নেই কেক, নেই উৎসব-ইলিয়াস কাঞ্চনের জন্মদিন এবার এত বিষণ্ণ কেন?

রবিউল ইসলাম:

রুপালি পর্দায় যাকে দেখে কোটি মানুষ হাততালি দিয়েছে, যাঁর এক ইশারায় খলনায়করা কেঁপে উঠত, সেই মানুষটি আজ শান্ত, স্তব্ধ। নেই কোনো কেক কাটার উৎসব, নেই চারদিকে ভক্তদের ভিড়। ২৪ ডিসেম্বর আমাদের সবার প্রিয় নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের জন্মদিন। কিন্তু এবারের জন্মদিনটা যেন কোনো এক বিষণ্ণ সিনেমার দৃশ্য। লণ্ডনের কনকনে শীতে, চার দেয়ালের ভেতর আজ এক অন্য লড়াইয়ে লড়ছেন কিংবদন্তি নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন।

১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের নিভৃত পল্লিতে জন্ম নিয়েছিলেন ইদ্রিস আলী। যিনি পরে আমাদের কাছে হয়ে উঠেছেন রুপালি পর্দার মহাতারকা-ইলিয়াস কাঞ্চন। ৬৬টি বসন্ত পেরিয়ে তিনি পা রাখলেন নতুন বছরে। কিন্তু এবারের এই ৬৬তম জন্মদিনটি ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনের অন্য সব বছরের চেয়ে আলাদা, অনেকটা কষ্টের চাদরে ঢাকা।ইলিয়াস কাঞ্চন দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করছেন ব্রেন টিউমারের মতো এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে। যে মানুষটি সিনেমার পর্দায় হাজারো অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়েছেন, আজ তাঁকে লড়াই করতে হচ্ছে নিজের শরীরের ভেতরে বাসা বাঁধা এক কঠিন অসুখের সাথে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে তাঁর মেয়ের কাছে অবস্থান করছেন।

ইলিয়াস কাঞ্চনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন তাঁর জামাতা আরিফুল ইসলাম। তিনি এক বুক আশা নিয়ে জানিয়েছেন, “বাবার শরীর আগের চেয়ে কিছুটা ভালো। বর্তমানে রেডিয়েশন আর কেমোথেরাপির মাধ্যমে টিউমারটি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।” ইলিয়াস কাঞ্চন বরাবরই লোক দেখানো উৎসব অপছন্দ করেন। তাই এবারও ছিল না কোনো বড় আয়োজন। তবে অসুস্থতা আর একঘেয়েমি কাটাতে পরিবারের সবাই মিলে তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন লন্ডনের কোলাহল ছেড়ে একটু গ্রামের শান্ত পরিবেশে। জন্মদিনের এই বিশেষ দিনটি এভাবেই প্রার্থনায় আর প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে কেটেছে ইলিয়াস কাঞ্চনের।

ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনটা যেন কোনো বড় ক্যানভাসের মহাকাব্য। ১৯৭৭ সালে সুভাষ দত্তের ‘বসুন্ধরা’ সিনেমা দিয়ে তাঁর পথচলা শুরু। এরপর ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ থেকে শুরু করে রোমান্টিক, অ্যাকশন কিংবা সামাজিক-সব ধারার সিনেমাতেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু পর্দার বাইরে ইলিয়াস কাঞ্চন আরও বড় নায়ক হয়ে উঠলেন তখন, যখন ব্যক্তিগত শোককে তিনি শক্তিতে রূপান্তর করলেন।নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন ঘরে বসে থাকেননি। বরং শুরু করেছিলেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন। আজ বাংলাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে লড়াই, তার সমার্থক নাম হয়ে উঠেছেন তিনি।

পর্দার নায়ক থেকে ইলিয়াস কাঞ্চন হয়ে উঠেছেন বাস্তব জীবনের ত্রাণকর্তা, এক নিঃস্বার্থ সমাজসেবক।লন্ডনের প্রবাস জীবনে ইলিয়াস কাঞ্চন হয়তো শারীরিকভাবে দূরে, কিন্তু হৃদয়ের টানে তিনি আমাদের খুব কাছে। অস্ত্রোপচার শেষে এখন চলছে দীর্ঘ সুস্থতা প্রক্রিয়া। মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত থাকলেও দেশ-বিদেশের কোটি ভক্তের ভালোবাসা আর দোয়া তাঁর সবচেয়ে বড় ঔষধ।আমরা অপেক্ষায় আছি-আবারও আপনার হাসিতে মুখর হবে সিনেমার সেট, আবারও রাজপথে আপনার বজ্রকণ্ঠ শোনা যাবে নিরাপদ সড়কের দাবিতে। আপনার জন্মদিনে রইলো অন্তহীন শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।