ফারহান তানভীর:
পূর্ণিমা মানেই দর্শকের চোখে এক কোমল, মার্জিত, রোমান্টিক আর সৌন্দর্যে ভরপুর নায়িকার প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রে প্রেম, আবেগ, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা ইতিবাচক নারীর চরিত্রে অভিনয় করে নিজের জন্য তৈরি করে নিয়েছেন আলাদা একটি অবস্থান। তাই পর্দায় তাঁকে দেখলে দর্শক আজও এক ধরনের পরিচিত অনুভূতি খুঁজে পান। কিন্তু সেই পরিচিত ইমেজের গণ্ডি ভেঙে এবার একেবারেই ভিন্ন কিছু করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন পূর্ণিমা।
তাঁর ভাষায়, সবাই তাঁকে রোমান্টিক লুক ও সুন্দরী নায়িকা হিসেবেই দেখে অভ্যস্ত। অথচ তিনি এখন এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করতে চান, যেটি হবে সম্পূর্ণ বিপরীত-একজন নেগেটিভ চরিত্র, এমনকি ভিলেনও হতে আপত্তি নেই তাঁর। তিনি চান, সিনেমা দেখে দর্শক যেন সেই চরিত্রটিকে ঘৃণা করে। কারণ একজন অভিনেত্রীর প্রকৃত সাফল্য কেবল প্রশংসা পাওয়াতেই নয়, চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলায় নিহিত থাকে।পূর্ণিমার এই বক্তব্য আসলে একজন শিল্পীর আত্মবিশ্বাস এবং অভিনয়-ক্ষুধারই প্রকাশ বলা যায়।
দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করলে দর্শকের মনে একটি নির্দিষ্ট ইমেজ তৈরি হয়ে যায়। সেই ইমেজ যেমন জনপ্রিয়তা এনে দেয়, তেমনি অনেক সময় নতুন ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগও সীমিত করে ফেলে। চলচ্চিত্রের ভাষায় একে বলা হয় ‘টাইপকাস্টিং’। একবার কোনো অভিনেতা বা অভিনেত্রী একটি নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রে সফল হয়ে গেলে নির্মাতারাও বারবার তাঁকে একই ধরনের চরিত্রে কাস্ট করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে শিল্পীর ভেতরে থাকা অন্য সম্ভাবনাগুলো অনেক সময় অপ্রকাশিতই থেকে যায়।
পূর্ণিমার ক্ষেত্রেও অনেকটা এমনই ঘটেছে। নব্বই দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে রোমান্টিক নায়িকার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। সৌন্দর্য, অভিব্যক্তি এবং পর্দায় সাবলীল উপস্থিতি তাঁকে দর্শকের প্রিয় মুখে পরিণত করেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়শিল্পীরাও নিজেদের নতুনভাবে আবিষ্কার করতে চান। একই ধাঁচের চরিত্রের পুনরাবৃত্তির বদলে তাঁরা এমন চরিত্র খোঁজেন, যেখানে অভিনয়ের নতুন নতুন দিক প্রকাশ করার সুযোগ থাকে।
বিশ্ব চলচ্চিত্র কিংবা ভারতীয় সিনেমার দিকে তাকালেও দেখা যায়, অনেক জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকা ক্যারিয়ারের একটি পর্যায়ে এসে ইমেজ ভেঙে সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রে অভিনয় করে নতুনভাবে দর্শকদের চমকে দিয়েছেন। অনেক সময় একজন ভিলেন কিংবা ধূসর চরিত্রের অভিনয়ই শিল্পীর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কারণ নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করতে গেলে শুধু সংলাপ বললেই হয় না; চরিত্রের মানসিকতা, হিংস্রতা, কৌশল, আবেগ এবং মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তোলার জন্যও অসাধারণ অভিনয় দক্ষতার প্রয়োজন হয়।
পূর্ণিমা নিজেও বলেছেন, তিনি এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করতে চান, যেটিকে দেখে দর্শক ঘৃণা করবে। ঠিক এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁর অভিনয়-চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতা। বাস্তব জীবনে একজন মানুষ যতই ভালো হোন না কেন, একজন অভিনেতার লক্ষ্য থাকে পর্দায় চরিত্রকে বাস্তব করে তোলা। যদি দর্শক চরিত্রটিকে সত্যি সত্যিই ঘৃণা করে, তাহলে সেটিই হবে সেই অভিনয়ের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। কারণ তখন দর্শক অভিনেত্রীকে নয়, তাঁর অভিনীত চরিত্রটিকেই বাস্তব হিসেবে গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শক্তিশালী নারী ভিলেন বা নেতিবাচক চরিত্রের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। অধিকাংশ গল্পেই নারী চরিত্রকে ইতিবাচক, ত্যাগী কিংবা প্রেমিকাসুলভ রূপেই বেশি দেখা যায়। ফলে পূর্ণিমার মতো জনপ্রিয় একজন অভিনেত্রী যদি সত্যিই একটি শক্তিশালী নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয় করেন, তাহলে সেটি দর্শকদের জন্য যেমন নতুন অভিজ্ঞতা হবে, তেমনি নির্মাতাদের জন্যও ভিন্নধর্মী গল্প বলার সুযোগ তৈরি করতে পারে।বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রসারের কারণে চরিত্রনির্ভর গল্পের চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এখন দর্শক শুধু নায়ক-নায়িকার প্রচলিত গল্প নয়, বরং জটিল মনস্তত্ত্ব, ধূসর চরিত্র এবং অপ্রত্যাশিত মোড়ের গল্পও পছন্দ করছেন। এরকম সময়ে সঠিক গল্প, দক্ষ নির্মাতা এবং শক্তিশালী চিত্রনাট্য পেলে পূর্ণিমার মতো একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী এমন চরিত্রে অভিনয় করে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারেন।
সব মিলিয়ে পূর্ণিমা দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা রোমান্টিক ও সৌন্দর্যময় ইমেজের বাইরে বেরিয়ে এসে দেখাতে চান, তাঁর অভিনয়ের পরিসর আরও অনেক বড়। এখন দেখার বিষয়, কোনো নির্মাতা তাঁর এই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস দেখান কি না। যদি সত্যিই দর্শক একদিন পর্দায় পূর্ণিমাকে এমন এক নির্মম, ঘৃণ্য কিংবা ভয়ঙ্কর চরিত্রে দেখেন, তাহলে সেটি হতে পারে তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি।