দুইবার গুজব থামিয়ে বাঁচলেও তৃতীয়বার সত্যিই চলে গেলেন ধর্মেন্দ্র দেওল…

ফারহান তানভীর :

সপ্তাহ দুয়েক আগেই অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বলিউডের কিংবদন্তি ধর্মেন্দ্র। তখন থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আতঙ্কের ছায়া। দুইবার তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে এমনভাবে যে বড় বড় ফেসবুক পেজ, ইনস্টাগ্রামের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট-এমনকি কিছু তারকাও ভুল করে শোকবার্তা পোস্ট করে ফেলেছিলেন। দু’দফা এই ভুল খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার জানায়-তিনি এখনও লড়াই করছেন, চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। সেই সময় ভক্তরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও মনের ভেতর একটা ভয় থেকেই গিয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ভয়ই আজ সত্য হলো। দীর্ঘ লড়াই শেষে সত্যিই চলে গেলেন ধর্মেন্দ্র। বলিউড যেন আরেকটা যুগ হারাল, একটা শক্তি হারাল, পর্দার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হারিয়ে গেলো এই প্রয়াণে।

অভিনেতা ধর্মেন্দ্র দেওল – হিন্দুস্তান টাইমস

১৯৩৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের লুধিয়ানা জেলার ছোট্ট গ্রামে জন্ম ধর্ম সিং দেওলের। সাধারণ পরিবারের সন্তান। বড়লোকি স্বপ্ন নয়-কিন্তু বড় স্বপ্ন ছিল তাঁর। শৈশব থেকেই সিনেমার প্রতি টান তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল। সেই সময়কার গ্রাম্য জীবন আর সাধারণ পরিবারকে পিছনে ফেলে স্বপ্নের শহর মুম্বাইয়ে এসে দাঁড়ানো-এটা শুধু সাহসের কাজই নয়, বরং এক ধরনের আত্মবিশ্বাসেরও প্রকাশ। ১৯৬০ সালে তিনি বলিউডে পা রাখেন। তাঁর প্রথম দিকের ছবিগুলো থেকেই বোঝা যায়-এ মানুষটা শুধু অভিনয় করতে আসেননি, তিনি পর্দাকে নিজের করে নিতে এসেছেন।

অভিনেতা ধর্মেন্দ্র দেওল – হিন্দুস্তান টাইমস

সুদর্শন চেহারা, শক্তপোক্ত দেহ, নির্লিপ্ত হাসি আর চোখে একধরনের শান্ত শক্তি-সব মিলিয়ে তিনি খুব দ্রুতই ইন্ডাস্ট্রির আলাদা জায়গা পেয়ে যান। তারপর তো একের পর এক সিনেমা। ফুল অর পাত্থার দিয়ে যে ঝড় তুলেছিলেন, তা বন্ধ হয়নি সত্যকাম, বান্দিনি, সীতা অর গীতা, চুপকে চুপকে হয়ে শোলে পর্যন্ত। “ভীরু” চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি এমন যে, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এই ভূমিকাকে বাদ দিয়েই যেন নতুন দর্শক তৈরি করা অসম্ভব। অ্যাকশন, রোমান্স, কমেডি-তিন জায়গাতেই তাঁর দাপট ছিল এতটাই প্রাকৃতিক যে ভাবা যায় না, একই মানুষ এসব চরিত্র করেছেন। তাঁর এই বহুমাত্রিক প্রতিভাই তাঁকে “হী-ম্যান” খেতাব এনে দিয়েছে।

পর্দার নায়কের মতোই তাঁর বাস্তব জীবনও বেশ আলোচিত ছিল। প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌরের সঙ্গে তাঁর চার সন্তান-সানি, ববি, এবং দুই মেয়ে অজিতা ও বিজেতা। পরবর্তীতে হেমা মালিনীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। সেখানেও দুই কন্যা-ঈশা ও আহনা। বলিউডের যাঁরা পরিবারিক ঐতিহ্য বহন করছে, সেই ধারার সবচেয়ে প্রভাবশালী নামগুলোর একটি হলো এই দেওল পরিবার। বিশেষ করে সানি ও ববির ক্যারিয়ারের প্রথম দিকের উত্থানের পেছনেও ধর্মেন্দ্রর উপস্থিতি ছিল গভীর। তাঁদের সবাইকে নিয়েই বলিউডে এই পরিবার দাঁড়িয়ে আছে এক শক্ত ভিত্তিতে।

দুই ছেলে সানি ও ববি দেওলের সঙ্গে বাবা ধর্মেন্দ্র দেওল

ধর্মেন্দ্রর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর নম্রতা। এত বড় তারকা হয়েও তাঁর আচরণ ছিল অদ্ভুতভাবে সহজ। সহকর্মীরা বলতেন-তিনি কখনো অহংকার করতেন না, কখনো কাউকে ছোট মনে করতেন না। সেটে কাজ করা থেকে ব্যক্তিগত জীবন-সব জায়গায় তিনি ছিলেন ভদ্রতা, ভালোবাসা আর আন্তরিকতার প্রতীক। ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর সম্মান এমনই ছিল যে, নতুন পুরনো সব প্রজন্মের অভিনেতাই তাঁকে দেখলে মাথা নত করত।

দ্বিতীয় স্ত্রী হেমা ও দুই মেয়ে ইশা এবং আহনা দেওলের সঙ্গে

তাঁর মৃত্যুতে আজ বলিউডজুড়ে শোকের ছায়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় একের পর এক শ্রদ্ধা, স্মৃতি আর শোকবার্তা। অনেকেই লিখছেন-“একটা যুগ শেষ হয়ে গেল।” সত্যিই তাই। ধর্মেন্দ্র শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন কোটি মানুষের শৈশব-যৌবনের আবেগ; তিনি ছিলেন পর্দার সেই অদম্য উপস্থিতি, যার দিকে তাকালে দর্শকরা বিশ্বাস করত-নায়ক মানেই ভরসা।আজ তিনি চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া অভিনয়, ব্যক্তিত্ব আর উত্তরাধিকার ভারতীয় সিনেমায় চিরকাল বেঁচে থাকবে। এমন মানুষদের মৃত্যু হয় না-তারা শুধু পর্দা থেকে সরে গিয়ে ইতিহাসে জায়গা নেন। আজ সেই ইতিহাসেও একটি শূন্যতা তৈরি হলো।