রজনীকান্তের সিনেমার অনুকরণে যে সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন মান্না…

ফারহান তানভীর :

১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া সুপারস্টার রজনীকান্ত অভিনীত `Baashha’ ভারতীয় বাণিজ্যিক সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী চলচ্চিত্র হিসেবেও বিবেচিত হয়ে আসছে। আজকের দিনে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় যে ‘ম্যাস হিরো’ তকমাটি এতো জনপ্রিয়, তার পেছনে এই সিনেমার অবদান অনেক বড়। মজার বিষয় হলো, এই একটি সিনেমার গল্প পরবর্তীতে দুই বাংলার দুই জনপ্রিয় তারকার হাত ধরে নতুন রূপে দর্শকদের সামনে এসেছিল। বাংলাদেশে নায়ক মান্না অভিনয় করেছেন `সুলতান’ সিনেমায়, আর পশ্চিমবঙ্গে মিঠুন চক্রবর্তী অভিনয় করেছিলেন `গুরু’ সিনেমায়। তিনটি সিনেমার ভাষা, পরিবেশ ও কিছু চরিত্র আলাদা হলেও মূল গল্পের ভিত্তি ছিল প্রায় একই।

সুপারস্টার রজনীকান্ত

১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি মুক্তি পায় Baashha। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন সুরেশ কৃষ্ণা। সেই সিনেমায় সুপারস্টার রজনীকান্তের বিপরীতে অভিনয় করেন নাগমা এবং প্রধান খলনায়কের চরিত্রে ছিলেন রঘুবরণ। সিনেমাটির গল্পে দেখা যায়, মানিকম নামে একজন সাধারণ অটোচালক খুব শান্ত ও সাধারণ জীবনযাপন করেন। পরিবার ও আশপাশের মানুষের কাছে তিনি একজন নিরীহ মানুষ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু ধীরে ধীরে দর্শক জানতে পারে, এই সাধারণ মানুষটিই একসময় মুম্বাইয়ের প্রভাবশালী ডন ‘মানিক বাদশাহ’ ছিলেন। নিজের পরিবারের নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবনের জন্য তিনি সেই পরিচয় গোপন করে রেখেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে একসময় তাকে আবার নিজের পুরোনো রূপে ফিরতে হয়। সিনেমাটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এই পরিচয় উন্মোচনের অংশ, যা মুক্তির পর দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।বক্স অফিসেও রজনীকান্তের Baashha অসাধারণ সাফল্য পেয়েছিল। সে সময় প্রায় ১৫ মাস প্রেক্ষাগৃহে চলেছিল Baashha। তামিল সিনেমার ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় ব্লকবাস্টার হিসেবে বিবেচিত। অনেক চলচ্চিত্র বিশ্লেষক মনে করেন, রজনীকান্তকে সাধারণ সুপারস্টার থেকে কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পেছনে এই সিনেমার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আজও সিনেমাটির সংলাপ, চরিত্র এবং দৃশ্যগুলো দর্শকদের কাছে সমান জনপ্রিয়।

নায়ক মান্না

Baashha’র বিপুল জনপ্রিয়তার পর একই ধরনের গল্প নিয়ে ২০০১ সালে বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছিল `সুলতান।’ সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন দেশের জনপ্রিয় নায়ক মান্না। তার বিপরীতে ছিলেন নায়িকা পূর্ণিমা। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন এফ আই মানিক। সুলতান-এর গল্পেও দেখা যায়, একজন সাধারণ মানুষের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর অতীত। সমাজ ও পরিবারের স্বার্থে তিনি নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে রাখেন। কিন্তু একসময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন তাকে আবার নিজের শক্তিশালী রূপে ফিরে আসতে হয়। এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের বড় একটি অংশ সুলতান-কে Baashha-এর বাংলাদেশি সংস্করণ বা অনুপ্রাণিত নির্মাণ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে নব্বই ও দুই হাজার দশকের শুরুর দিকের বক্স অফিস তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে Sultan কত টাকা আয় করেছিল বা কতদিন প্রেক্ষাগৃহে চলেছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়নি। তারপরও মান্নার জনপ্রিয়তা এবং দর্শক প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় সিনেমাটি তার সময়ের উল্লেখযোগ্য ব্যবসাসফল ছবিগুলোর একটি বলে ধরা হয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও মফস্বলের দর্শকদের মধ্যে ছবিটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

নায়ক মিঠুন চক্রবর্তী

এরপর ২০০৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি পেয়েছিল গুরু। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন স্বপন সাহা এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন মিঠুন চক্রবর্তী। তার সঙ্গে ছিলেন রচনা ব্যানার্জি, তাপস পাল, জিষু সেনগুপ্তসহ আরও অনেকে। গুরু সিনেমার গল্পেও দেখা যায়, বাইরে থেকে একজন সাধারণ অটোচালক আসলে অতীতে ছিলেন ভয়ংকর ও প্রভাবশালী গ্যাংস্টার। পরিবারের জন্য নিজের অতীতকে আড়াল করে রাখা সেই মানুষটিকে আবার পুরোনো পরিচয়ে ফিরতে হয় যখন তার আপনজনদের ওপর বিপদ নেমে আসে। গল্পের এই কাঠামো Baashha-এর সঙ্গে এতটাই মিল ছিল যে বহু চলচ্চিত্রভিত্তিক সূত্র গুরু-কে সরাসরি Baashha-এর বাংলা রিমেক হিসেবে উল্লেখ করেছে।সিনেমাটি হলে তেমন একটা ব্যবসা না করতে পারলেও টিভির পর্দায় সবসময়ই জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

সবমিলিয়ে, এই তিনটি সিনেমার নায়কের বর্তমান পরিচয় সাধারণ হলেও তাদের অতীত পরিচয় ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভয়ংকর। এই একটি ফর্মুলাই তিনটি সিনেমার মূল চালিকাশক্তি ছিল। দর্শক প্রথমে নায়ককে সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখে, তারপর ধীরে ধীরে তার লুকানো অতীত সম্পর্কে জানতে পারে। এই রহস্য, আবেগ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং অ্যাকশনের মিশ্রণই সিনেমাগুলোকে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, যে Baashha থেকে সুলতান এবং গুরু-এর জন্ম, সেই Baashha নিজেও পুরোপুরি মৌলিক গল্প ছিল না। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী জানা যায়, এর মূল ধারণা এসেছিল ১৯৯১ সালের হিন্দি সিনেমা হাম-এর একটি ব্যবহার না করা গল্পের আইডিয়া থেকে। পরে সেই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে তৈরি করা হয় Baashha। অর্থাৎ একটি গল্পের ধারণা থেকে জন্ম নেয় Baashha, আর সেই Baashha আবার দুই বাংলায় তৈরি করে সুলতান এবং গুরু।