ছেঁড়া কাপড় পড়ে থাকা কিংবা সরিষার তেল মেখে রোদে বসে থাকা! এই প্রচেষ্টাগুলো “রইদ” এ কতটা ফুটে তুলতে পারবেন নাফিজা তুষি?

ফারহান তানভীর :

হাওয়া’ সিনেমার শুটিং চলাকালেই তুষি প্রথম ‘রইদ’-এর গল্প শোনেন। তখন তিনি আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ছবি তথা “হাওয়া” সিনেমার কাজের প্রায় শেষ পর্যায়ে। ঠিক সেই সময়ই আসে ‘সাদুর বউ’ চরিত্রটির প্রস্তাব। তুষির ভাষায়, এ রকম চরিত্র শিল্পীর জীবনে খুব বেশি আসে না। তিনি এমনিতেই কম কাজ করেন, আর যে কাজটি করেন, সেটার জার্নিতেই পুরোপুরি ডুবে যান। চরিত্র থেকে বেরোতেও তাঁর সময় লাগে।

রইদ এর অতিশিকার পোস্টার – ইন্সটাগ্রাম থেকে

২০২৩ সাল থেকেই শুরু হয় ‘সাদুর বউ’ হয়ে ওঠার প্রস্তুতি। চরিত্রটির ভেতরে আছে ডিমেনশিয়া, আছে মানসিক ভারসাম্যহীনতার জটিল স্তর। তাই কেবল কাগজে লেখা চরিত্রে ভরসা রাখেননি তুষি। টানা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে তিনি নিয়মিত যাতায়াত করেছেন ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মানসিক আরোগ্য পরিষেবা (ডিএমএইচ) এবং পাবনা মানসিক হাসপাতালে। একাধিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছেন, বুঝতে চেয়েছেন ডিমেনশিয়ার বিভিন্ন স্তরে মানুষ কীভাবে আচরণ করে।এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর জন্য কেবল গবেষণা ছিল না, হয়ে উঠেছিল মানবিক সংযোগ। রোগীদের একটু সময় দিলে, মনোযোগ দিলে তাঁদের আচরণ কীভাবে বদলে যায়, সেটাও কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। কেউ হাসে, কেউ নাচে, কেউ খেলতে আসে, কেউ আবার হঠাৎ রেগে যায়। পাবনা মানসিক হাসপাতাল সম্পর্কে তুষির পর্যবেক্ষণ ছিল নির্মমভাবে বাস্তব-সেখানে রোগীরা হয় একেবারে নিস্তেজ, নয়তো অতিরিক্ত হাইপার; অনেক সময়ই ওষুধের প্রভাবেই এই চরম অবস্থাগুলো দেখা যায়।

নাফিজা তুষি – ইন্সটাগ্রাম থেকে

তুষির উপলব্ধি আরও গভীর। তিনি দেখেছেন, যেসব নারী আজ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তাঁদের অধিকাংশই একসময় ছিলেন সম্পূর্ণ সুস্থ। বিয়ে, সন্তান, সামাজিক ও পারিবারিক চাপ কিংবা আকস্মিক কোনো শক তাঁদের মানসিক ভারসাম্য ভেঙে দিয়েছে। তুষির মতে, ডিমেনশিয়া বা ভারসাম্যহীনতা অনেক সময়ই হয়ে ওঠে এক ধরনের ডিফেন্স মেকানিজম-যেন অসহনীয় বাস্তবতা থেকে নিজেকে বাঁচানোর শেষ আশ্রয়।চট্টগ্রামে জন্ম হলেও ঢাকায় বেড়ে ওঠা এই শহুরে অভিনেত্রীর জন্য ‘সাদুর বউ’ হয়ে ওঠা মোটেও সহজ ছিল না। ‘রইদ’-এর শুটিং হয়েছে সিলেটের সাদাপাথরের পেছনের এলাকায়, শাহ আরেফিন টিলার কাছে, সীমান্তবর্তী এক চর অঞ্চলে। শুরুতে সেটি ছিল কেবলই চর। প্রায় সাত মাস ধরে টিমের অন্যদের সঙ্গে তুষিও সেই জায়গায় ঘর বানিয়েছেন, মাটি ফেলেছেন, গাছ লাগিয়েছেন, দেয়াল লেপেছেন।শরীরকেও তৈরি করতে হয়েছে চরিত্রের মতো করে।

নাফিজা তুষি – ইন্সটাগ্রাম থেকে

স্থানীয় নারীরা যেভাবে দিনমজুরের কাজ করেন, যেভাবে তাঁদের শরীরে পরিশ্রমের ছাপ জমে-তুষিও সেটাই চেয়েছেন নিজের শরীরে আনতে। সেকেন্ড হ্যান্ড জামাকাপড় কিনে নিজেই পরিষ্কার করে পরেছেন। শুটিংয়ের আগে ও শুটিং চলাকালীন নিজের কোনো পোশাকই ব্যবহার করেননি।চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য তিনি টানা ছয় মাস চুলে শ্যাম্পু বা কন্ডিশনার ব্যবহার করেননি, গায়ে লাগাননি সাবান। সরিষার তেল মেখে রোদে বসে থাকতেন, যাতে চামড়া প্রাকৃতিকভাবেই পুড়ে যায়। মেকআপে কালো করার পথে যাননি, কারণ বৃষ্টি বা ঘামে আসল রং বেরিয়ে আসার ভয় ছিল। দাঁতের টেক্সচারের জন্য পান খেয়েছেন, এমনকি সাধারণ চুনে কাজ না হওয়ায় পাথরের চুন পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন-যাতে মুখ ও জিহ্বা পুড়ে যায়, কথা ভারী হয়ে আসে।এই যাত্রায় শুধু তুষি নন, পুরো টিমই নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন। স্থানীয় মানুষের বাড়িতে থেকেছেন, তাঁদের রান্না খেয়েছেন। সেট তৈরি থেকে শুরু করে অভিনয়-সবখানেই স্থানীয়দের অংশগ্রহণ ছিল। শুটিং শেষ হওয়ার পরও তাঁরা ঢাকায় এসে টিমের সঙ্গে দেখা করেছেন।

নাফিজা তুষি – ইন্সটাগ্রাম থেকে

তুষির মতে, এটাই পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমনের কাজের ধরন। স্থানীয় মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে একেবারে মিশে না গেলে এমন কাজ সম্ভব নয়। ক্যামেরা কখনো মিথ্যা সহ্য করে না-সত্যের অভাব হলে সেটা ঠিকই ধরা পড়ে।শুটিং শেষে সেটের আর কিছুই নেই। গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে, ঘরের ইট খুলে নিয়ে গেছে মানুষ। চরটা আবার আগের মতো শূন্য। কিন্তু থেকে গেছে এক অভিজ্ঞতা, এক রূপান্তর।‘হাওয়া’র চেয়েও ‘রইদ’ তুষির জন্য ছিল অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। কারণ এখানে তাঁকে অভিনয় করতে হয়নি-তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘সাদুর বউ’।২০২৬ সালে মুক্তি পেতে পারে ‘রইদ’। তার আগেই নাজিফা তুষির এই যাত্রা বলে দেয়, চরিত্রের সত্যে পৌঁছাতে গেলে কখনো কখনো নিজেকেই হারিয়ে ফেলতে হয়।