তবে কি আসতে চলেছে মহানগর-৩?

ফারহান তানভীর :

মহানগর ভক্তদের জন্য নতুন করে আশার আলো জ্বালালেন কি অভিনেতা মোশাররফ করিম ও নির্মাতা আশফাক নিপুণ? দীর্ঘদিন ধরেই দর্শকদের মুখে একটাই প্রশ্ন-কবে আসবে ‘মহানগর ৩’? এক দুইবার গুঞ্জন শোনা গেলেও সেই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি, তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আবার নতুন করে জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। আর সেই কারণেই পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’।

সম্প্রতি অভিনেতা মোশাররফ করিম নিজের ফেসবুক পেজে ওসি হারুন চরিত্রের একটি সাদা-কালো ছবি প্রকাশ করেন। জ্ঞাতব্য,মহানগর ওয়েবসিরিজে মোশাররফ করিমই ওসি হারুনের চরিত্রে ছিলেন। ছবিটির সঙ্গে তিনি লিখেন, “দুটি কথা সবসময় মনে রাখবেন- প্রথমত, নিবিড় অন্ধকারের বুকেই জীবনের জন্ম। দ্বিতীয়ত, দিনশেষে জীবন আবার সেই চিরচেনা অন্ধকারেই বিলীন হয়ে যায়।” পোস্টটি প্রকাশের পর থেকেই ভক্তদের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়। একে তা ছিল ওসি হারুনের ছবি এবং দ্বিতীয়ত সেই দুইটি কথা। এই দুই মিলিয়েই সবাই ভাবছেন হয়তো মহানগরের আসার সময় হয়েছে।

ঘটনাটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে যখন ‘সিনেগল্প’ নামের একটি চলচ্চিত্রবিষয়ক ফেসবুক পেজ একই ছবি ব্যবহার করে একটি পোস্ট দেয়। পোস্টটির ক্যাপশনে তারা লিখেছিল, “মহানগর ৩ কি আসছে?” আর সেখানেই মন্তব্য করেন ‘মহানগর’-এর নির্মাতা আশফাক নিপুণ। তিনি কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে শুধু তিনটি ইমোজি ব্যবহার করেন। এর কিছুক্ষণ পর সেই একই পোস্ট আবার নিজের টাইমলাইনে শেয়ার করেন তিনি এবং ক্যাপশনে লেখেন, “অমূল্য দুইটা কথা।”যদিও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি, তবু অনেকেই মনে করছেন, হয়তো পর্দার আড়ালে কোনো সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। আর আগ্রহ বাড়াতেই এই মার্কেটিং পদ্ধতি অনুসরণ করেছে নির্মাতা।

বাংলাদেশের ওটিটি ইতিহাসে ‘মহানগর’ একটি অসামান্য নির্মাণ। ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম সিজনটি দর্শকদের সামনে হাজির করেছিল এক রাতের টানটান থ্রিলার। গল্পের কেন্দ্রে ছিল একটি থানা এবং সেখানে আটক হওয়া এক প্রভাবশালী নেতার ছেলে, যে গাড়িচাপায় একজন মানুষকে হত্যা করে। তাকে মুক্ত করতে শুরু হয় রাজনৈতিক চাপ, প্রভাব বিস্তার এবং টাকার খেলা। এই পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রে ছিলেন থানার ওসি হারুন। প্রথমদিকে তাকে একজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা বলেই মনে হয়, যিনি ঘুষ নেন এবং ক্ষমতাবানদের সঙ্গে আপস করেন। কিন্তু গল্প যত এগোয়, ততই দর্শকদের ধারণা বদলাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রকাশ পায়, হারুনের আসল পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আপাতদৃষ্টিতে অসৎ মনে হওয়া মানুষটির ভেতরে লুকিয়ে ছিল আরও জটিল এক চরিত্র।

প্রথম সিজনের ব্যাপক সাফল্যের পর দুই বছর পর ২০২৩ সালে আসে ‘মহানগর ২’। এবার গল্পের কেন্দ্রে আরও গভীরভাবে চলে আসেন ওসি হারুন। সিজনের শুরুতেই দেখা যায়, তিনি একটি গোপন টর্চার সেলে বন্দী। তাকে জেরা করছেন ডিবি কর্মকর্তা সুকুমার বড়ুয়া। এরপর শুরু হয় দুই বুদ্ধিমান মানুষের মধ্যকার এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। জেরা ও জবানবন্দীর মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে দেশের রাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, গুম এবং রাষ্ট্রীয় অন্ধকার জগতের নানা স্তর। পুরো সিজনজুড়ে দর্শক বারবার ভাবতে বাধ্য হয়েছেন-হারুন আসলে নায়ক, খলনায়ক নাকি দুটোর মাঝামাঝি কোনো চরিত্র? আর শেষ মুহূর্তে আবারও চমক দেখান নির্মাতা। বন্দী অবস্থাতেও হারুন যে নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আড়াল থেকে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন এবং একজন বড় অপরাধীকে ধরার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছিলেন, সেই সত্য প্রকাশ পায় ক্লাইম্যাক্সে।এই কারণেই ‘মহানগর’ শুধু একটি ক্রাইম থ্রিলার নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে চরিত্রনির্ভর এক ব্যতিক্রমী গল্প, যেখানে ওসি হারুন বাংলাদেশের ওটিটি জগতের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছেন।

দুই সিজনের শেষে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত রয়ে গেছে। হারুনের ভবিষ্যৎ কী, ক্ষমতার অন্ধকার জগতের সঙ্গে তার লড়াই কোথায় গিয়ে শেষ হবে, কিংবা তিনি আদৌ শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারবেন কি না-এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে দর্শকরা এখনো বছরের পর বছর অপেক্ষা করে আছেন।তাই মোশাররফ করিমের রহস্যময় পোস্ট, সিনেগল্পের প্রশ্ন এবং আশফাক নিপুণের প্রতিক্রিয়া-সবকিছু মিলিয়ে আবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ‘মহানগর ৩’।

এখনও নিশ্চিতভাবে কিছু বলার সময় আসেনি। তবে এতটুকু বলা যায়, দীর্ঘদিন পর এই সিরিজকে ঘিরে যে নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে, তা দর্শকদের মনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। সেই আশা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেবে কি না, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে ‘মহানগর’ ভক্তরা যে আবারও ওসি হারুনের প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।