ফারহান তানভীর:
একসময় তাঁরা ছিলেন প্রেমের জুটি। পর্দায় যেমন জনপ্রিয় ছিলেন, পর্দার বাইরেও তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে ছিল তুমুল কৌতূহল। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের ইতি ঘটেছে, দুজনই নিজেদের জীবনে এগিয়ে গেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর যখন আবার একসঙ্গে বড় পর্দায় ফিরলেন দেব ও শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, তখন পুরোনো সেই পুরোনো সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় চলে এসেছে। আর তাতেই কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছেন দেব।

দেবের দাবি, ‘দেশু ৭’-এর প্রচারে সিনেমা নিয়ে যতটা কথা হওয়ার কথা, তার চেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তাঁদের পুরোনো সম্পর্ক, বিচ্ছেদ নিয়ে। ফলে শুভশ্রীর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেও এখন তাঁকে ভাবতে হয়।সম্প্রতি কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে দেব বলেন, একসময় শুভশ্রীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল, কিন্তু এখন তাঁরা বন্ধু। স্বাভাবিকভাবেই বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে দেখা হলে তাঁকে জড়িয়ে ধরা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই স্বাভাবিক মুহূর্তও অন্যভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।
দেবের ভাষায়, শুভশ্রীকে প্রকাশ্যে আলিঙ্গন করলেও সেটি নিয়ে রিল তৈরি হচ্ছে। ফলে তাঁরা চাইলেও আর স্বাভাবিক থাকতে পারছেন না। এমনকি ‘দেশু ৭’-এর প্রচারে দুজনকে খুব বেশি একসঙ্গে দেখা না যাওয়ার পেছনেও এই কারণটিই রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। কারণ একসঙ্গে প্রচারে বের হলেই সিনেমার গল্প, অভিনয় কিংবা নির্মাণের বদলে প্রশ্ন চলে যাচ্ছে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকে।বিষয়টি নিঃসন্দেহে ‘দেশু ৭’-এর প্রচারের জন্যও কিছুটা অস্বস্তিকর। কারণ ছবিটিকে ঘিরে কৌতূহলের জায়গা শুধু দেব-শুভশ্রীর পুরোনো প্রেম নয়। প্রায় এক দশক পর তাঁদের আবার জুটি হিসেবে বড় পর্দায় ফেরাটাই এই ছবির অন্যতম বড় আকর্ষণ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়-‘দেশু ৭’ তাঁর পরিচালনায় প্রথম সিনেমা। অর্থাৎ অভিনয়ের পাশাপাশি এবার পরিচালক হিসেবেও দর্শকের সামনে হাজির হচ্ছেন তিনি। ছবিটিকে ঘিরে তাই তাঁর নিজের কাছেও প্রত্যাশা অনেক বেশি।
দেব-শুভশ্রীর এই প্রত্যাবর্তন যে নিছক পুরোনো জুটিকে ফিরিয়ে আনা নয়, তার ইঙ্গিত মিলেছে ছবির টিজারেই। ৩১ আগস্ট প্রকাশিত টিজারে দেবকে দেখা গেছে একেবারে অ্যাকশন অবতারে। বন্দুক হাতে তাঁর উপস্থিতি, আগুনের আবহ এবং রহস্যময় পরিস্থিতির পাশাপাশি শুভশ্রীর সঙ্গে তাঁর রসায়নও চোখে পড়েছে। টিজারের শুরুতেই শুভশ্রীর কণ্ঠে শোনা যায়-‘তুমি কে? আমি যে দেবকে চিনতাম তুমি তো সে নও।’ এরপর গল্প যে শুধু প্রেমের মধ্যে আটকে নেই, সেটিও স্পষ্ট হয়ে যায়। অ্যাকশন, আবেগ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং রহস্য-সব মিলিয়ে ‘দেশু ৭’কে একটি বড় পরিসরের বাণিজ্যিক ছবি হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।

ছবির গল্প সম্পর্কেও নির্মাতারা এখনো পুরোটা প্রকাশ করেননি। তবে টিজার থেকে যতটা বোঝা গেছে, অতীতে ভালোবাসার সম্পর্কে থাকা দুই মানুষ পরিস্থিতির কারণে আবার একে অপরের জীবনে ফিরে আসে। কিন্তু সেই ফিরে আসা মোটেই সহজ নয়। পুরোনো সম্পর্কের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রহস্য ও বিপদ। ফলে দেব-শুভশ্রীর রসায়ন ছবির আবেগের জায়গা তৈরি করলেও তার সঙ্গে সমান গুরুত্ব পেয়েছে অ্যাকশন ও নাটকীয়তা। টিজারে দেবের চরিত্রকে যে ধরনের সহিংস ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে দেখা গেছে, তাতে বোঝা যায় এটি নিছক প্রেমের ছবি হতে যাচ্ছে না।
ছবিটির আরেকটি বড় চমক অনির্বাণ ভট্টাচার্য। টিজারেও তাঁর উপস্থিতি গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দেব ও শুভশ্রীর সম্পর্কের সমীকরণের বাইরে অনির্বাণের চরিত্রও যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি তাঁর রহস্যময় উপস্থিতি থেকেই বোঝা যায়। এর সঙ্গে অভিনয় করছেন রজতাভ দত্ত, অপরাজিতা আঢ্যসহ আরও অনেকে। ফলে তারকাবহুল এই ছবিতে শুধু পুরোনো জুটির নস্টালজিয়াই নয়, শক্তিশালী পার্শ্বচরিত্র ও অভিনয়ের জায়গাটিও গুরুত্ব পেয়েছে।

