যে কারণে নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের কোনো পরামর্শ দেন না আলমগীর…

ফারহান তানভীর :

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নায়ক আলমগীর শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতাই নন, তিনি এক অর্থে একটি যুগের প্রতিনিধি। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অভিনয়, প্রযোজনা ও নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই কিংবদন্তি শিল্পী বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজের কিছু ভাবনার কথা বলেছেন। অনেক সময় দেখা যায় প্রবীণ শিল্পীরা নতুন প্রজন্মের কাজের সমালোচনা করেন কিংবা নানা ধরনের উপদেশ দিয়ে থাকেন। অথচ আলমগীর সেই কাজ করেননি। বরং তিনি মনে করেন, বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের আগের প্রজন্মের চেয়ে বেশি সুবিধা ও সুযোগ নিয়ে কাজ করছে। তাই তাদের আলাদা করে উপদেশ দেওয়ার প্রয়োজন তিনি কখনো অনুভব করেন না।

আলমগীরের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে বিনোদন জগতও। তাদের সময়ে একজন শিল্পীর শেখার সুযোগ ছিল সীমিত। এখনকার মতো ইউটিউব ছিল না, ফেসবুক ছিল না, এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিনেমা সহজে দেখারও সুযোগ ছিল না। ভারতীয় কিংবা পাকিস্তানি সিনেমা দেখতে হলেও অপেক্ষা করতে হতো দীর্ঘ দিন। নতুন কিছু শেখাই তখন ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। অথচ বর্তমান সময়ে একজন নবীন শিল্পী ঘরে বসেই বিশ্বের সেরা অভিনেতাদের অভিনয় দেখতে পারে, আন্তর্জাতিক সিনেমা বিশ্লেষণ করতে পারে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার সুযোগ পায়।

আলমগীর আরো মনে করেন, শুধু অভিনয় শেখার ক্ষেত্রেই নয়, কাজের পরিবেশেও বর্তমান প্রজন্ম অনেক বেশি এগিয়ে। আগে একটি চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে শিল্পীদের অনেক কিছুই নিজ দায়িত্বে সামলাতে হতো। এখন চলচ্চিত্রের সেটে পোশাক পরিকল্পনাকারী, স্টাইলিস্ট, মেকআপ আর্টিস্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিভাগের দক্ষ কর্মীরা থাকেন। একজন শিল্পীর জন্য নানা ধরনের পোশাক সাজিয়ে রাখা হয়, যেখান থেকে প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী বেছে নেওয়া যায়। ফলে একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রী তার চরিত্রকে আরও নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার সুযোগ পান। আলমগীরের ভাষায়, বর্তমান প্রজন্ম সবদিক থেকেই তাদের সময়ের শিল্পীদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।

তবে সবকিছুতেই যে বর্তমান সময় এগিয়ে গেছে, তা নয়। আলমগীর বলেন, একটি জায়গায় এসে আজকের চলচ্চিত্র জগত পিছিয়ে পড়েছে। আর সেটি হলো পরিচালনা ও সৃজনশীল নেতৃত্বের জায়গা। তিনি স্মরণ করেন তাদের সময়ের সেইসব গুণী পরিচালকদের কথা, যারা শুধু একটি সিনেমা নির্মাণ করতেন না, বরং শিল্পীদের তৈরি করতেন, গল্পকে জীবন্ত করে তুলতেন এবং প্রতিটি বিভাগকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করতেন। সেই ধরনের পরিচালকদের সংখ্যা এখন অনেক কম বলে মনে করেন তিনি।শুধু পরিচালনাই নয়, সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও আলমগীর অতীতের সমৃদ্ধ সময়কে স্মরণ করেন।

আলাউদ্দিন আলী, সত্য সাহা কিংবা রবিন ঘোষের মতো সঙ্গীত পরিচালকদের নাম উল্লেখ করে আলমগীর বলেন, তাদের সময়ে সঙ্গীত পরিচালকেরা চলচ্চিত্রের প্রাণ ছিলেন। একটি গান তৈরির পেছনে থাকত দীর্ঘ আলোচনা, পরিকল্পনা এবং সম্মিলিত চিন্তা। গানের সুর, কথা, উপস্থাপনা-সবকিছু নিয়ে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হতো। শুধু সঙ্গীত পরিচালক নন, অভিনেতা-অভিনেত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে বসতেন। গানটি গল্পের সঙ্গে কতটা মানানসই হবে, দর্শকের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে-এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হতো।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে কাজের গতি অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সম্মিলিত সৃষ্টিশীলতার কিছু চর্চা। আগে একটি চলচ্চিত্র ছিল অনেক মানুষের যৌথ স্বপ্নের ফল, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা করা হতো। এখন অনেক কিছু দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও সেই আন্তরিকতা ও সম্মিলিত পরিকল্পনার জায়গাটি আগের মতো শক্তিশালী নয় বলে মনে করেন আলমগীর।

আসলে আলমগীরের বক্তব্যে বর্তমান প্রজন্মের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই, রয়েছে সময়ের পরিবর্তনের স্বীকৃতি। তিনি স্বীকার করেন যে নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তি, জ্ঞান ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। আবার একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, চলচ্চিত্র কেবল প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এর পেছনে প্রয়োজন দূরদর্শী পরিচালক, শক্তিশালী সঙ্গীত নির্মাতা এবং এমন একটি সৃজনশীল পরিবেশ, যেখানে সবাই মিলে একটি ভালো কাজ তৈরি করার চেষ্টা করে। সেই জায়গাগুলো আরও শক্তিশালী হলে বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরা শুধু আগের প্রজন্মকে ছাড়িয়ে যাবে না, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আরও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে।