ফারহান তানভীর :
বলিউডে পুরোনো জনপ্রিয় গান নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনার প্রবণতা নতুন নয়। তবে সব রিমেক যে দর্শকের ভালোবাসা পায়, আবার বিষয়টা এমনও নয়। বরং অনেক সময় এই রিমেক সংস্কৃতিই তৈরি করে তর্ক, বিতর্ক আর ক্ষোভ। এবার সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে বরুণ ধাওয়ানের নতুন সিনেমা “হে জাওয়ানি তো ইস্ক হোনা হে” এর গান ‘চুনারি চুনারি-লেটস গো’। ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বিবি নাম্বার ওয়ান’ সিনেমার কালজয়ী ‘চুনারি চুনারি’ গানকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এই গানে। কিন্তু গানটি প্রকাশের পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। আর সেই প্রতিক্রিয়ায় যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিলেন মূল গানের কণ্ঠশিল্পী অভিজিৎ ভট্টাচার্য।

বরাবরই স্পষ্টভাষী হিসেবে পরিচিত অভিজিৎ এবারও নিজের অবস্থান গোপন করেননি। নতুন সংস্করণ নিয়ে ক্ষোভ ঝেড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “অনুমতি আছে বলে বাবা-ছেলে মিলে যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছে। শেষ অব্দি আমার ‘চুনারি চুনারি’ গানটিকেও ছাড়ল না। লজ্জা থাকা দরকার বাপ-ছেলের। কপাল ভালো ডেভিড অবসর নিয়েছে, তা না হলে তার সেকেন্ড হ্যান্ড নায়ক ছেলেকে দিয়ে আরও কত কী করে দেখাতেন।” তার এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় নতুন আলোচনা।অভিজিতের বক্তব্যে যে ‘বাবা-ছেলে’ প্রসঙ্গ এসেছে, তা স্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত করে পরিচালক ডেভিড ধাওয়ান ও তার ছেলে বরুণ ধাওয়ানের দিকে।
দীর্ঘ সময় ধরে বলিউডে ডেভিড ধাওয়ানের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একের পর এক বাণিজ্যিক হিট সিনেমা। সেই উত্তরাধিকার নিয়েই অভিনয়ে আসেন বরুণ ধাওয়ান। কিন্তু বলিউডে স্বজনপ্রীতি বা নেপোটিজমের বিতর্ক বহুদিনের। অভিজিতের মন্তব্য সেই পুরোনো বিতর্ককেই যেন আবার নতুন জীবন দিয়েছে।মূল ‘চুনারি চুনারি’ গানটি শুধু একটি সিনেমার গান ছিল না, বরং ছিল একটি সময়ের আবেগ। সালমান খান ও সুস্মিতা সেনের উপস্থিতি, অনু মালিকের সুর এবং অভিজিৎ ভট্টাচার্যের কণ্ঠ-সব মিলিয়ে গানটি হয়ে উঠেছিল নব্বই দশকের অন্যতম জনপ্রিয় ডান্স ট্র্যাক। সেই গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু দর্শকের স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও আবেগ। আর সেই গানই যখন নতুনভাবে ফিরে এসেছে, তখন তুলনা হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী।

নতুন ‘চুনারি চুনারি-লেটস গো’ গানে বরুণ ধাওয়ানের সঙ্গে দেখা গেছে মৃণাল ঠাকুর ও পূজা হেগড়েকে। নতুন বিট, আধুনিক অ্যারেঞ্জমেন্ট এবং পার্টি মুডে গানটিকে উপস্থাপন করা হয়েছে। নির্মাতাদের উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো জনপ্রিয়তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু দর্শকের একটি বড় অংশ মনে করছে, এই নতুন সংস্করণে মূল গানের আত্মাটাই হারিয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে লিখেছেন, কিছু গানকে স্মৃতি হিসেবেই রেখে দেওয়া ভালো। আবার কেউ কেউ সরাসরি বলেছেন, ‘অরিজিনাল ইজ আনটাচেবল’।
তবে এতো বিতর্কের মাঝেও বরুণ ধাওয়ানের পক্ষে কথা বলেছেন মূল গানের সুরকার অনু মালিক। তার মতে, সালমান খান ছিলেন মূল গানের প্রাণ, সেটা অস্বীকারের উপায় নেই। তবে বরুণও নিজের মতো করে পারফর্ম করার চেষ্টা করেছে। অর্থাৎ সুরকারের অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। কিন্তু অভিজিৎ সেখানে একেবারেই আপসহীন।আসলে প্রশ্নটা কেবল একটি গান রিমেক হওয়া নিয়ে নয়। প্রশ্নটা স্মৃতি আর বাণিজ্যের সংঘাত নিয়ে। বলিউডে পুরোনো হিট গান ফিরিয়ে আনা এখন একপ্রকার পরীক্ষিত ব্যবসায়িক ফর্মুলা। কারণ নতুন গান জনপ্রিয় করাতে সময় লাগে, কিন্তু পুরোনো হিট গানের নামই আগাম প্রচারণা তৈরি করে দেয়। নির্মাতারা জানেন, বিতর্ক হলেও আলোচনা হবে, আর আলোচনাই শেষ পর্যন্ত দর্শক টেনে আনে। কিন্তু সেই বাণিজ্যিক কৌশল যখন কোনো শিল্পীর আবেগ বা পরিচয়ের জায়গায় আঘাত করে, তখন এমন ক্ষোভ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

অভিজিৎ ভট্টাচার্যের মন্তব্য হয়তো অনেকের কাছে অতিরিক্ত কড়া মনে হতে পারে। আবার অনেকে বলবেন, তিনি যা বলেছেন, সেটা শুধু নিজের গানের প্রতি ভালোবাসা থেকেই বলেছেন। কারণ একজন শিল্পীর কাছে তার গান শুধুই একটি ট্র্যাক নয়, সেটি তার কণ্ঠ, পরিচয় এবং সময়ের সাক্ষ্য। তাই ‘চুনারি চুনারি-লেটস গো’ গানটি একটি প্রশ্নই জাগায়-সব জনপ্রিয় গান কি সত্যিই নতুন করে বানানো প্রয়োজন, নাকি কিছু গানকে সময়ের স্মৃতিতেই অমলিন থাকতে দেওয়া ভালো?