`দেশু ৭’-এর আরেকটি আলোচিত দিক এর শুটিং। বিশেষ করে লাদাখের মনোরম ও দুর্গম লোকেশনে ছবিটির শুটিং হয়েছে। ছবির প্রথম গান ‘তোর শুধু তোর’-এর দৃশ্যেও লাদাখের সৌন্দর্যকে ব্যবহার করা হয়েছে। দেব ও শুভশ্রীর রোম্যান্টিক মুহূর্তের সঙ্গে পাহাড়ি প্রাকৃতিক দৃশ্য মিলিয়ে গানটি প্রকাশের পর তাঁদের পুরোনো রসায়ন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। একই সঙ্গে ছবির ভিজ্যুয়াল পরিসর নিয়েও দর্শকের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
অবশ্য এই ছবির প্রচারের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি ছিল দেব-শুভশ্রীর একসঙ্গে ফেসবুক লাইভে আসা। টিজার প্রকাশের দিন তাঁরা শুধু সিনেমা নিয়েই কথা বলেননি, তাঁদের অতীত নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করেছেন। এমনকি দেবের সরাসরিই বলেছিলেন, অতীতে যদি তাঁদের মধ্যে আরও পরিণত মানসিকতা ও বোঝাপড়া থাকত, তাহলে হয়তো সম্পর্কের পরিণতি অন্য রকম হতে পারত। তবে সেই কথাকে তিনি অতীতের দিকে ফিরে তাকানোর প্রসঙ্গ হিসেবেই রেখেছেন। বর্তমান সময়ে দুজনের সম্পর্ক যে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং পেশাগতভাবে তাঁরা স্বচ্ছন্দ-‘দেশু ৭’-এর প্রচারেও সেটি স্পষ্ট হয়েছে।
দুজনের পুনর্মিলনের পেছনে তাঁদের বর্তমান জীবনও আলোচনায় এসেছে। দেব ও শুভশ্রী দুজনই বহু বছর আগের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে নিজেদের আলাদা জীবন গড়ে নিয়েছেন। শুভশ্রী এখন পরিচালক-রাজনীতিক রাজ চক্রবর্তীর সঙ্গে সংসার করছেন আর দেবের জীবনে রয়েছেন অভিনেত্রী রুক্মিণী মৈত্র। এই পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যেই পুরোনো দুই সহকর্মীর আবার একসঙ্গে কাজ করা সম্ভব হয়েছে। দেব নিজেও জানিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে তাঁদের মধ্যে পরিণত মানসিকতা এসেছে এবং অতীতকে পেছনে রেখে এখন তাঁরা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছেন।কিন্তু দর্শকের কৌতূহলই যেন এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেবের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা যখন স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন, তখন সেটিও খবর হয়ে যায়; একে অপরকে আলিঙ্গন করলেও সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ব্যাখ্যা পায়। ফলে একটি সিনেমার প্রচারে দুই অভিনেতার স্বাভাবিক বন্ধুত্বও আলাদা অর্থে উপস্থাপিত হচ্ছে। আর সেই কারণেই তাঁরা একসঙ্গে প্রচারে বের হওয়ার ক্ষেত্রেও কিছুটা সতর্ক হচ্ছেন। দেবের আক্ষেপটা সেখানেই-একটি ছবি বানাতে যে সময়, পরিশ্রম ও পরিকল্পনা লাগে, সেটি নিয়ে আলোচনা হওয়ার বদলে বারবার তাঁদের পুরোনো সম্পর্ক সামনে চলে আসছে।এদিকে দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ‘দেশু ৭’ নিয়ে প্রত্যাশাও কম নয়।
দেব-শুভশ্রীর দীর্ঘ বিরতির পর প্রত্যাবর্তন, দেবের প্রথম পরিচালনা, অনির্বাণ ভট্টাচার্যের উপস্থিতি, লাদাখের লোকেশন, অ্যাকশন-রোম্যান্সের মিশেল এবং টিজারে পাওয়া রহস্য-সব মিলিয়ে ছবিটি ইতিমধ্যেই আলোচনায়। তাই দেবের চাওয়া মূলত একটাই-দর্শক যেন তাঁদের অতীতের সম্পর্কের গল্পের বাইরে এসে এবার সিনেমাটিক জুটিটাকেও বিচার করেন। কারণ তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অধ্যায় বহু আগেই বদলে গেছে; এখন সামনে যে গল্পটি, সেটি ‘দেশু ৭’-এর। আর শেষ পর্যন্ত সেই গল্প কতটা দর্শককে টানতে পারে, তার উত্তর মিলবে বড় পর্দাতেই।