈরি করেছিল। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে,সেই মহিলা ছিলেন এক সন্তানের মা। কিন্তু ফরীদির সেই বয়সে তো আবেগ ছাড়া কিছুই কাজ করেনা। তাই ওসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে তিনি মনে মনে ভালোবেসে গেছেন।

হুমায়ুন ফরীদির প্রথম স্মৃতিটা একটু হাস্যকর হলেও দ্বিতীয় স্মৃতিটি ছিল চোখে পানি এনে দেয়ার মতো। তার সেই স্মৃতিতে প্রেমের কোমলতা ছিল না,ছিল শোকের গভীর অন্ধকার। তিনি ফিরে যান তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। সেই সময় তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আবুল ফজল। একজন প্রতিভাবান তরুণ, যিনি কবিতা লিখতেন, গল্প লিখতেন এবং স্বপ্ন দেখতেন সাহিত্য নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুত্ব সাধারণ বন্ধুত্বের চেয়ে অনেক বেশি গভীর হয়। সেখানে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা থাকে, সংগ্রাম থাকে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকে। হুমায়ুন ফরিদী এবং আবুল ফজলের সম্পর্কও ছিল তেমনই।একবার গ্রীষ্মের ছুটিতে সবাই যখন বাড়ি চলে যায়, ফরিদীও বাড়ি ফেরেন। কিন্তু ঠিক পরদিনই তাঁর কাছে ফোন আসে আরেক বন্ধু, অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ -এর কাছ থেকে। তিনি জানতে পারেন, তাঁর বন্ধু আবুল ফজল আত্মহত্যা করেছেন।খবরটি শুনে তিনি মুহুর্তেই ভেঙে পড়েছিলেন। ফরিদী বলেছিলেন, ছুটির পর থেকে ফজলের তাঁর সঙ্গেই থাকার কথা ছিল। এমনকি নিজের কিছু বইও ফরিদীর রুমে এনে রেখেছিলেন তিনি। হয়তো তারা পরিকল্পনা করেছিলেন একসঙ্গে থাকার, লেখালেখি করার, দীর্ঘ আড্ডা দেওয়ার। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তব হয়নি। একটি রুমে দুই বন্ধুর একসঙ্গে থাকা আর হয়ে ওঠেনি কোনোদিন। ফজল তাকে বলেছিলেন,বন্ধু তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। কিন্তু সেই কথাগুলো আর শোনা হয়ে ওঠেনি ফরীদির।

আজ হুমায়ুন ফরীদি বেঁচে নেই। কিন্তু তিনি জীবিত আছেন তার ভক্তদের মাঝে। জীবিত আছেন তার কাজের মধ্য দিয়ে,জীবিত আছেন তার অসাধারণ ব্যক্তিত্বের মধ্য দিয়ে।