ফারহান তানভীর :
ঈদুল আজহা মানেই দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মঞ্চ। বছরের এই সময়টাতে একসঙ্গে একাধিক সিনেমা মুক্তি পায় আর দর্শকের আগ্রহের পাশাপাশি শুরু হয় বক্স অফিসের প্রতিযোগিতা। এবারের ঈদেও সেই চেনা চিত্রই দেখা গেছে। বড় তারকা, ভিন্নধর্মী গল্প, অ্যাকশন, থ্রিলার কিংবা সামাজিক নাটক-সব মিলিয়ে প্রেক্ষাগৃহে ছিল বৈচিত্র্য। তবে প্রথম দিনের মাল্টিপ্লেক্স পারফরম্যান্স বলছে, সব সিনেমা সমানভাবে দর্শক টানতে পারেনি। কেউ পেয়েছে দারুণ সূচনা, কেউ আবার প্রত্যাশার ধারের কাছেও যেতে পারেনি।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা সিনেমাগুলোর একটি ছিল শাকিব খান অভিনীত ‘রকস্টার’। মুক্তির প্রথম দিনেই সিনেমাটি মাল্টিপ্লেক্সে বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ওপেনিং এনে নজর কেড়েছে। ৫৭টি শোতে সিনেমাটির প্রথম দিনের গ্রস দাঁড়িয়েছে ২৯ লাখ ৪১ হাজার টাকা। স্টার সিনেপ্লেক্স থেকে শুরু করে লায়ন সিনেমাস, গ্র্যান্ড সিলেট মুভি থিয়েটার, মম ইন, মণিহার সিনেপ্লেক্স, মধুবন সিনেপ্লেক্স, সিনেস্কোপ, শ্যামলী সিনেমা, গ্র্যান্ড রিভারভিউ এবং কে-স্ক্রিন-প্রায় সব বড় মাল্টিপ্লেক্সেই ছিল সিনেমাটির শক্ত উপস্থিতি। এর মধ্যে ১৭টি শো হাউজফুল এবং আরও ৬টি শো প্রায় পূর্ণ ছিল। সংখ্যার হিসাবে এটি শুধু বড় ওপেনিং নয়, বরং ঈদের বাজারে স্পষ্ট আধিপত্যের ইঙ্গিতও বটে। শাকিব খানের তারকাখ্যাতি এবং আগাম প্রচারণার প্রভাব যে টিকিট বিক্রিতে প্রতিফলিত হয়েছে, তা আর আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না।

তবে ‘রকস্টার’-এর পর যে সিনেমাটি চমক দেখিয়েছে, সেটি হলো মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত এবং নাফিজা তুষি অভিনীত ‘রইদ’। প্রথম দিনে ১১টি শো থেকে সিনেমাটির আয় হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। দুটি শো হাউজফুল এবং একটি প্রায় পূর্ণ থাকার তথ্য বলছে, সীমিত শো নিয়েও সিনেমাটি দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বিশাল সংখ্যক শো না থাকলেও পারফরম্যান্সকে অনেকেই সম্ভাবনাময় বলছেন। মুখে মুখে ইতিবাচক আলোচনা তৈরি হলে আগামী দিনগুলোতে ‘রইদ’ আরও ভালো অবস্থানে যেতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রথম দিনের আয় দিয়ে আলোচনায় এসেছে ‘বনলতা সেন’ও। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত সিনেমাটি ৭টি শো থেকে তুলেছে ৩ লাখ ৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে দুটি শো ছিল হাউজফুল। সংখ্যাটি খুব বড় না হলেও ৭টি শোর হিসেবে এটি মোটেই খারাপ নয়। বরং সীমিত প্রদর্শনীতে এমন সাড়া সিনেমাটির প্রতি একটি নির্দিষ্ট দর্শকশ্রেণির আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। অনেক সময় প্রথম দিনের পর দর্শক প্রতিক্রিয়াই সিনেমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, আর সেই জায়গায় ‘বনলতা সেন’ এখনো প্রতিযোগিতায় টিকে আছে বলেই মনে হচ্ছে। গত ঈদেও বনলতা এক্সপ্রেসও কিন্তু সাধাসিধা গল্প দিয়েই বাজিমাত করেছিল।

অন্যদিকে আরিফিন শুভ ও বিদ্যা সিনহা মীম অভিনীত ‘মালিক’ প্রথম দিনে আয় করেছে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। ৭টি শো নিয়ে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি লাখের ঘরে প্রবেশ করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে মাত্রার হাউজফুল প্রচারণা দেখা গেছে, বাস্তব চিত্র নাকি ততটা শক্ত ছিল না। অন্তত প্রথম দিনের রিপোর্ট তাই বলছে। ডিজিটাল আলোচনার সঙ্গে বাস্তব দর্শক উপস্থিতির ফারাক নতুন কিছু নয়, তবে ‘মালিক’-এর ক্ষেত্রে সেটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অবশ্য ঈদের সিনেমার ভাগ্য শুধু প্রথম দিনের ওপর নির্ভর করে না। কনটেন্ট ও দর্শক প্রতিক্রিয়া এখানে বড় ভূমিকা রাখে।
ঈদের প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে হতাশাজনক পারফরম্যান্স এসেছে কয়েকটি সিনেমা থেকে। ডি এ তায়েব ও মাহিয়া মাহি অভিনীত ‘অফিসার’ প্রথম দিনে মাত্র ১৭ হাজার ৮০০ টাকা গ্রস করেছে। স্টার সিনেপ্লেক্স ও লায়ন সিনেমাসে দুটি শো মিলিয়ে দর্শক ছিল মাত্র ৩৮ জন। একইভাবে আদর আজাদ ও শবনম বুবলী অভিনীত ‘পিনিক’ও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। স্টার সিনেপ্লেক্সে দুটি শো থেকে সিনেমাটির আয় হয়েছে মাত্র ২৮ হাজার টাকা, যেখানে দর্শক ছিল ৫৫ জন।আরও একটি হতাশার নাম ‘মাসুদ রানা’। রাসেল রানা অভিনীত এবং সৈকত নাসির পরিচালিত এই সিনেমাটি তিনটি শো থেকে আয় করেছে ৮৪ হাজার ৫০০ টাকা। এমনকি সিট ব্লকের অভিযোগ বা আলোচনা থাকলেও কোনো শো হাউজফুল হয়নি। ফলে শুরুটাই খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয় বলেই মনে করছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে প্রথম দিনের মাল্টিপ্লেক্স চিত্র বলছে, এবারের ঈদে বাজারের বড় অংশ দখলে রেখেছে ‘রকস্টার’। ‘রইদ’, ‘বনলতা সেন’ এবং আংশিকভাবে ‘মালিক’ নিজেদের জায়গা ধরে রাখার লড়াইয়ে আছে। অন্যদিকে ‘অফিসার’, ‘পিনিক’ ও ‘মাসুদ রানা’র জন্য সামনে পথটা কঠিনই মনে হচ্ছে। তবে বক্স অফিসের ইতিহাস বলে, প্রথম দিনের ফল সবসময় শেষ কথা নয়। দর্শকের মুখের প্রচার, রিভিউ এবং ঈদের ছুটির পরবর্তী দিনগুলোই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কে হবে এই ঈদের প্রকৃত বিজয়ী।