মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে হয়েও উপহাসের শিকার হতেন অভিনেতা রিতেশ দেশমুখ!

মেহেদী হাসান :

সমালোচনা অনেকের পথ থামিয়ে দেয়, আবার কারও কারও জন্য সেটাই হয়ে ওঠে নতুন শক্তির উৎস। বলিউড অভিনেতা রিতেশ দেশমুখের গল্পটা ঠিক এমনই। একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি ক্ষমতার করিডোর নয়, বেছে নিয়েছিলেন অভিনয়ের অনিশ্চিত পথ। আর সেই পথ চলায় সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তার বাবা, ভারতের মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিলাস রাও দেশমুখ।

যখন রিতেশ দেশমুখের ফিল্ম ক্যারিয়ার শুরু হয়, তখন তার বাবা ছিলেন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। অনেকেই ধরে নিয়েছিল, রাজনীতির উত্তরাধিকার হয়তো একদিন ছেলের হাতেই যাবে। কিন্তু কলেজ পড়ুয়া রিতেশ তখনই নিজের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি রাজনীতি নয়, অভিনয় করতে চান। একজন মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে হিসেবে এই সিদ্ধান্ত মোটেও সহজ ছিল না। সমাজের প্রত্যাশা, পরিবারের অবস্থান এবং পরিচয়ের চাপ-সব মিলিয়ে অন্য কেউ হলে হয়তো নিরাপদ পথটাই বেছে নিতেন। কিন্তু রিতেশ নিজের ভেতরের ইচ্ছাটাকে শুনেছিলেন। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, তার বাবা সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছিলেন।

অভিনয় জগতে প্রবেশের পর অবশ্য রিতেশের জন্য লাল গালিচা সাজানো ছিল না। বরং শুরুটা ছিল অন্যান্য অভিনেতাদের মতোই সমালোচনা আর সংশয়ে ভরা। অনেকের ধারণা ছিল, তিনি হয়তো বাবার পরিচয়ের জোরে সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে তার অভিনয়কে বিচার করা হতো আরও কঠিনভাবে। সংবাদপত্রে তাকে নিয়ে লেখা হতো কড়া ভাষায়। একবার একটি পত্রিকা লিখেছিল, একটি সিনেমায় রিতেশ দেশমুখ যেন “কাঠের ফার্নিচারের মতো”-উপস্থিত আছেন, কিন্তু কোনো কাজের নন। এমন মন্তব্য যে কাউকেই আহত করতে পারে। তবে রিতেশ সেটাকে ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, সমালোচনা থাকলে নিজেকে আরও শানিত করার সুযোগও থাকে।

কিন্তু সব সমালোচনাও আবার সহজে গ্রহণ করা যায় না। আরেকটি পত্রিকা তাকে আখ্যা দিয়েছিল “নষ্ট টিউবলাইট” হিসেবে। এই মন্তব্য তাকে কষ্ট দিয়েছিল। কারণ মানুষ যতই শক্ত হওয়ার চেষ্টা করুক, নিজের কাজ নিয়ে অবমূল্যায়ন শুনলে মন খারাপ হওয়াটা স্বাভাবিক। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তার বাবা বিলাস রাও দেশমুখ।রিতেশ যখন মন খারাপ করে সংবাদপত্র দেখাচ্ছিলেন, তখন তার বাবা তাকে এমন একটি শিক্ষা দিয়েছিলেন, যা শুধু অভিনয় নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তিনি ছেলেকে প্রশ্ন করেছিলেন-“তোমার কাজ কী?” রিতেশ বলেছিলেন, “অভিনয়।” এরপর বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন-“সাংবাদিকদের কাজ কী?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “ভালো-মন্দ লেখা।” তখন বিলাস রাও দেশমুখ বলেছিলেন, “তুমি তোমার কাজ করছো, তারা তাদের কাজ করছে। নিজের কাজে মনোযোগ দাও। একদিন সফলতা আসবেই।”

বিলাস রাওয়ের কথাগুলো কোনো রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের বক্তৃতা ছিল না, বরং একজন বাবা হিসেবে গভীর জীবনদর্শন ছিল। তিনি ছেলেকে সমালোচনা থামাতে শেখাননি, বরং সমালোচনার মাঝেও নিজের পথ ধরে রাখতে শিখিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, মানুষের কাজ নিয়ে আলোচনা হবেই। কেউ প্রশংসা করবে, কেউ তুচ্ছ করবে, কেউ আবার কঠোর ভাষায় সমালোচনা করবে। কিন্তু যদি মানুষ প্রতিটি মন্তব্যে দমে যায়, তাহলে নিজের গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

সময়ের সঙ্গে বাবা বিলাস রাওয়ের সেই কথাই সত্য প্রমাণিত হয়। রিতেশ দেশমুখের কমেডি সিনেমাগুলো একের পর এক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। যাকে একসময় “নষ্ট টিউবলাইট” বলা হয়েছিল, সেই অভিনেতাই দর্শকদের হাসির অন্যতম বড় নাম হয়ে ওঠেন। তার অভিনয়ের আলাদা স্টাইল, টাইমিং এবং কমেডির দক্ষতা তাকে এনে দেয় স্বতন্ত্র পরিচয়।ধামাল,মাস্তি কিংবা হাউজফুলের মতো জনপ্রিয় কমেডি সিরিজগুলোর পাশাপাশি এক ভিলেন,মারজাওয়াসহ অনেক একক সিনেমাতেও নিজের জাত চিনিয়েছেন তিনি। তাই আজ তিনি শুধু একজন সফল অভিনেতা নন, বরং অধ্যবসায় আর আত্মবিশ্বাসেরও উদাহরণ।

রিতেশ দেশমুখের এই গল্প শুধু একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়। এটি এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরে, যেখানে সমালোচনা এড়ানো যায় না, কিন্তু সেটার প্রতি নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আমরা অনেক সময় অন্যের কথায় থেমে যাই, নিজের ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করি কিংবা হতাশ হয়ে পথ বদলে ফেলি। অথচ হয়তো প্রয়োজন হয় কেবল এমন একজন মানুষের, যে আমাদের মনে করিয়ে দেবে-নিজের কাজটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।রিতেশ দেশমুখের বাবা বিলাস রাও দেশমুখের সেই কথাগুলো তাই আজও কার্যকরী। মানুষ তার কাজ করবে, সমালোচকরাও তাদের কাজ করবে। কিন্তু নিজের স্বপ্ন আর পরিশ্রমের জায়গা যদি অটুট থাকে, তাহলে একদিন না একদিন সফলতা দরজায় কড়া নাড়বেই। রিতেশ দেশমুখের জীবন সেই সত্যেরই জীবন্ত প্রমাণ।